–কেন দুশ্চিন্তা করছো? এর আগেও আমরা কিছুদিনের মধ্যেই ডাঙা খুঁজে পেয়েছি। এবারও পাবো। তুমি হতাশ হয়ে পড়লে কার ওপর ভরসা করবো আমরা? তোমার মনের জোর আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। মনটা শান্ত রাখো।
–হ্যারি–আমার চিন্তা তো শুধু আমার নিরাপত্তা নিয়ে নয়। এত বন্ধু, মারিয়া সবার কথাই তো আমাকে ভাবতে হয়। যদি সত্যি বিপদজনক কিছু ঘটে তার দায় তো আমি এড়াতে পারি না। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
বিপদ তো যে কোন মুহূর্তে হতে পারে। তোমার নেতৃত্বে আমারা তো অনেক বিপদের মোকাবিলা করেছি। এখনও করবো। তা ছাড়া তোমার ভুলে তো আমরা দিক্ভ্রান্ত হয়ে পড়িনি। বলা যায় এটা নিয়তি। এতে কারো হাত নেই। ডাঙার দেখা পাবোই। দেশে ফেরার পথ খুঁজে পাবই। অনুরোধ সকলের কথা ভেবে নিজের মন দুর্বল করে ফেলো না। হ্যারিও মৃদুস্বরে বলল। এসব কথা যাতে ভাইকিং বন্ধুদের কানে না যায় তাই দু’জনেই মৃদুস্বরে কথা বলছিল। এমন কি ফ্রান্সিস এই নিয়ে মারিয়াকেও কিছু বলেনি। মারিয়া থাকুক ওর মন-খুশি নিয়ে। ওকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে কী লাভ?
রাত বাড়ছে। দু’জনে ঘুমুতে চলে গেল।
ফ্রান্সিস নিজের কেবিন-ঘরে ঢুকল। বিছানায় শুয়ে পড়ল। ভেবেছিল মারিয়া ঘুমিয়ে পড়েছে। তখনই শুনল মারিয়া বলছে
–এত রাত পর্যন্ত ডেক-এ একা একা পায়চারি কর। কী ভাব এত?
–ভাবনার কি শেষ আছে? তাছাড়া রাতে ডেক-এ পায়চারি করা আমার অভ্যেস। তুমি ঘুমোও। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–তুমি ডেক থেকে না নামা পর্যন্ত আমি ঘুমাতে পারিনা মারিয়া বলল।
–এটা তোমার বাড়াবাড়ি। তাছাড়া প্রত্যেক দিন তো আমি ডেক-এ পায়চারি করি না। তুমি মিছিমিছি রাত জাগবে কেন? ফ্রান্সিস বলল।
-তোমার কোনরকম দুশ্চিন্তা হলে তুমি এটা করো। মারিয়া বলল।
–হ্যাঁ–দুশ্চিন্তা তো হয়। ফ্রান্সিস বলল।
জানি তোমার দুশ্চিন্তা কি? মারিয়া বলল।
ফ্রান্সিস সাবধান হল। বলল–আরে বাবা দুশ্চিন্তা তো এক সময় কেটে যায়। কতবার কয়েদঘয় থেকে পালালাম, ক্রীতদাসের জীবন থেকে পালালাম। দুশ্চিন্তা একদিন কেটে যায়।
–তুমি অনেকদিন হল ডাঙ্গার দেখা পাচ্ছ না। এটাই তোমার দুশ্চিন্তা মারিয়া বলল।
–আরে না না। মাঝে মাঝে কতদিন ডাঙা খুঁজে পাই নি। পরে তো পেয়েছি। সেসব নয়–এমনি এটা ওটা ভাব নাও। তুমি ঘুমোও। তুমি খুশি থাকো এটাই আমি চাই। ফ্রান্সিস বলল।
-তোমাকে চিন্তাগ্রস্ত দেখলে আমি খুশি থাকি কী করে? মারিয়া বলল।
ওসব পাগলামি ছাড়ো। ফ্রান্সিস হাল্কাসুরে বলল। মারিয়া আর কোন কথা বলল না। পাশ ফিরে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
আরও দিন সাতেক কাটল। কিন্তু ডাঙার দেখা নেই। এদিকে খাবার আর পানীয়, জল ফুরিয়ে এসেছে। শুরু হল কৃচ্ছসাধন। অর্থাৎ যথাসম্ভব জল কম খাওয়া খাবার কম খাওয়া। ভাইকিং বন্ধুদের চিন্তা শুরু হল। এভাবে কতদিন চলবে? ডাঙার দেখা না পেলে সবাইকে উপবাসী থাকতে হবে। উপোস করে তবু কিছুদিন থাকা যায় কিন্তু জল না খেয়ে থাকা তো মারাত্মক।
দিন কাটে। রাত কাটে। খাবার প্রায় শেষ। সবাই একটা করে রুটি আর গলা ভেজাবার মত জল খেতে লাগল। এভাবেই চলল। তারপর দুদিন না জল না খাবার। ফ্রান্সিস মারিয়াকে বুঝতে না দিয়ে নিজের রুটি জল মারিয়াকে দিতে লাগল। মারিয়া জিজ্ঞেস করে–তুমি কখন খেলে?
–আমি আগেই খেয়ে নিয়েছি। ফ্রান্সিস হেসে বলে। জাহাজে চরম খাদ্য জল ঘাটতির কথা মারিয়াকে বুঝতে দেয় না।
কিন্তু আর কতদিন? ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। ফ্রান্সিস রাতে ঘুমুতে পারে না। মারিয়া ঘুমিয়ে পড়লে ও ডেক-এ উঠে আসে। প্রায় সারারাত ডেক-এ পায়চারি করে আর ডাঙার খোঁজে চারিদিকে তাকায়। মাঝে মাঝে মাস্তুলের উপর উঠে যায়। পেড্রোর সঙ্গে বসে চারিদিকেতাকায়। ডাঙার দেখা পেতেইহবে। নইলে খাদ্যাভাব জলাভাবে সবাইকে মরতে হবে। তৃষ্ণা সহ্য করতে না পেরে কয়েকজন বন্ধু সমুদ্রের লবণাক্ত জলই খেয়ে রে ফেলেছিল। বমি করে অসুস্থ হয়ে পড়েছে তারা। এই ঘটনার পর বন্ধুদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়ল। ফ্রান্সিস তো নিজের চিন্তায় মগ্ন। বন্ধুদের অসন্তোষের কথা ওর জানার কথা নয়। তবে বন্ধুদের ব্যবহারে কিছুপরিবর্তন লক্ষ্য করছিল।
সেদিন রাতে ফ্রান্সিস ডেক-এ পায়চারি করছে আর চারিদিকে তাকাচ্ছে তখনই হারি এল। দু’এককথার পর বলল–ফ্রান্সিস কিছু মনে করো না। জাহাজে খাদ্য জল শেষ।
-জানি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
–বন্ধুদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বেঁধেছে। ওদের বক্তব্য আমরা পথ হারিয়েছি। কোথায় চলেছি আমরা জানি না। এরজন্য তোমাকেই দোষী সাব্যস্ত করতে চলেছে। হ্যারি আস্তে আস্তে বলল।
–তাহলে ব্যাপার অনেকদূর গড়িয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। হ্যারি মাথা ওঠা নামা করল।
–ঠিক আছে। ডাকো সবাইকে। ফ্রান্সিস বলল।
–অনেকেই বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে। হ্যারি বলল।
কই? আমি তো ঘুমোইনি। সবাইকে ডেকে এ আসতে হবে। ডেকে আনো সবাইকে। একে খাদ্যভাব জলাভাব এর মধ্যে ওদের অসন্তোষ বাড়তে দেওয়া যায় না। ফ্রান্সিস দৃঢ়স্বরে বলল।
হ্যারি চলে গেল। কিছু পরে বন্ধুরা একে একে জাহাজের ডেক-এ উঠে এল। কয়েকজন ডেক-এ ঘুমিয়ে ছিল। তারাও উঠে দাঁড়াল।
