ফ্রান্সিস জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–
–কী মনে হয় তোমার। জাহাজ তীরে ভেড়ানো যাবে?
–তা যাবে। জলে গভীরতা আছে। ফ্লেজার বলল।
–তাহলে জাহাজ তীরে ভেড়াও ফ্রান্সিস বলল।
–কী ভাবছো ফ্রান্সিস। এখানে নামবে? হ্যারি জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। জাহাজঘাটটা ছোট। কোন জাহাজও নোঙর করা নেই। তবে বোঝা যাচ্ছে জাহাজঘাট হিসেবেই এটা ব্যবহার করা হয়।
–লোকজন কিন্তু দেখা যাচ্ছে না। হ্যারি বলল।
–নেমে দেখতে হবে। হয়তো জঙ্গলের ওপারে বসত আছে। সেখানে গিয়েই খোঁজ করতে হবে। জানতে তো হবে কোথায় এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–এখন তো বিকেল হয়ে এসেছে। এখনই নামবে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–হ্যাঁ। দিনে দিনেই খোঁজখবর নেওয়া ভাল। রাতে কিছু করা যাবে না। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ফ্লেজারের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস বলল–জাহাজ তীরে ভেড়াও।
ফ্লেজার আস্তে আস্তে জাহাজ তীরে ভেড়াল। শাঙ্কো আর বিস্কো মিলে পাটাতন ফেলল। ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর সিনাত্রাকে তৈরি হয়ে আসতে বলল। শাঙ্কো বলল তাহলে এখনই নামবে?
–হ্যাঁ। একটু পরেই নামবো। দেরি করবো না। ফ্রান্সিস বলল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো আর সিনাত্রা তৈরি হয়ে এল। তিনজনে পাটাতনের দিকে এগোল। হ্যারি মারিয়া আর অন্য কয়েকজন বন্ধু রেলিং ধরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসরা তবোয়াল নিল না।
ফ্রান্সিসরা জাহাজঘাটায় নেমে দেখল একটা রাস্তামত বনের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে। তার মানে এই পথে লোকচলাচল করে। কাজেই নিশ্চয়ই বনের পরে লোকবসতি আছে।
তিনজনে বনের পথ ধরে পশ্চিমমুখো হাঁটতে লাগল। রাস্তার দুপাশে ঘন বন। এখানে ওখানে ভাঙা রোদ পড়েছে। তবে বনতল অন্ধকারই।
ওরা কিছুটা এগিয়েছে। হঠাৎ শুকনো পাতা ভাঙার জোর শব্দ। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ল। বলে উঠল–পালাও। ওরা ঘুরে দঁড়াতে যাবে তখনই হঠাৎ দেখল প্রায় অন্ধকারে পথের ওপর দাঁড়িয়ে তিনজন লোক। হাতে উদ্যত বর্শা। বনের অন্ধকারে মোটামুটি দেখা গেল ওদের পরনে মোটা কাপড়ের আঁটোসাটো পোশাক। গায়ের রং কালো। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল–পেছনে ছোটো। ঘুরে দাঁড়িয়েই ওরা দেখল আরো তিনচারজন কালো মানুষ উদ্যত বর্শা হাতে রাস্তা আটকে দাঁড়িয়ে। ফ্রান্সিসদের পালানো হল না। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–কোনরকম বাধা দিও না। আমাদের নিয়ে কী করে দেখি।
রাস্তার দুদিক থেকে দু’দল যোদ্ধা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের ঘিরে দাঁড়াল। একজন মোটামত যোদ্ধা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসদের সামনের দিকে হাঁটুতে ইঙ্গিত করল। সবাই বনপথ দিয়ে চলল। সামনে তিনজন। পেছনে চারজন। সবার হাতেই লম্বা ডাল কেটে তৈরি ছুঁচোলোমুখ লোহা বাঁধানো বর্শা। সবাইচলল। বন শেষ। বিকেলের পড়ন্ত আলোয়। ফ্রান্সিস দেখল বাঁদিকে শুকনো লম্বা লম্বা ঘাস ঢাকা হল দূরবিস্তৃত। সম্মুখে বাড়িঘর দোর। ঘরগুলো ছাউনি ঘাসের। দেয়াল মাটি পাথরের। বসতি এলাকা। বাড়িঘরের মধ্যে বাইরে স্ত্রী-পুরুষ ছেলেমেয়ের ওরা অনেকেই বেশ অবাক হয়ে ফ্রান্সিসদের দেখছিল।
বাড়িগুলোর পাশ দিয়ে ঢুকতেই দেখা গেল একটা বেশ বড় উঠোনমত। উঠোনের মাঝখানে একটা খুঁটির মত আস্ত একটা শুকনো গাছ পোঁতা। ঐ পরিষ্কার উঠোন ঘিরেই বাড়িঘর।
সামনেই একটা বড় ঘর। তার মাটির বালিপাথরে তৈরি বারান্দায় একটা কাঠের আসনে বসে আছে এক যুবক। মাথায় লম্বা চুল পিঠ পর্যন্ত নেমে এসেছে। গায়ের রং। তামাটে। পরনে আঁটো সাটো মোটা কাপড়ের পোশাক। কাঠের গ্লাস করে কিছু খাচ্ছে। টকটকে লাল চোখ ক্রুর দৃষ্টি। তার সামনে এসে ফ্রান্সিসদের দাঁড় করানো হল। মোটা যোদ্ধাটি মাথা একটু নুইয়ে এক নাগাড়ে কিছু বলে গেল। বোঝাই গেল ফ্রান্সিসদের বন্দী করার ঘটনা বলল। আরো বোঝা গেল যুবকটি এখানকার সর্দার।
যুবক সর্দার এবার ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল–কে তোমরা?
–আমরা বিদেশী। য়ুরোপ থেকে জাহাজ চড়ে এখানে এসেছি। ফ্রান্সিস বলল।
–কীভাবে? সর্দার জানতে চাইল।
জাহাজে চড়ে। ফ্রান্সিস বলল।
সর্দার একটু চুপ করে থেকে গ্লাসের পানীয় সবটা খেয়ে গ্লাসটা পাশে রাখল। তারপর সরাসরি বলে বসল-না–তোমরা–রাজা প্রোফেনের-গুপ্তচর আমাদের যোদ্ধাসংখ্যা–খবর।
–আপনি আমাদের ভুল বুঝছেন। রাজা প্রোফেন নামে কাউকে আমরা চিনি না। কোথায় তার রাজত্ব তাও জানি না। ফ্রান্সিস বলল।
–বিশ্বাস–নেই। বন্দী-হত্যা। সর্দার বলল।
ফ্রান্সিস ভীষনভাবে চমকে উঠল। বুঝল চরম বিপদের মুখে ওরা। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–আমাদের কেন হত্যা করবেন? কী অপরাধ করেছি আমরা?
–রাজা প্রোফেনের গুপ্তচররাতে—দেখবে–শাস্তি।
ফ্রান্সিস বুঝল রাজা প্রোফেনের যোদ্ধাকে শাস্তি দেওয়া হবে। তবে ওদের মুক্তি নেই। পরে ওদেরও শাস্তি দেওয়া হবে। আজ রাতেই ঐ যোদ্ধাকে শাস্তি দেওয়া হবে। কীরকম শাস্তি সেটা দেখে বোঝা যাবে ওদেরও ভাগ্যে কীরকম শাস্তি জুটবে। সদার বলছে হত্যা। ওদেরও হত্যা করা হবে। এই চিন্তাটাই ফ্রান্সিসকে উদ্বিগ্ন করল। ফ্রান্সিস অবার বলল– আমাদের শাস্তি দেওয়া হবে কেন? আমরা তো আপনাদের কোন ক্ষতি করিনি।
কথা নয়-যাও–বন্দী। সর্দার গভীরস্বরে বলল। ফ্রান্সিস বুঝল এই সদারের মনে কোন দয়ামায়ার লেশমাত্র নেই। নরহত্যা এর কাছে কোন অন্যায়ইনয়। ফ্রান্সিস ক্রুদ্ধ হল। চিৎকার করে বলে উঠল–আমাদের হত্যা করার চেষ্টা করলে আপনিও রেহাই পাবেন না। সর্দার একলাফে উঠে দাঁড়াল। যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে গলা চড়িয়ে কী বলে উঠল। যোদ্ধারা ছুটে এসে তিনজনের পিঠে বর্শা খোঁচা দিয়ে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। তিনজনকে নিয়ে যোদ্ধারা উঠোনের মাঝখানে লম্বা খুঁটির কাছে নিয়ে এল। ফ্রান্সিস দেখল দু’জন বন্দীকে খুঁটির সঙ্গে হাত পা বাঁধা অবস্থায় রাখা হয়েছে। শক্ত বুনো লতা দিয়ে ফ্রান্সিসদেরও খুঁটর সঙ্গে বাঁধা হল। পা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হল। বাঁধা হাত আর খুঁটির সঙ্গে বাধা হল না। একজন যোদ্ধা ওদের সামনে পাহারায় রইল। অন্য যোদ্ধারা চলে গেল।
