ফ্রান্সিস দরজা দিয়ে বেরুতে অন্য পাহারাদারটি ওর পেছনে পেছনে তরোয়াল হাতে চলল। ফ্রান্সিস দেখল সর্দার বিছানায় শুয়ে আছে। ফ্রান্সিস বলল–একটুউঠুন। আপনাকে কয়েকটা কথা বলবো। সর্দার বিছানা থেকে উঠে বসল। বিরক্তির সঙ্গে বলল–কী? ফ্রান্সিস ইনিয়ে বিনিয়ে একই কথা বলতে লাগল আমাদের মুক্তি দিন। কথা বলার সময় ফ্রান্সিস আড়চোখে দেখল বাইরের বারান্দায় দুজন পাহারাদার রয়েছে। তরোয়াল কোমরের ফেট্টিতে গোঁজা। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে ডাকল––শাঙ্কো। শাঙ্কো তৈরিই ছিল। খাবার দিয়েছিল যে পাহারাদারটি সে তখন দরজার কাছে এসেছে। শাঙ্কো দ্রুত হাতে খাবারের পাতা ছুঁড়ে দিল পাহারাদারের মুখে। সে মুখ নিচুকরল। তখনই শাঙ্কো দরজার পাল্লা ধাক্কা দিল পাহারাদারের পিঠে। দরজার ধাক্কায় পাহারাদার ঘরের মেঝেয় উবুড় হয়ে পড়ল। দরজার ধাক্কায় পাহারাদারের পড়ে যাওয়ারশব্দ শুনে তরোয়াল হাতে পাহারাদারটি ঘরের দিকে আসার জন্য ঘুরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস এইসুযোগটাই চাইছিল। ও ছুটে এসে পাহারাদারটিকেএকধাক্কায় ঘরের মেঝেয় ফেলে দিল। পাহারাদারের হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। মশালের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল তরোয়ালটা কোনায় জলের জায়গারকাছেপড়েছে। ফ্রান্সিস একলাফে সেখানে গিয়ে তরোয়ালটা তুলে নিয়ে ছুটে বাইরের ঘরে চলে এল। সর্দারের বুকে তরোয়ালের ডগাটা ঠেকিয়ে বলল–উঠে দাঁড়ান। সর্দার তখন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে। এভাবে আক্রান্ত হবে স্বপ্নেও ভাবেনি। সর্দার আস্তে আস্তে উঠে দাঁড়াল।
ওদিকে এখানকার শব্দ শুনে বারান্দা থেকে দুই পাহারাদার তরোয়াল হাতে ছুটে বাইরের ঘরে ঢুকল। দেখল সর্দারের বুকে তরোয়াল ঠেকিয়ে ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে আছে। দু’জনেই হতবাক। সর্দারের জীবন বিপন্ন। ফ্রান্সিস তরোয়ালটা এক টান দিল। সর্দারের বুকের কাছে পোশাক কেটে গেল। দেখা গেল চিরে গিয়ে বুক থেকে রক্ত বেরোচ্ছে।
পাহারাদাররা ফ্রান্সিসকে বাধা দিতে সাহস পেল না। ফ্রান্সিস গম্ভীর গলায় বলল– সর্দার আমাদের জাহাজে তুলে দেবেন চলুন।
–না–না। সর্দার বলে উঠল।
–তাহলে মরবেন। কথাটা বলে ফ্রান্সিস তরোয়ালের চাপ বাড়াল। সর্দার আর আপত্তি করতে সাহস পেল না।
–চলুন। ফ্রান্সিস তাড়া দিল।
সর্দার আস্তে আস্তে বাইরের বারান্দায় এল। ফ্রান্সিস বলল–আপনার পাহারাদারদের এখান থেকে চলে যেতে বলুন। সর্দার গলা চড়িয়ে কী বলল। পাহারাদার দুজন উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল।
ওদিকে দুই বন্দী দরজা খোলা পেয়ে এক ছুটে বাইরে চলে এল। তারপর ছুটল পাহাড়টার দিকে।
সামনে সর্দার। পেছনে সর্দারের পিঠে তরোয়াল ঠেকিয়ে ফ্রান্সিস। পেছনে শাঙ্কো। তিনজনে চলল জাহাজঘাটের দিকে।
বাজার এলাকা জনহীন। রাস্তা দিয়ে তিনজন চলল। জোৎস্না অনুজ্জ্বল হলেও চারদিক মোটামুটি দেখা যাচ্ছিল।
তিনজনে জাহাজঘাটে পৌঁছল। ফ্রান্সিস পেছনে তাকিয়ে দেখল দূরে পাহারাদাররা দাঁড়িয়ে আছে। ফ্রান্সিসরা সমুদ্রতীরে জলের কাছে এল। হঠাৎ অনুচ্চস্বরে ফ্রান্সিস বলে। উঠল–শাঙ্কো-সাঁতরে। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে জলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ক্ষতস্থানে নোনা– জল লাগতে ভীষণ জ্বালা করে উঠল। ওর মুখ থেকে কাতর ধ্বনি উঠল–অ্যাঁ। ফ্রান্সিস বলে উঠল–কী হল?
–কিছু না। এসো। শাঙ্কো জাহাজের দিকে সাঁতরাতে লাগল। এবার ফ্রান্সিস তরোয়ালটা দাঁতে চেপে ধরে জলে ঝাঁপ দিল। তারপর জাহাজের দিকে সাঁতরে চলল।
ওদিকে বেশ কিছু বন্ধু এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে ফ্রান্সিসদের দেখছিল। সিনাত্রা দ্রুত হালের দিকে গেল। দড়ির মইটা খুলে নামিয়ে দিল।
ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো মই বেয়ে বেয়ে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–বিস্কো–নোঙর তোল। কয়েকজন দাঁড়ঘরে যাও। পাল খুলে দাও। আমরা এখান থেকে চলে যাবো। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নোঙর তোলা হল পাল খোলা হল। দাঁড় বাওয়া শুরু হল। জাহাজ মাঝসমুদ্রের দিকে চলল।
ফ্রান্সিস তাকিয়ে দেখল সর্দার বালিয়াড়িতে বসে আছে। তাকে ঘিরে পাহারাদারদের ভিড়। ওরা অসহায় দৃষ্টিতে ফ্রান্সিসদের জাহাজের দিকে তাকিয়ে আছে।
জাহাজ চলল মাঝসমুদ্রের দিকে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। বাতাস বেগবান। পালগুলো ফুলে উঠেছে। দাঁড় বাইতে হচ্ছে না। খুশির হাওয়া ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে। ডেক-এ ছক্কাপাঞ্জা খেলছে দল বেঁধে।
বিকেলের দিকে ফ্রান্সিস এল জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে। বলল–দিক ঠিক রাখতে পারছো?
–চেষ্টা করছি। রাতে আকাশে মেঘ জমলেই প্রায় দিশেহারা হয়ে পড়ি। ফ্লেজার বলল।
তার মানে ধ্রুবতারাটা দেখতে পাও না। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল।
–হ্যাঁ। তখন কতকটা আন্দাজেই জাহাজ চালাতে হয়। ফ্লেজার বলল।
–অগত্যা তাই করো। এখনও তো ডাঙার দেখা পেলাম না। কাজেই বুঝতে পারছি না কোথায় এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখি। জাহাজ তো চলুক। ফ্লেজার বলল।
ভাইকিংরা জেনেছে জাহাজ ওদের দেশের দিকেই চলেছে। সংবাদটা আনন্দের। তাই শাঙ্কো ছক্কাপাঞ্জা খেলার আসর ছেড়ে এসে গলা চড়িয়ে বলল-রাতের খাওয়া সেরে ডেক-এ এসে নাচগানের আসর বসাও। প্রায় সব বন্ধুরা হৈহৈ করে শাঙ্কোর কথা সমর্থন করল।
তখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে। বরাবরের মত মারিয়া ডেক-এ এসে রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখছে। শাঙ্কো মারিয়ার কাছে এল। বলল–রাজকুমারী আমরা ঠিক করেছি আজ রাতে ডেক-এ নাচগানের আসর বসাবো। আপনি থাকবেন।
