সামনে যে লোকটাকে পেল শাঙ্কো তাকে বলল-আটা ময়দার দোকান কোথায়? বার কয়েক বলাতে হাত দিয়ে খাওয়ার ইঙ্গিত করাতে লোকটা বুঝল। হাত বাড়িয়ে একটা ঘর দেখাল। শাঙ্কোরা ঘরটার কাছে এল। এবড়োখেবড়ো কাঠের দরজা বন্ধ। শাঙ্কো দরজায় ধাক্কা দিল। ততক্ষণে রোদ উঠেছে। চারদিক পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বাজার এলাকা। লোকজন বাজার হাট করতে আসছে। দড়াম করে দরজা খুলে গেল। একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে। শাঙ্কো বলল–আটা ময়দা আছে? লোকটি বুঝল না। শাঙ্কো হাত বাড়িয়ে কয়েকটা কাপড়ের রাস্তা দেখাল। শাঙ্কো কোমরের ফেট্টি থেকে দুটো সোনার চাকতি বার করে লোকটির হাতে দিল। লোকটা খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠল। দ্রুত কী বলে গেল। বোধহয় আটা ময়দা নিয়ে যেতে বলল। শাঙ্কোরা কাপড়ের বস্তাসুদ্ধ আটা ময়দা কাঁধে তুলে নিয়ে জাহাজ ঘাটার দিকে চলল।
তখনই শাঙ্কো দেখল দু’জন পাহারাদার খোলা তরোয়াল হাতে বাজারে ঘুরছে। শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল, –ছোট্টো। চারজনই বাজারের ভিড়ের মধ্যে দিয়ে ছুটল। পাহারাদার দু’জন ঠিক বুঝল না। শাঙ্কোরা ততক্ষণে ভিড়ে মিশে গেছে।
ওরা বস্তাপঁধে নৌকার কাছে এল। একটা নৌকো ঠেলে জলে নামাল। বস্তাগুলো নৌকায় তুলল। সঙ্গী বন্দুটিকে শাঙ্কো বলল–তুমি নৌকা নিয়ে চলে যাও। আমরা পীপে নিয়ে জল আনতে যাচ্ছি। বন্ধুটি বস্তা বোঝাই নৌকা জাহাজের দিকে চালাল।
এবার অন্য নৌকা থেকে তিনজন তিনটে জলের পীপে কাঁধে নিয়ে বাজার এলাকায় ঢুকল। শাঙ্কো সেই দোকানদার কাছে এল। ইশারায় পীপে দেখিয়ে জলের কথা বলল। দোকানদার বুঝল। হেসে পাহাড়ের দিকে দেখাল।
তিনজনে পীপে কাঁধে পাহাড়টার দিকে চলল।
পাহাড়ের নিচে বনভূমি। গভীর বন নয়। পাহাড়ের ঢাল দিয়ে দু’জন স্ত্রীলোক কাঠের বালতিমত নিয়ে আসছে। শাঙ্কো বুঝল ওরা জল আনছে। ততক্ষণে ওরা ঝর্ণার জলধারার মৃদুশব্দ শুনছে। শব্দ লক্ষ্য করে এগোতেই ঝর্নাটা পেল। তিনটে পীপেতে জল ভরল। তারপর তিনজনেই, আঁজলাভরে জল খেল। পেট ভরেই খেল। তারপর গায়ে মাথায় জল ছিটোলো। বেশ কয়েকদিন পরে তৃপ্তিভরে জল খাওয়া। তবে উপোসী পেটে এখনও খাবার পড়েনি। তবে নিশ্চিন্ত। সে ব্যবস্থা করেছে।
জলভরা পীপে কাঁধে নিয়ে ফিরে বাজার এলাকায় এল। এবার পাহারাদার দুজনের নজরে পড়ল। শাঙ্কো লক্ষ্য করল সেটা। চাপা স্বরে বলল–জোরে পা চালাও। তিনজনেই পীপে কাঁধে প্রায় ছুটে চলল। সমুদ্রতীরে পৌঁছোলোও। নৌকোয় পীপে তিনটে তুললও। টেনে নিয়ে নৌকো নামাচ্ছে তখনই পাহারাদাররা তরোয়াল তুলে ছুটে এল। শাঙ্কো বলে উঠল–তোমরা নৌকো চালাও। আমি সাঁতরে যাবো। কিন্তু তার আগেই একজন পাহারাদার শাঙ্কোর গায়ে তরোয়ালের ঘা বসাল। শাঙ্কোর আর জলে নামা হল না। ও বালির ওপর গড়িয়ে পড়ল। তারপর দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে জামার ভেতর থেকে ছোরা বের করল। এক ঝটকায় সরে এসে সেই পাহারাদারেরা হাতে ছোরা বসিয়ে দিল। তরোয়াল ফেলে পাহারাদারটি বালির ওপর বসে পড়ল। অন্য পাহারাদারটি তখন সতর্ক হয়ে গেছে। সে তরোয়ালের ডগাটা শাঙ্কোর বুকের ওপর ঠেকিয়েছে। শাঙ্কো দ্রুত ওর ছোরাটা ওদের নৌকোর ওপর ছুঁড়ে দিল। ছোরা নৌকোর গলুইয়ের মধ্যে পড়ল। শাঙ্কো আর এক পাহারাদার দু’জনেই আহত। অক্ষত পাহারাদারটি শাঙ্কোকে বাজারের দিকে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। আহত শাঙ্কো কোন কথা না বলে চলল। ওর পেছনে অক্ষত পাহারাদারটি চলল। আহত পাহারাদারও চলল।
বাজারের মধ্যে দিয়ে যাবার সময় অনেক লোক ওদের তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। পাহারাদাররা একটা বড় বাড়ির সামনে শাঙ্কোকে নিয়ে এল। পাথর আর কাঠ দিয়ে তৈরি বাড়ি। ছাউনি লম্বা লম্বা শুকনো ঘাস আর কাঠের। কাঠ সব এবড়োখেবড়ো। লম্বা বারান্দা পাথরের। শাঙ্কো দেখল আরও কয়েকজন পাহারাদার বারান্দায় কোমরে মোটা কাপড়ের ফেট্টিতে তরোয়াল গুঁজে বসে আছে। গত কয়েকদিন খাদ্য জল জোটে নি। শরীর এমনিতেই দুর্বল। তার ওপর পিঠ দিয়ে তখনও রক্ত গড়াচ্ছে। শাঙ্কো বেশ কাহিল হয়ে পড়ল। একটাই আশাবন্দী যখন করেছে খাদ্য জল তো খেতে দেবে। তখন যদি শরীরে কিছু জোর পায়।
এবড়ো-খেবড়ো কাঠের দরজায় একজুন পাহারাদার হাত ঠুকে শব্দ করল। দরজা খুলে গেল। বেশ লম্বা একজন বয়স্ক লোক দরজা খুলে দাঁড়াল। পাহারাদার মাথা একটু নিচু করে নিয়ে অনর্গল কিছু বলে গেল। আহত পাহারাদারকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। শাঙ্কো বুঝল ওর বিরুদ্ধে অভিযোগের কথা বলল।
লম্বা লোকটি শাঙ্কোকে ভেতরে নিয়ে আসার ইঙ্গিত করল। পাহারাদার শাঙ্কোকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিল। ঘরের অন্ধকার ভাবটা চোখে সয়ে আসতে শাঙ্কো দেখল ঘরে একটা পাথর আর কাঠের তৈরি চৌকি মত। তাতে মোটা চাদর কাপড়চোপড় পাতা। লম্বা লোকটি বিছানায় গিয়ে বসল। শাঙ্কো বুঝল এই লোকটি এদের সর্দার। সর্দার স্পেনীয় ভাষায় ভাঙা ভাঙা শব্দ জুড়ে বলল–এখানে–এসেছো–কারণ?
–আমরা বিদেশী–ভাইকিং। জাহাজ চড়ে এখানে এসেছি। জাহাজঘাটায় আমাদের জাহাজ নোঙর করা আছে। আমাদের জাহাজে খাদ্য আর জল ফুরিয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন আগে। আমরা এখানে আটাময়দা চিনি জল নিতে নেমেছিলাম। আপনার পাহারাদার–এই দেখুন–কথা থামিয়ে শাঙ্কো পিঠ দেখাল। তখনও কাটা জায়গা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছিল। শাঙ্কো বলল–আপনার পাহারাদারই প্রথমে তরোয়াল চালিয়েছিল। তারপরে আমি-শাঙ্কোকে থামিয়ে দিয়ে সর্দার বলে উঠল তোমরা দস্যু। আগে–এসেছিলে–স্ত্রীপুরুষ ধরে নিয়ে গেছো–ক্রীতদাস।
