নিশ্চয়ই থাকবো। সবাই আনন্দ করবে আর আমি থাকবো না? মারিয়া হেসে বলল।
–খুব খুশি হলাম। শাঙ্কো হেসে বলল। সবাই রাতের নাচগানের আসরের কথা জানল। ফ্রান্সিসও জানল। কিন্তু ওর মন থেকে দুশ্চিন্তা যাচ্ছে না। জাহাজ কোথায় চলেছে? দিক ঠিক আছে কিনা। দিনে রাতে বার কয়েক ফ্লেজারের কাছে আসে। জানতে চায় জাহাজ ঠিক উত্তরমুখো যাচ্ছে কিনা। ফ্লেজার খুব নিশ্চিন্তভাবে বলতে পারছে না ঠিক কোনদিকে জাহাজ চলেছে। এই সংশয়ের কথা ফ্রান্সিস অবশ্য বন্ধুদের বলে না। এসব জানলে বন্ধুদের মধ্যে হতাশা আসবে। সেটা এই অবস্থায় বিপজ্জনক। তাই ফ্লেজারকে মৃদুস্বরে বলে–
–এসব কথা বন্ধুরা কেউ যেন না জানে।
–ঠিক আছে। এই নিয়ে তুমি ভেবো না। জাহাজে এখন খাদ্য জলের অভাব নেই। কাজেই বেশ কিছুদিনের জন্যে নিশ্চিন্ত। ফ্লেজার বলল।
রাতে খাওয়াদাওয়ার পাট চুকল। ভাইকিংরা সবাই ডেক-এ উঠল। পূর্ণিমার কাছাকাছি সময়। জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। ফ্রান্সিস আর মারিয়াও মাস্তুলের গা ঘেঁষে বসল। মাঝখানে গোল জায়গা রেখে সবাই গোল হয়ে বসল। শাঙ্কো কোত্থেকে একটা খালি পিপে নিয়ে এল। টন্ টন্ শব্দে খালি পিপে পিটিয়ে গলা চড়িয়ে বলে উঠল–গান শুরু হোক। ফ্রান্সিস হেসে জোরে বলল–সিনাত্রা-গান শোনাও। কয়েকজন বন্ধু সেনাত্রাকে ঠেলাদিয়ে বলল–যাও–গান শোনাও।
সিনাত্রা হাসল। তারপর উঠে গিয়ে গোল জায়গাটায় দাঁড়াল। শুরু করল গান। ওদের দেশের গান। বসন্ত এলে যখন ওদের দেশের পাহাড়ি অঞ্চলে নতুন ঘাস গজায় তখন ভেড়াপালকরা ভেড়ার পাল নিয়ে আসে সেই ঘাস খাওয়াতে। তখন ওরা ভেড়ার পাল ছেড়ে দিয়ে ঘাসের ওপর বসে গান গায়–
সবুজঘাসে ঢাকল পাহাড়
দেখে যা রে কেমন বাহার
ফুটলো কলি
জুটলো অলি
এ দেশ তোমার আমার।
সুরেলা গলায় সিনেত্রা গাইতে লাগল ভেড়াপালকদের গান। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতে লাগল। মারিয়া রাজপ্রাসাদে মানুষ হয়েছে। ভেড়াপালকদের গান ও কখনও শোনেনি। তাই গভীর আগ্রহ নিয়ে মারিয়া গানটা শুনতে লাগল। ফ্রান্সিসেরও শুনতে ভালো লাগছিল। কিন্তু বন্ধুদের মন আনন্দের বদলে বিষাদে ছেয়ে গেল। কারণ গান শুনে নিজেদের মাতৃভূমির কথাই বেশি করে মনে পড়ল। সবাই চুপ করে বসে রইল। শাঙ্কো বুঝল সেটা। কোথায় নাচবে হৈ হৈ করবে তা নয় সবার মন ভারাক্রান্ত। গান শেষ হতে শাঙ্কো লাফিয়ে উঠে পীপে বাজাতে বাজাতে বলে উঠল–সিনাত্রা বিয়ের গান গাও। আনন্দের উল্লাসের।
সিনাত্রা হেসে বিয়ের চটুল গান ধরল। বর বিয়ে করতে যাওয়ার সময় যে গান গাওয়া হয়। ছন্দে তালে সুরে গান জমে উঠল। শাঙ্কোর পীপের বাজনার তালে তালে কয়েকজন উঠে ডেক-এর ওপর থপ্ থপ থপ্ পা ঠুকে নাচতে আরম্ভ করল।
একটা গান শেষ হতেই সিনাত্রা আর একটা তালের গান ধরল। চলল থপ্ থপ্ থপ্ নাচ। এবার প্রায় সবাই নাচতে লাগল। ফ্রান্সিস মারিয়াও বাদ গেল না। শুধু বয়েসে বড় ভেন হাসিমুখে নাচ দেখতে লাগল। মারিয়া রাজপ্রাসাদে ঢিমে লয়ে বাজনার সঙ্গে নাচতে অভ্যস্ত। এত দ্রুত তালের নাচ ও কোনদিন নাচে নি। আজকে নাচল। এই নাচে একটা উন্মাদনা আছে। মারিয়া ফ্রান্সিসের সঙ্গে নেচে উপভোগই করছিল নাচটা।
প্রায় দুঘণ্টা নাচ চলল। শেষের দিকে জাহাজ চালক ফ্লেজার কড়ার সঙ্গে হুইল আটকে রেখেনাচে যোগ দিল। নাচগানেরশব্দ জ্যোৎস্না ধোওয়া সমুদ্রের বুকেছড়িয়ে পড়তে লাগল।
একসময় সিনাত্রা গান থামাল। বাজনা নাচ বন্ধ হল। একঘেয়ে জাহাজী জীবনে এই বৈচিত্র্য ভালো লাগল সবার। একমাত্র পেড্রো এই আসরের মজা থেকে বঞ্চিত হল। ওকে। তো নজরদারি চালাতে হয়। এর পরে কয়েকদিন পরপরই রাতে খাওয়াদাওয়ার পর ডেক এ নাচগানের আসর বসতে লাগল। এই আনন্দঘন সময় সবাই উপভোগ করতে লাগল। ফ্রান্সিস এই ব্যাপারে উৎসাহই দিল। ওরা আনন্দে থাকুক এটাইফ্রান্সিস চাইছিল।
দিন কুড়ি কাটল। জাহাজ দ্রুতই চলেছে। তবে ডাঙার দেখা নেই। ফ্রান্সিস একটু চিন্তায় পড়ে। কিন্তু উপায় নেই। ডাঙার দেখা পাওয়ার জন্যে অপেক্ষা করতেই হবে।
পেড্রো মাস্তুলের মাথায় নিজের জায়গায় বসে চারদিক নজরদারি চালিয়ে যাচ্ছে। তার জন্যে পেড্রোকে রাতও জাগতে হচ্ছে।
দিনরাত জাহাজ চলেছে। ডাঙার দেখা নেই। এই নিয়ে ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন হয়। তবে ফ্রান্সিসের ওপর ওদের অগাধ বিশ্বাস। ফ্রান্সিসের চিন্তা হয়। এতগুলো মানুষের জীবনের দায়িত্ব তো ওর কাঁধেই। বন্ধুরা হৈ হৈ করে। আনন্দ করে। নাচগানের আসর বসায়। আর ফ্রান্সিস থাকে নিজের চিন্তা নিয়ে। হ্যারি সান্ত্বনা দেয়-খাদ্য আছে। জল আছে। চলুক না জাহাজ। ডাঙার দেখা পাবই।
দিন পনেরো পরে ডাঙার দেখা মিলল। মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রোর চিৎকার শোনা গেল–ভাইসব–ডাঙা দেখা যাচ্ছে। হ্যারি ডেক-এই ছিল। গলা চড়িয়ে বলল–কোনদিকে?
–ডানদিকে। পেড্রো গলা চড়িয়ে বলে। কয়েকজন ভাইকিং পেড্রোর কথা শুনল। ওরা রেলিং ধরে দাঁড়াল। ডানদিকে তাকাল। দেখল জঙ্গল। জঙ্গল ঘন না ছাড়া ছাড়া গাছগাছালির সেটা বুঝল না।
হ্যারি ছুটে গিয়ে ফ্রান্সিসকে ডেকে আনল। ফ্রান্সিসের সঙ্গে মারিয়াও এল।
জাহাজটা ততক্ষণে জঙ্গলের অনেক কাছাকাছি এসেছে। বোঝা গেল জঙ্গলটা মোটামুটি ঘনই। বড় বড় গাছের জঙ্গল। বালিয়াড়ির পরেই জঙ্গলের শুরু। এখান থেকে সমুদ্র অনেকটা গভীর। সেটা বোঝা গেল জাহাজটা যখন তীরভূমির কাছাকাছি এল।
