না–আমরা দস্যু নই। শাঙ্কো বেশ জোর দিয়ে বলল। সর্দার মাথা ঝাঁকিয়ে বলল–না। শাঙ্কো তবুও তারা যে দস্যু নয় এটা বোঝাবার জন্যে অনেক কথা বল। কিন্তু সর্দারের এক কথা।
শাঙ্কো বুঝল সর্দারকে বোঝানো যাবে না। ওর এক গোঁ। কারা কবে এখানকার স্ত্রীপুরুষ জাহাজে তুলে নিয়ে পালিয়েছে সেই অভিজ্ঞতা সর্দার ভুলতে পারছে না। শাঙ্কো বলেছে–আমি একা আপনাদের কী ক্ষতি করতে পারবো?
–তোমার–দল–আসবে–ক্ষতি করবে। সর্দার বলল।
–আমার বন্ধুরা এখানে আসবে না। খাদ্য জলের ব্যবস্থা করা হয়ে গেছে। আমি গেলেই বন্ধুরা জাহাজ ছেড়ে দেবে।
–বিশ্বাস নেই–বন্দী– সর্দার পাহারাদারদের ইঙ্গিত করল। দু’জন পাহারাদার ঘরে ঢুকল। শাঙ্কোকে ঠেলে পাশের একটা ঘরে ঢুকিয়ে দিল। ছোট ঘর। মেঝেয় মোটা কাপড় পাতা। তার নিচে শুকনো ঘাস বিছোনো। ওপাশের দেয়ালে উঁচুতে একটা জানালামত। তাতে গাছের ডাল কেটে বসানো। ঘরে দু’জন বন্দী রয়েছে। একজন শুয়ে আছে। অন্যজন বসে আছে।
পাহারাদার দরজা বন্ধ করে দিল। কয়েদঘরনয়। তবে কয়েদঘরের মত ব্যবহার করা হয়। যে শুয়েছিল সে উঠে বসল। শাঙ্কো কোন কথা বলল না। বলে লাভ নেই। বন্দীরা বুঝবেনা।
শাঙ্কো কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। চিৎ হয়ে শোওয়ার উপায় নেই। পিঠে ক্ষত। ও ভাবল–প্রথম সুযোগেই পালাতে হবে। পিঠের ক্ষতের চিকিৎসা এখানে হবে না। সর্দারকে বলে লাভ নেই। ওষুধ না পড়লে দিন কয়েকের মধ্যেই ক্ষত বিষিয়ে উঠতে পারে। বেঘোরে মারা যেতে হবে। তার আগেই পালাতে হবে। একে বেশ কয়েকদিন খাবার জোটেনি। শুধু ঝর্ণার জল খেয়ে আছে। তার ওপর পিঠে ক্ষতের যন্ত্রণা। শাঙ্কো খুব কাহিল হয়ে পড়ল।
দুপুরে দড়াম্ করে দরজা খুলে গেল। একজন পাহারাদার মাটির হাঁড়িতে খাবার নিয়ে ঢুকল। বন্দীদের খেতে দিল। অন্য পাহারাদারটি খোলা তরোয়াল হাতে দরজায় দাঁড়িয়ে রইল। ক্ষুধার্ত শাঙ্কো খাবারের ওপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ল। পোড়া গোল রুটি আর সামুদ্রিক মাছের ঝোল। রুটি দিয়েছে চারটে। শাঙ্কো গোগ্রাসে গিলল। রুটি শেষ। শাঙ্কো ইশারায় আরো দুটো রুটি চাইল। পাহারাদার ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তরোয়াল হাতে অন্যজন দরজায় দাঁড়িয়েই রইল। পাহারাদার আরও দু’টো রুটি নিয়ে এল। শাঙ্কো খেল। ক্ষুধা মিটল। ও ইঙ্গিতে জল খেতে চাইল। পাহারাদার ইঙ্গিতে ঘরের কোনার দিকটা দেখাল। শাঙ্কো উঠে এল। দেখল একটা কাঠের গামলামত। তাতে জল। একটা কাঠের গ্লাস ভাসছে। ও গ্লাস তুলে পরপর চার গ্লাশ জল খেল। বন্দী দু’জনও খাবার খেয়ে জল খেল। পাহারাদার দু’জন দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
শাঙ্কো কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। বন্দীদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করল। কিন্তু ওরা শাঙ্কোর কোন কথাই বুঝল না। হাল ছেড়ে দিয়ে শাঙ্কো জানলার দিকে তাকাল। ঈস্ যদি ছোরাটা থাকত! ঐ ডালগুলো অনায়াসে কাটা যেত। তারপর ফোকর গলে বেরিয়ে পালানো যেত। কিন্তু সঙ্গে ছোরাটাই তো নেই।
শাঙ্কো জানলা দিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে বুঝল বিকেল হয়ে এসেছে। ও পালাবার ছক কষতে লাগল।
হঠাৎ দড়াম করে দরজা খুলে গেল। শাঙ্কো দেখল ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে ঢুকছে। দরজা বন্ধ হয়ে গেল। শাঙ্কো লাফিয়ে উঠে বসল। বলে উঠল–ফ্রান্সিস। তুমি ধরা। দিতে গেলে কেন? ফ্রান্সিস বিছানায় বসতে বসতে মৃদু হেসে বলল–আহত তুমি। এখানে পড়ে থাকবে আর আমি খাবো ঘুমুবো? এটা হয়?
–কিন্তু দুজনেই বন্দী হয়ে গেলাম যে। শাঙ্কো বলল।
তাতে পালাবার সুবিধেই হবে। যাক গে–খেয়েছো তো? কয়েকদিন তো কিছুই খাও নি। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ খেতে দিয়েছে। এখন অনেকটাই ভালো আছি। শাঙ্কো বলল।
–দু’পায়ে জোর পাচ্ছো? ফ্রান্সিস বলল।
–অনেকটা। শাঙ্কো ঘাড় কাত করে বলল।
–তাহলে ছুটে পালাতে পারবে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ হ্যাঁ। তোমরা খেয়েছে তো? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। তোমার উপস্থিতবুদ্ধি আটাময়দার বস্তা জল বাঁচিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–পালাবার ছক কিছু ভেবেছো? শাঙ্কো বলল।
খাবার দিতে ক’জন পাহারাদার আসে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–দু’জন। শাঙ্কো বলল।
–তরোয়াল থাকে কারো হাতে? ফ্রান্সিস আবার জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ। একজন খাবার দিতে ঘরের মধ্যে আসে। অন্যজন খোলা তরোয়াল হাতে দরজায় পাহারা দেয়। শাঙ্কো বলল।
–হুঁ। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল–ছক কষা হয়ে গেছে।
–বলো কি? তাহলে খাবার দেবার সময়ই পালাবে? শাঙ্কো বলল।
–হ্যাঁ। যে খাবার দিতে আসবে তাকে দরজার ধাক্কায় ফেলে দেয় তরোয়ালওয়ালাকে আমি সামলাবো। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার ছক কাজে লাগবে? শাঙ্কো বলল।
–সেটা নির্ভর করছে কত তাড়াতাড়ি আমরা কাজ সারতে পারি তার ওপর। খাবার দেবার সময় তৈরি থেকো। ফ্রান্সিস বলল।
বন্দী দুজন ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোর কথা শুনছিল। কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছিল না। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো–এদের সঙ্গে কথা বলেছো?
-বলার চেষ্টা করেছি। কিন্তু কিছুই বোঝাতে পারিনি। শাঙ্কো বলল।
দরকার নেই। এদের কাছ থেকে কোন সাহায্য পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। ফ্রান্সিস বলল।
রাত হল। রাত বাড়তে লাগল। কখন খাবার দিতে আসে তার জন্য ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
একসময় দড়াম করে দরজা খুলে গেল। একজন পাহারাদার পাতায় রাখা খাবার নিয়ে ঢুকল! ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। আকারে ইঙ্গিতে বোঝাল ও সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে যাচ্ছে। ও যেন খাবার রেখে দেয়।
