কয়েকদিন কাটলো। লা ব্রুশের মনে শান্তি নেই। সমস্ত চাঁদের দ্বীপের রাজ্য এখন ওর। মুক্তোর সমুদ্র হাতের কাছে–ওরই অধিকারে। অথচ মুক্তো তোলা যাচ্ছে না। মুক্তোর সমুদ্রে যতমুক্তো আছে, সব চাইওর। কিন্তু এনে দেবে কে? যে ক’জন ভাজিম্বাকে শাস্তিঘরে রাখা হয়েছে, সবক’জনইবৃদ্ধ-অথর্ব। তারা মুক্তো আনতে পারবে না। জলদস্যুরা ওর হুকুমে শক্ত সামর্থ্য ভাজিম্বাদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। কিন্তু কাউকে ধরতে পারছে না। বনের মধ্যে সব যেন হাওয়ায় মিলে গেছে।
ক্রুদ্ধ লা ব্রুশ কখনও কাঠের সিংহাসনে উঠে কাঠের পা নিয়ে লাফাচ্ছে, কখনও বিনা কারণে বড় সর্দারকে যাচ্ছেতাই বলছে, তরোয়াল খুলে জলদস্যুদের তাড়া দিচ্ছে–যে করে হোক, শক্ত সমর্থ ভাজিম্বাদের ধরে আনো।
বড় সর্দার, জলদস্যুরা লা ব্রুশের ভয়ে সন্ত্রস্ত।
এদিকে কয়েদ ঘরে ফ্রান্সিসদের একঘেঁয়ে দিন কাটছে। বেনজামিনের কাছে ওরা শুনেছে চাঁদের দ্বীপ এখন লা ব্রুশের কবজায়। রাজা, সেনাপতি সব পালিয়েছে।
সেদিন সকালে খাবার নিতে এলে বেঞ্জামিনকে ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল–লা ব্রুশ কবে ক্যারাভেল-এ ফিরবে?
–সব মুক্তো না নিয়ে ফিরবে না ক্যাপ্টেন।
–সে কি এখনও মুক্তো পায় নি?
–চারজন জিম্বাকে নামিয়েছিল। তিনজন জল থেকে উঠতেই পারে নি। একজন মাত্র একটা মুক্তো এনে দিয়েইম’রে গেছে। লোকটার সারা গা ফুটো-ফুটো হয়ে গিয়েছিল।
ফ্রান্সিস ম্লান হাসল। বললো–হবেই তো মুক্তোর সমুদ্রের প্রহরী লা মাছ বড় সংঘাতিক।
খাবার দিতে-দিতে বেঞ্জামিন অবাক চোখে ওর দিকে তাকিয়ে বললো–তুমি জানলে কি করে?
–আমি জানি। ক্যাপ্টেনকে বলো আমি মুক্তো এনে দিতে পারি।
হ্যারি চমকে উঠল। চাপাস্বরে বলল–কী বলছো যা-তা।
ফ্রান্সিস ওর দিকে তাকালো। বললে–হ্যারি আমাদের মুক্তির এ ছাড়া আর কোন পথ নেই।
–কিন্তু খুনী লা ব্রুশের কি লোভের শেষ আছে?
–দেখা যাক না। এটাই আমাদের মুক্তির শেষ চেষ্টা। বেঞ্জামিন যখন ফিরে যাচ্ছে, তখন ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে বলল–কথাটা ক্যাপ্টেনকে ব’লো
একঘন্টা সময় কাটেনি। বেঞ্জামিন হাঁপাতে-হাঁপাতে কয়েদঘরে এসে তুকলো ফ্রান্সিসের কাছে এলো। ওর হাতকড়া খুলতে খুলতে বলল–চলো, তোমাকে ক্যাপ্টেন ডেকেছে।
ফ্রান্সিস উঠতে গেল। হ্যারি ওর হাত চেপে ধরল–তুমি পাগল হয়েছো?
ফ্রান্সিস হ্যারির হাতে চাপা দিয়ে ম্লান হাসলো–যদি আমার প্রাণের বিনিময়ে আমার এতগুলো বন্ধু মুক্তি পায়, তাহলে ক্ষতি কি?
–না, তোমাকে যেতে দেব না। হ্যারির চোখে জল এসে গেল।
–ছিঃ, হ্যারি, কাঁদছে? আমরা না ভাইকিং? ফ্রান্সিস বলে উঠল। হ্যারি আস্তে আস্তে ফ্রান্সিসের হাত ছেড়ে দিলো। ফ্রান্সিস বেঞ্জামিনের অলক্ষ্যে একবার কোমরে গোঁজা আয়নাটায় হাত বুলিয়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। লোহার দরজার কাছে একবার ঘুরে দাঁড়াল। বললো ভাইসব যদি আমি না ফিরি, তবে হ্যারিকে তোমরা দলনেতা বলে মেনে নিও। ও যা বলবে তাই করো।
কথাটা বলে ফ্রান্সিস দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল। ভাইকিংদের মধ্যে গুঞ্জন উঠল। সবাই হ্যারির মুখে ঘটনাটা শুনল। ওদের মুক্তির বিনিময়ে ফ্রান্সিস তার নিজের জীবনটা বাজি ধরেছে। সকলেই হৈ-হৈ করে উঠল–ফ্রান্সিসকে ফিরিয়ে আনো। ওর জীবনের বিনিময়ে আমরা মুক্তি পেতে চাই না।
হ্যারি ভাইকিংদের লক্ষ্য করে বললো–ভাইসব–তোমরা শান্ত হও। শোন–ফ্রান্সিস মুক্তোরসমুদ্রের ভয়াবহ বিপদের কথা সবই জানে। সেই বিপদ থেকে বাঁচবার উপায়ও জানে। শুধ মুক্তোর সমুদ্র থেকে বেরিয়ে আসার রহস্যটা ওর অজানা। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করো যেন এই রহস্যাটাও ভেদ করতে পারে। তাহলেই ওর জীবনের কোন আশঙ্কা থাকবে ্না। সকলেই চুপ করে হ্যারির কথা শুনল। কেউ আর কোন কথা বলল না।
বেঞ্জামিনের পেছনে-পেছনে যখন ফ্রান্সিস কয়েদঘরের বাইরে এসে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগল, তখন চোখে আলো লাগাতে ওর অস্বস্তি হতে লাগল। ডেক-এ উঠেই বাইরের উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকাতে পারল না। চোখ জ্বালা করে বুঝে এল। ও দুহাতে চোখ ঢেকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বেঞ্জামিন ওর দিকে তাকিয়ে বলল–হঠাৎ বাইরে এলে ও-রকম হয়। একটু পরেই সয়ে যাবে। তাই হলো। আস্তে-আস্তে আলো সহনীয় হয়ে উঠল। ও এবার চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। বেঞ্জামিনের পেছনে পেছনে হাঁটতে লাগল।
দু’জনে জাহাজ থেকে নৌকায় নামল। বেঞ্জামিন সোফালা বন্দর লক্ষ্য করে নৌকো চালাতে লাগল।
সমুদ্রতীরে পৌঁছে ফ্রান্সিস দেখল, এখানে-ওখানে তখন ভাজিম্বাদের মৃতদেহ পড়ে আছে। কামানের গোলায় সমুদ্রতীরে কোথাও কোথাও বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কামানের মুখে ভাজিম্বারা দাঁড়াতে পারে নি। শুধু বর্শা নিয়ে কি কামানের বিরুদ্ধে লড়া যায়।
সোফালা বন্দরের একটা গুদোমঘরও বিধ্বস্ত হয়েছে। নির্জন চারদিক। একজন ভাজিম্বাকেও ওরা দেখতে গেল না। বাজারেরমত জায়গাটা খাঁ-খাঁ করছে। যে বাড়িগুলো চোখে পড়লো, সেগুলোর দরজা খোলা। কোন জনপ্রাণী নেই। ফ্রান্সিস যুদ্ধের ভয়াবহতা অনুভব করল। লা ব্রুশের ভয়ে নিশ্চয়ই যারা বেঁচেছিল, তারা বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছে। এক শ্মশানের রাজা হয়ে বসেছে লা ব্রুশ।
ফ্রান্সিসকে নিয়ে বেঞ্জামিন যখন রাজবাড়িতে গিয়ে পৌঁছল, তখন একটু বেলা হয়েছে। লা ব্রুশ কাঠের সিংহাসনে হাত পা ছড়িয়ে বসেছিল। ফ্রান্সিসকে ঢুকতে দেখেই ও লাফিয়ে উঠল। খুকখুক করে হাসলো। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে বললো–এসো এসো, ফ্রান্সিস এসো। সত্যি তোমরা বীরের জাত। মুক্তোর সমুদ্রে নামার কথা শুনে সকলের যখন ভয়ে মুখ শুকিয়ে যাচ্ছে, তখন তুমি নিজে থেকে আগ বাড়িয়ে রাজি। হয়েছে। এ সোজা কথা? হ্যাঁ? সত্যিই তুমি বীর।
