আকাশে চাঁদেরআলোঅনেকটা উজ্জ্বল। জোরহাওয়া ছুটছে। জড়ো হাওয়া বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–ভাইসব। এই অভিযানে বেরোবার সময় আমি বলেছিলাম অনেক সমস্যা আমাদের সামনে আসতে পারে। জল খাদ্য ফুরিয়ে যেতে পারে। আমরা দিক্ভ্রষ্ট হতে পারি। ভীষন বিপদে পড়তে পারি কিন্তু অধৈর্য হলে চলবে, না ভয় পাওয়া চলবে না। অভিযান চালিয়ে যেতে হবে। একটু থেমে ফ্রান্সিস বলতে লাগল– শুনলাম তোমাদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। আমার ওপর তোমরা বিশ্বাস হারাতে বসেছো। যদি তাই হয় আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। তোমাদের মধ্যেই কেউ জাহাজের দায়িত্ব নাও। যেভাবে জাহাজ চালাতে চাও চালাও। যেভাবে পারো সমস্যার মোকাবিলা কর। ফ্রান্সিস। থামল। গত কয়েকদিন কিছুই খায়নি ও। শুধু গলা ভেজানোর মত জল খেয়ে আছে। বুঝতে পারছেশরীর বেশ দূর্বল হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস হাঁপাতে লাগল।
বন্ধুদের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হল। শাঙ্কো ভিড়ের মধ্যে থেকে গলা চড়িয়ে বলল ফ্রান্সিস–আমরা তোমার ওপর বিশ্বাস হারাই নি। শুধু দুশ্চিন্তায় পড়ছি এই খাদ্যাভাব জলাভাবে আর কতদিন আমাদের চলবে? আসলে আমাদের সহ্য শক্তির পরীক্ষা চলছে। আমরা নিশ্চয়ই এই পরীক্ষায় উত্তীর্ন হবো। আমাদের ধৈর্য হারালে চলবে না। শাঙ্কো থামল। কয়েকজন বন্ধু শাঙ্কোকে সমর্থন করল। এবার হ্যারি উচ্চস্বরে বলল ভাইসব–ফ্রান্সিস শাঙ্কোর বক্তব্য শুনলে। এবার তোমরাই বিচার কর আমাদের করণীয় কি? ফ্রান্সিসের ওপর বিশ্বাস হারালে আমাদের বিপদ বাড়বে বই কমবে না। একমাত্র ফ্রান্সিসই আমাদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। একটু থেমে হ্যারি বলল–খাদ্যাভাব জলাভাবের সমস্যা আমাদের কাছে খুব নতুন কিছু নয়। সেই সমস্যার সমাধানও হয়েছে। অনেকদিন জাহাজ চলছে। অচিরেই ডাঙার দেখা পাবো। সব সমস্যার সমাধান হবে। শুধু অনুরোধ-অধৈর্য হয়ো না।
বন্ধুরা নিজেদের মধ্যে কথা বলতে লাগল। গুঞ্জন চলল। এবার কয়েকজন বন্ধু বলে উঠল–আমরা ধৈর্য হারাবো না। ফ্রান্সিস–তোমাকে আমরা অবিশ্বাস করবো না।
–ঠিক এই উত্তরই আমি তোমাদের কাছ থেকে আশা করেছিলাম। ফ্রান্সিস বলল। বন্ধুদের জটলা ভেঙে গেল। সবাই ঘুমুতে চলে গেল। সবাই জানে খালি পেটে জলের তৃষ্ণা নিয়ে ভাল ঘুম হয় না। তবু শুয়ে থাকা। শরীরের দুর্বলতা কাটাতে এছাড়া উপায় নেই।
সবাই চলে গেলে হ্যারি বলল–ফ্রান্সিস আমি জানি তুমি না খেয়ে আছো।
–উপায় কি! মারিয়া উপবাস সহ্য করতে পারবে না। ওকে তো পেট পুরে খাওয়াতে হবে।
–ঠিক আছে। দুর্বল শরীরে তুমি রাত জেগে না। ঘুমুতে যাও। হ্যারি বলল।
–তুমিও তো দূর্বল হয়ে পড়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার শরীর তো জানো বরাবরই দূর্বল। এখন আরো দূর্বল হয়ে পড়েছি এই যা। হ্যারি বলল।
–ঠিক আছে। তুমি যাও। আমি পেড্রোর সঙ্গে কথা বলে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি চলে গেল। ফ্রান্সিস উচ্চস্বরে ডাকল। পেড্রো?
-বলো। মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রোর গলা শোনা গেল।
সাবধান। ঘুমিয়ে পড়বে না। আর একটা কথা-খাওয়া হয়েছে?
–না। না খেয়ে ভালো আছি। ঘুম আসবে না। পেড্রো বলল।
নেমে এসে একটু জল খেয়ে নাও। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি ঠিক আছি। আমার কথা ভেবো না। পেড্রো বলল।
ফ্রান্সিস আর দাঁড়াল না। সিঁড়িঘরের দিকে চলল।
শেষ রাতের দিকে হঠাৎ মাস্তুলের উপর থেকে পেড্রোর চিৎকার শোনা গেল– ভাইসব–ডাঙা দেখা যাচ্ছে–ডাঙা। ফ্রান্সিসের তন্দ্রামত এসেছিল। তা ভেঙে গেল। ও প্রায় ছুটে ডেক-এ উঠে এল। ডেক-এ যারা ঘুমোচ্ছিল, যারা তন্দ্রাচ্ছন্ন ছিল সবাই উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস জাহাজের রেলিং ধরে দাঁড়াল। বন্ধুরাও কাছে এসে দাঁড়াল। পেড্রো মাস্তুলের ওপর থেকে চেঁচিয়ে বলল–ডানদিকে–পাহাড়-বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিস চোখ কুঁচকে ডানদিকে তাকাল। মোটামুটি স্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখল সমুদ্রতীরে একটা ছোট বন্দর মত। খুব বড় বন্দর নয়। বন্দরে কোন জাহাজও নোঙর করা নেই। বাড়িঘরও কিছু দেখা গেল। একপাশে একটা পাহাড়।
ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। জাহাজ সমুদ্রতীরে ভেড়ানো হবে কিনা। জানা নেই এটা কোন দ্বীপ না দেশের অংশ। কিন্তু জাহাজে অনাহার চলছে। জলও প্রায় তলানিতে ঠেকেছে। খাদ্য চাই, জল চাই। কাজেই নামতে হবে এখানে। কারা থাকে এখানে, নামলে কোন বিপদে পড়তে হবে কিনা এসব ভাবার সময় নেই।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এসে দাঁড়াল। বলল–কী করবে এখন?
নামতে হবে। আর এক্ষুণি। আটা-ময়দা-চিনি জল সব জোগাড় করতে হবে। খুব দ্রুত কাজ সারতে হবে। বিপদে পড়ার আগেই। ফ্রান্সিস বলল। তারপর শাঙ্কোকে ডাকল। শাঙ্কো কাছে এলে বলল–শাঙ্কো–আমি শরীরের দিক থেকে একটু দুর্বল হয়ে পড়েছি। তুমি সিনাত্রা বিস্কো আর একজন বন্ধুকে নিয়ে যাও। বস্তা পীপে নিয়ে যাও। আটা-ময়দা জল যা পাও নিয়ে এসো। দেরি নয়। এখুনি। ভোর হয়েছে। তৈরি হয়ে এসো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই শাঙ্কো সিনাত্রা বিস্কো আর এক বন্ধু তৈরি হয়ে এল। হালের দিকে দড়ির সিঁড়ি দিয়ে বস্তা পীপে নিয়ে একটা নৌকোয় নামাল। অন্যটায় দাঁড় হাতেবসল। সিনাত্রারাও বসল। দুটো নৌকো তীরের দিকে চলল।
নৌকো দু’টো তীরে ভিড়ল। তীরের বালির ওপর নৌকো ঠেলে তুলে চলল বাড়িঘরগুলোর দিকে। ওখানকার বাসিন্দাদের দেখল। বেঁটে মত। গায়ের রঙ কিছুটা তামাটে। মাথায় লম্বা লম্বা চুল। নাক একটু চ্যাপ্টা মত। ওরা বেশ অবাক হয়েই শাঙ্কোদের দেখছিল। এই বিদেশীরা কোত্থেকে এল?
