ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–চলো। দেখি কোথায় এলাম।
শাঙ্কো সিনাত্রা উঠে দাঁড়াল। তিনজনে হেঁটে চলল বাড়িঘরগুলোর দিকে। দু’পাশের বাড়ির পুরুষ স্ত্রী লোক বাচ্চারা বেশ অবাক চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। সবারই বোধহয় জিজ্ঞাসা এই বিদেশীরা কোত্থেকে এল? কার কাছেই বা যাচ্ছে। ফ্রান্সিসরা এসব দেখে অভ্যস্থ। ওরা হেঁটে চলল। বাড়িগুলোর পরেই একটা ঘাসে ঢাকা প্রান্তর। তারপরই একটা বড় বাড়ি। কাঠ পাথর বালি দিয়ে তৈরী বাড়ি। মাথায় শুকনো ঘাসের ছাউনি।
প্রান্তর পার হয়ে বাড়িটার কাছাকাছি আসতে কয়েকজন প্রহরী ছুটে এল। ওদের কোমর বন্ধনীতে তরোয়াল ঝুলছে। শুধু দু’জনের হাতে বর্শা। ওরা এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। কোমরে তরোয়াল ঝোলা একজন এসে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল–তোমরা কে? কোথায়?
–এটা কি রাজা প্রাফেনের দেশ?
প্রহরী কোন কথা না বলে মাথা ওঠা নামা করল। তারপর বলল–তোমরা কোত্থেকে এসেছো? ফ্রান্সিস আঙুল তুলে পোড়া ঘাসবন দেখাল।
-ও–এলুডা দেশ থেকে। কোথায় যাবে? প্রহরী জিজ্ঞেস করল।
–এখানেই কোন সরাইখানায় থাকব। কয়েকদিন বিশ্রাম নেব। তারপর চলে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই ফ্রান্সিস দেখল–বড় ঘরটার পেছন থেকে একজন লোক আসছে। পেছনে আট দশ জন যোদ্ধা। লোকটির পরনে আটসাটো মোটা কাপড়ের পোশাক। কোমরে চামড়ার কোমরবন্ধনী। তাতে পেতলের বৃটওয়ালা তরোয়াল ঝুলছে। লোকটি প্রান্তরে এসে দাঁড়াল। লোকটিকে দেখে ফ্রান্সিসের কেমন মনে হল লোকটি এদেশীয় নয়। যুরোপীয়। ধাঁধা কাটাতে ফ্রান্সিস প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলে–ঐ লোকটি কে?
উনি মন্ত্রী স্তিফানো৷ প্রহরী বলল।
–রাজা প্রোফেনের মন্ত্রী? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ।
–আমি ভেবেছিলাম সেনাপতি। ফ্রান্সিস বলল।
–না। প্রহরী বলল।
স্তিফানো ততক্ষণে তরোয়াল কোষমুক্ত করেছে। যোদ্ধারাও তরোয়াল খুলে স্তিফানোকে ঘিরে দাঁড়াল। শুরু হল তরোয়ালের খেলা। স্তিফানো ঘুরে ঘুরে যোদ্ধাদের তরোয়ালের মার ঠেকাতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন যোদ্ধা অল্প আঘাত নিয়ে খেলা থেকে সরে দাঁড়াল। স্তিফানোর অভিজ্ঞ হাতে তরোয়াল চালানো দেখে মৃদুস্বরে ফ্রান্সিস বলল–পোড় খাওয়া লড়িয়ে। তারপর চাপাস্বরে বলল–শাঙ্কো –আমি নিশ্চিত মন্ত্রী স্তিফানো যুরোপীয় জলদস্যু।
-বলো কি? শাঙ্কো একটু অবাকই হল। তখন নকল লড়াই চলছে। আরো তিনজন যোদ্ধা লড়াই থেকে সরে দাঁড়াল। এবার ফ্রান্সিস প্রহরিটিকে জিজ্ঞেস করল উনি কি এদেশের লোক?
–না-স্পেন দেশের লোক।
–তাহলে রাজা প্রোফেনের মন্ত্রী বিদেশী। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। উনি নিয়মিত যোদ্ধাদের অস্ত্র শিক্ষা দেন। প্রহরীটি বলল।
–আর সেনাপতি? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–শুধু সেনাপতি নয় রাজা পোফেন ও মন্ত্রীমশাইয়ের নির্দেশে চলেন। এখানে মন্ত্রী স্তিফানোর কথাই শেষ কথা। তাঁর ওপরে কথা বলার কেউ নেই। প্রহরী বলল।
নকল লড়াই শেষ। মন্ত্রী স্তিফানো তরোয়াল কোষবদ্ধ করল। তারপর কোমরে গোঁজা একটা রুমাল বের করে মুখের কপালের ঘাম মুছতে লাগল। প্রহরী ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল
–মন্ত্রী মশাইয়ের কাছে চল।
-বেশ। ফ্রান্সিস বলল। তারপর প্রহরীর পেছন পেছন স্তিফানোর কাছে এল। স্তিফানো ফ্রান্সিসদের দেখে সামান্য চমকাল। কিন্তু সেটা বুঝতে না দিয়ে বলল তোমরা তো দেখছি বিদেশী।
–হ্যাঁ। আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–ও। তোমরা তো জলদস্যুতা কর। স্তিফানো বলল।
–এসব অভিযোগ আমরা এর আগেও শুনেছি। আমরা এসব গায়ে মাখি না। তবু বলি–আমরা জলদস্যু নই। ফ্রান্সিস বলল।
তোমরা কোত্থেকে কেন এখানে এলে? স্তিফানো জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিস এলুডায় কী ঘটেছে সব বলল।
–হুঁ। এলুডার সর্দার নিজেকে রাজা মনে করতো। দু’দুবার ওরা এদেশে আক্রমণ করেছিল। দু’বারই ওদের তাড়িয়ে দিয়েছি। যাক গে। স্তিফানো প্রহরীদের দিকে তাকিয়ে, বলল–এদের রাজসভায় নিয়ে এসো। স্তিফানো চলে গেল।
-যাক–কয়েদঘরের হাত থেকে বাঁচলাম। শাঙ্কো শ্বাস ফেলে বলল।
–এখনই অতটা নিশ্চিত হয়ো না। স্তিফানো খুব ধুরন্ধর পুরুষ। ও বুঝেছে আমি ওকে সহজেই চিনে ফেলেছি। কাজেই আমাদের মুক্ত রাখবে সে ভরসা কম। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বলল।
প্রহরী ওদের চলার ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা প্রহরীটির পেছন পেছন চলল।
সদর প্রবেশ পথ দিয়ে ওরা রাজবাড়িতে ঢুকল। একটা ছোট দরজা পার হয়ে ওরা রাজসভায় এল। প্রজাদের বেশ ভিড়। রাজা প্রোফেন প্রবীন পুরুষ। মুখে কাঁচা পাকা দাঁড়ি গোঁফ। একটু রোগাটে। মাথায় হীরে বসানো সোনার মুকুট। গায়ে মোটা চকচকে কাপড়ের ঢোলা হাতা জামা। রাজাপ্রজাদের দিকে তাকিয়ে দেশীয় ভাষায় কিছু বলছিলেন। সিংহাসনে কাঠের চকে কাপড়ের গদি পাতা। সিংহাসনের গায়ে রুপোর গিল্টি। দুপাশে দুটি আসন। মন্ত্রী স্তিফানো আর সেনাপতি বসে আছে।
রাজা প্রোফেনের বক্তৃতা শেষ হল। প্রজারা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেল। ভিড় কমল।
মন্ত্রী স্তিফানো রাজাকে কিছু বলল। রাজা ফ্রান্সিসদের দেখলেন। হাত নেড়ে এগিয়ে আসতে ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিসরা এগিয়ে এল। রাজা স্পেনীয় ভাষায় কথা বলতে লাগলেন-তোমাদের কথা বলো। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে এলুডায় যা ঘটেছে সব বলল। পরে বলল–আপনার রাজত্বে আত্মরক্ষার জন্যে এসেছি। কোন সরাইখানায় আশ্রয় নেব। কয়েকদিন থেকে জাহাজে ফিরে যাব। মন্ত্রী স্তিফানো এবার গলা চড়িয়ে বলল– সব শুনলাম। কিন্তু এদেশের নিয়ম হচ্ছে বিদেশী দেখলেই তাকে বন্দী করা।
