–বেশ। মন্ত্রণাকক্ষ ভোরেই খুলে দেওয়া হয়েছে। আপনারা গিয়ে বসুন। প্রহরীটি বলল।
ফ্রান্সিসরা বাক্স নিয়ে মন্ত্রণাকক্ষে এসে বসল। ওরা অপেক্ষা করতে লাগল কখন রাজা আসেন তার জন্যে।
কিছুক্ষণ পরেই রাজা এনিমার ঘরে ঢুকলেন। ফ্রান্সিসরা একটু উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। রাজা বসতে বসতে বললেন–বসো বসো। এই সকালে এসেছে। কী ব্যাপার? ফ্রান্সিস বলল–আপনার পূর্বপুরুষ রাজা সিয়োভোর রত্নভান্ডার আমরা বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্ধার করেছি।
-কোথায় সেই রত্ন ভাণ্ডার? রাজা সাগ্রহে জিজ্ঞেস করলেন।
–আপনার সম্মুখে। কথাটা বলে ফ্রান্সিস হাতল ধরে বাক্সটার ডালা খুলল। রাজা অবাক চোখে সেই চুনি-পান্না-হীরে জহরতের ভান্ডারের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর সোল্লাসে বলে উঠলেন–তোমরা তো অসাধ্য সাধন করেছে। তারপর চুনি পান্না জহরৎ মুঠো করে তুলে তুলে দেখলেন। বললেন–তোমরা উদ্ধার করেছো। তোমরাও কিছু নাও।
–না। আমরা কিছু নিই না। আমাদের মাফ করবেন। ফ্রান্সিস বলল।
এবার হ্যারি কালো ছোট বাক্সটা দেখিয়ে বলল–শুধু এই বাক্সটা আমরা নেব।
বেশ তো। রাজা বললেন।
–বলো কি? যাক গে–এই লাগাস রাজ্য তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞ রইল। রাজা বললেন।
–আমার কয়েকটা কথা ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। বলল। রাজা বললেন।
-আমরা প্রাচীন প্রাসাদের প্রার্থনাঘরের মেঝেয় করা লাইলাক ফুলের নকশার নিচে থেকে এই রত্নভাণ্ডার উদ্ধার করেছি। খুব যত্নের সঙ্গে লাইলাক ফুলের নকশাটা ঐ ঘরেই রেখে দিয়েছি। বড় সুন্দর নকশাটা। অনুরোধ ওটা আপনার প্রাসাদে এনে রাখুন।
-খুব ভালো বলেছো। নিশ্চয়ই এখানে রাখবো। রাজা বললেন।
–আর একটা কথা। এই বাক্সে রত্নগুলো মাত্র অর্ধেক রাখা হয়েছে বলে আমার মনে হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে আরো রত্নভান্ডার আছে? রাজা জানতে চাইলেন।
-হ্যাঁ। মহামান্য রাজা। আপনার রাজত্বে যেখানে যেখানে লাইলাক ফুলের নকশা রয়েছে যেমন অন্দরমহলের একটা দেয়ালে আর মন্দির–ঘরের বেদীতে সেসব ভাঙলে আরও মণিমাণিক্য হীরে জহরত পাওয়া যাবে।
–ওসব ভেঙে নষ্ট করবো? রাজা বললেন।
–সেটা আপনার বিবেচনা। আমি শুধু সম্ভাবনার কথা বললাম। ফ্রান্সিস বলল।
–ভেবে দেখি। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। আমাদের কাজ শেষ। আমরা জাহাজঘাটে আমাদের জাহাজে ফিরে যাচ্ছি। আপনার সাহায্যের জন্য অনেক ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস বলল। রাজা উঠে দাঁড়ালেন। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়াল।
রাজবাড়ির বাইরে এসে হ্যারি বলল–তাহলে এখন জাহাজে ফিরে যাই।
না। দুপুরের খাওয়াটা সেরে যাবো। কাজও তো হয়ে গেছে। এখন আর এখানে থাকবো কেন? ফ্রান্সিস বলল।
দুপুরে খাওয়া সেরে সবাই জাহাজঘাটের দিকে চলল। ওরা জাহাজে উঠতেই গনিবন্ধুরা ছুটে এল। মারিয়া হাসিমুখে এগিয়ে এল। বলল–রাজা সিয়োভোর রত্নভান্ডার নিশ্চয়ই উদ্ধার করতে পেরেছো? ফ্রান্সিসও হাসলো। বলো। একটা তিনকোণা বাক্স প্রায় ভর্তি চুনি পান্না হীরে জহরৎ। রাজা এলিমার খুব খুশি। কিন্তু
আমাদের হাত শূন্য।
-তোমরা নিরাপদে ফিরে এসেছো এটাই আমার কাছে অনেক। তবে শাঙ্কো নাকি অসুস্থ। ওকে আমি আর ভেন মিলে কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ করে তুলবো। ওর জন্যে ভেবো না।
হ্যারি এতক্ষণ সেই কালো কাঠের কারুকাজকরা ছোট বাক্সটা দুহাতে পেছনে ধরে ছিল। মারিয়া দেখতে পায়নি। এবার বাক্সটা এগিয়ে ধরে বলল-রাজকুমারী আমাদের হাত একেবারে শূন্য নয়। এই নিন বাক্সটা। বাক্সটা হাতে নিয়ে মারিয়া শিশুর মত লাফিয়ে উঠল–ঈস্ কী সুন্দর বাক্সটা। বিকেলের রোদ পড়ে বাক্সটার গায়ের সোনারূপোর কাজকরা ফুললতাপাতাগুলো চক্ করছিল তখন।
বন্ধুরা ততক্ষণে বিনেলোর মুখে সব শুনেছে। কারুকার্যময় ছোট বাক্সটাও দেখল। আনন্দে সবাই ধ্বনি তুলল—ও–হো–হো।
ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব-নোঙর তোল। পাল তোল। দাঁড় বাও। ফ্লেজারকে বলো জাহাজ চালাতে উত্তর-পূর্ব মুখো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজ চলতে শুরু করল।
মৃত্যু-সায়রে ফ্রান্সিস
সেদিন গভীর রাত। একেবারে অন্ধকার রাত নয়। অস্পষ্ট জ্যোৎস্নার আলোয় চারদিক মোটামুটি দেখা যাচ্ছে।
প্রায় দিন পনেরো হতে চলল–ডাঙার দেখা নেই। ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। ফ্রান্সিস খুবই চিন্তায় পড়ল। তবে নিজের দুশ্চিন্তা প্রকাশ পেতে দিল না। বন্ধুরা তাকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত দেখলে তাদের মনোবল ভেঙে যেতে পারে। সেক্ষেত্রে বিপদ বাড়বে বই কমবে না।
রাত হলে ফ্রান্সিস জাহাজের ডেক-এ উঠে আসে। চারিদিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। কখনও কখনও উঁচু গলায় পেড্রোকে ডেকে বলে–পেড্রো ঘুমিয়ে পড়ো না। ডাঙার দেখা পেতেই হবে। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপর নিজের জায়গায় রাত জেগে জেগে চারদিকে নজর রাখে। ও চেঁচিয়ে বলে কিছছু ভেবো না। আমি জেগে আছি। পেড্রোকে একই সঙ্গে দুটো কাজ করতে হয়। তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে ডাঙার খোঁজ করতে হয় আবার হঠাৎ জলদস্যুদের দ্বারা তাদের জাহাজ আক্রান্ত হতে না হয় সেদিকেও নজর রাখতে হয় দু’বার ঘুমিয়ে পড়েছিল বলে জলদস্যুদের পাল্লায় পড়তে হয়েছিল। কাজেই কড়া নজরদারি চালাতে হয় ওকে।
রাতে ফ্রান্সিস যখন একা একা ডেক-এ পায়চারি করে বেড়ায় হ্যারি উঠে আসে। একমাত্র হ্যারিকেই ফ্রান্সিস নিজের দুশ্চিন্তার কথা বলে। হ্যারি অবশ্য সান্ত্বনা দেয়। বলে–
