পূবদিকে একটা ছোট ঘর দেখা গেল। সেই ঘরে ফ্রান্সিসরা ঢুকল। বালি সরানো হয়েছে। ছোট ঘরটার মাঝখানে একটা মোটা কার্পেট পাতা। বালি সরানোতে এখন কার্পেটটা ভালভাবে দেখা যাচ্ছে। কার্পেটে হালকা নীল ও রক্তিমাভ রঙের লাইলাক ফুলের নকশা। বেশ বড়।
–আবার লাইলাক ফুল। ফ্রান্সিস বিড় বিড় করে বলল। তারপরে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল নিরেট পাথরের দেয়াল। এটা বোধহয় নিরলংকার প্রার্থনা ঘর ছিল।
প্রার্থনা ঘর থেকে বেরিয়ে এল সবাই। হ্যারি বলল
–ফ্রান্সিস গুপ্তধন রাখার মত সম্ভাব্য কোন জায়গাই তো দেখা যাচ্ছে না।
–দেয়াল ভেঙে যে ঘরটা পেলাম সেই ঘরটায় চলো। ফ্রান্সিস বলল। সেই ঘরটায় ওরা এল। বেদীটা দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল–এই বেদীটা ভাঙতে হবে। আতলেতার দিকে তাকিয়ে বলল কালকে কয়েকটা কুড়ুল আনতে হবে। যোদ্ধাদের বলে দাও।
-ঠিক আছে। তাহলে বেদীটা ভাঙবে? আতলেতা জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। লাইলাক ফুলের রহস্য ভেদ করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সেদিনের মতো ওরা অতিথিশালায় ফিরে এল।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিসরা আবার খোঁড়ার জায়গায় এলো। দু’তিনজন যোদ্ধা কুড়ুল নিয়ে এসেছিল।
সেই ঘরে এসে ফ্রান্সিস যোদ্ধাদের বলল–
–এই বেদীটা ওপর থেকে ভাঙতে হবে। কুড়ুল, চালাও।
বেদীর মাথায় যোদ্ধারা কুড়ুলের ঘা মারতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই চৌকোনো মাথাটা ভেঙে গেল। দেখা গেল চৌকোনো একটা গর্ত মত। ফ্রান্সিস হাত তুলে যোদ্ধাদের থামাল। চৌকোনো গর্তটার কাছে গিয়ে দেখল ভেতরে একটা কিছু আছে। হাত ঢুকিয়ে দেখল একটা কালো কাঠের বাক্সমত। ও দুহাত দিয়ে বাক্সটা তুলে আনল। হ্যারি বলে উঠল–ফ্রান্সিস। এটাই কি রত্নভাণ্ডার?
–বাক্সটা খুবই ছোটো। খুলে দেখছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বাক্সটা খুলল। আশ্চর্য। ভেতরে একটা শুকনো লাইলাক ফুল। ফুল বিবর্ণ।
–আবার লাইলাক ফুল। ফ্রান্সিস বলল। ততক্ষণে সবাই ফুলটা দেখল। বাক্সটার গায়ে সোনারূপের কাজ করা নানা ফুলপাতার নকশা। বড় সুন্দর দেখতে বাক্সটা।
–হ্যারি–বোঝা যাচ্ছে লাইলাক ফুলের নকশা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবার আর কোথায় আছে লাইলাক ফুলের নকশা সেটা দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
লাইলাক ফুলের নকশাই তাহলে গুপ্ত রত্নভাণ্ডারের নিশানা। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। চলো দেখি আর কোথায় আছে লাইলাক ফুলের নকশা। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস আবার ভাঙা অন্দরমহল ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগল। ন্নাঃ। অন্দরমহলে কোথাও আর লাইলাক ফুলের নকশা নেই।
ফ্রান্সিস প্রার্থনাকক্ষে ঢুকল। মেঝেয় পাতা ভারি কার্পেটে রয়েছে লাইলাক ফুলের নকশা। ফ্রান্সিস কিছুক্ষণ কার্পেটটার দিকে তাকিয়ে বলল–হাত লাগাও। কার্পেটটা, তুলতে হবে। আর্টদশজন যোদ্ধার সঙ্গে ফ্রান্সিসরা কার্পেটের চারপাশ ধরল। টেনে তুলে ফেলা হল মোটা ভারি কার্পেটটা। আবার লাইলাক ফুল। এবার ফুলটার হালকা নীল রক্তিমাভ পাপড়িগুলোর রং উজ্জ্বল। কতদিন নকশাটা কার্পেটের তলায় চাপা পড়েছিল কে জানে। ফুলের নকশাটা ঘরের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে। বেশ বড়। সবাই বেশ অবাক হয়ে ফুলের নকশাটা দেখতে লাগল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল
–হ্যারি। আবার লাইলাক ফুল। এটা সবচেয়ে বড় নকশা। সবচেয়ে সুন্দর।
ফ্রান্সিস উবু হয়ে মেঝেয় বসল। নকশায় হাত বুলোলো কয়েকবার। উঠে দাঁড়িয়ে বলল–পাথর কেটে ফুলের ছাঁচ করা হয়েছে। পরে রঙ দেওয়া হয়েছে। এখন এই পাথরের ছাঁচটা তুলে ফেলতে হবে।
তা কেন। ভেঙে ফেললেও তো হয়। বিনেলো বলল।
না। এত সুন্দর পাথরের ওপর ফুলের নকশা। আভাঙা অবস্থায় তুলে নেব। তাহলেই নীচে কী আছে দেখা যাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু আভাঙা অবস্থায় ভোলা যাবে? হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। হাত দিয়ে দেখেছি। কুড়ুলের মাথা দিয়ে আস্তে চাড় দিয়ে দিয়ে তোলা যাবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে বলল-দুপুর হয়ে এসেছে। চলো খেতে সবাই।
কাজ বন্ধ করে সবাই নগরের দিকে চললো। আসতে আসতে ফ্রান্সিস যোদ্ধাদের দলনেতাকে ডেকে বলল–ভাই তোমাদের আর প্রয়োজন নেই। বালি খোঁড়া হয়ে গেছে। এখন অনুসন্ধানের পালা। ওটা আমরা কয়েকজনে পারবো।
-ঠিক আছে। বাকি কাজ আপনারাই করুন। দলনেতা বলল।
দুপুরে খাবার খেয়ে ফ্রান্সিসরা শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল। বিনেলো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–যোদ্ধাদের চলে যেতে বললে বাকি কাজ আমরা পারবো?
-পারতে হবে। ঐ যোদ্ধাদের ধারে কাছেও রাখবো না বলে ওদের আসতে মানা করেছি। যদি ওদের সামনে সেই গুপ্ত রত্নভাণ্ডার উদ্ধার হয় ওরা ঐ ভাণ্ডার লুঠ করে নেবে। আমরা বাধা দিতে গেলে আমাদের ঐ কুড়ুল দিয়েই মেরে ফেলবে। ধনসম্পদের লোভ বড় সাংঘাতিক। ফ্রান্সিস বলল।
-তাহলে কালকের অনুসন্ধানে শুধু আমরাই যাবো? আতলেতা বলল।
কালকে নয়। আজ রাতে। ফ্রান্সিস বলল।
রাতে খুঁজবে? আতলেতা জানতে চাইল।
হ্যাঁ-যতটা সম্ভব গোপনে। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো এগিয়ে এল। বলল ফ্রান্সিস আমার এভাবে একা একা এই অতিথিশালায় পড়ে থাকতে ভালো লাগছে না। তোমাদের সঙ্গে আমিও যাবো।
–তোমার শরীর–ফ্রান্সিস বলতে গেল।
শাঙ্কো বলে উঠল– আমি এখন অনেক সুস্থ।
–বেশ। যেও। তবে আমাদের কাজে হাত লাগাবে না। শুধু বসে থাকবে।
–ঠিক আছে। শাঙ্কো মাথা কাত করে বলল।
