ওরা অতিথিশালায় ফিরে এল। শুয়ে পড়তে পড়তে ফ্রান্সিস বলল–আতলেতা কালকে পুরোনো রাজপ্রাসাদ দেখতে যাবো।
-বেশ। আমি সকাল সকাল চলে আসবো। আতলে চলে গেল।
হ্যারি বলল–ঐ পুরোনো প্রাসাদ তো সবটা খুঁড়ে বার করা হয়নি।
-কী মনে হচ্ছে তোমার? হ্যারি প্রশ্ন করল।
দু’টো জায়গাই ভালোভাবে দেখতে হবে। এক–ঐ মন্দিরঘরটা আর পুরোনো রাজপ্রাসাদটা। এই দুটোর মধ্যে কোনটাতে আছে গুপ্ত রত্নভান্ডার। ফ্রান্সিস বলল।
-কোন সূত্র পেলে? হ্যারি জানতে চাইল।
–না। এখনও অন্ধকারে আছি। তবে ওখানে খোঁড়ার কাজ তো চলুক। দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
–কালকেই কি খোঁড়ার কাজ শুরু করবে? হ্যারি বলল।
–না। কালকে যতটা খোঁড়া হয়েছে দেখাবো। পরশু থেকে খোঁড়ার কাজে হাত দেব। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন আতলেতা সকাল সকাল এল। চারজন তৈরি হয়ে চলল সমুদ্রতীরের দিকে।
খোঁড়া জায়গাটায় পৌঁছল সবাই। বালিতে কাটা সিঁড়ি দিয়ে চারজনে নিচে নামল। প্রধান প্রবেশপথের কাঠের দরজাটা ভেঙে পড়ে আছে। দরজার কাঠে নানা ফুল লতাপাতার রুপো গেঁথে নকশা করা। দরজা পার হয়ে ভেতরে ঢুকল ওরা। ঢুকেই একটা লম্বা ঘরের শুধু পাথরের মেঝে। কয়েকটা পাথরের ভাঙা থাম এদিক ওদিক পড়ে আছে। দুপাশে দুটো কাঠের সিন্দুকের মতো। প্রোমিত্ত ওর বইতে এই সিন্দুকদুটোর কথা লিখেছে।
ঐ ঘরের পরেই পাথরের দেয়াল। অর্ধেকটা ভাঙা। ফ্রান্সিস বলল–প্রোমিত্ত ওর বইতে এই দেয়ালের কথা লিখেছে। তবে ও দেয়াল ভাঙবার চেষ্টা করেছিল। পরে জলদস্যু ক্যাপ্টেন সার্ভানো নিশ্চয়ই দেয়ালের অনেকটা ভেঙেছিল। কিছুই পায় নি। চলো ভাঙা দেয়ালের মধ্যে দিয়ে ওপাশে যাবো।
চারজনে পর পর ভাঙা দেয়ালের মধ্যে দিয়ে ওপাশে গেল। ছাদ তো ভেঙে পড়েছে। সূর্যের আলোয় দেখল ঘরটার মাঝখানে একটা মসৃণ পাথরের বেদী। বড় বেদীর ওপরে একটা ছোট চৌকোনো পাথরের বেদী। তার মাথায় লাইলাক ফুলের নকশা। তবে রংগুলো অনুজ্জ্বল। বোধহয় রোদে জলে।
ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে বেদীটা দেখল। লাইলাক ফুলের নকশাটাও ওর দৃষ্টি আকর্ষণ করল বেশি। রাজা সিয়াভো এত জায়গায় লাইলাক ফুলের নকশা করিয়েছেন কেন? ফ্রান্সিসের মনে এই প্রশ্নটা ঘুরে ঘুরে এল।
ঐ পর্যন্তই বালি খোঁড়া হয়েছে। এরপরে আরও ঘর আছে নিশ্চয়ই। অন্দরমহলটা এখনও বালি খুঁড়ে বের করা যায় নি। ফ্রান্সিস স্থির করল অন্দরমহলটা খুঁড়ে বের করবে। অন্দরমহলের কোথাও গুপ্ত রত্নভাণ্ডার থাকার সম্ভাবনা বেশি।
দুপুরের আগেই ওরা অতিথিশালায় ফিরে এল। আতলেতাকে বলল–কাল সকালে বেলচাসহ যোদ্ধাদের নিয়ে এসো। খোঁড়ার কাজ শুরু করবো।
-ঠিক আছে। আতলেতা মাথা কাত করে বলল। তারপর বলল –গুপ্ত রত্নভাণ্ডার উদ্ধারের আশা আছে?
–এখনই বলতে পারছি না। সবটা খোঁড়া হোক আগে। ফ্রান্সিস বলল। একটু থেমে বলল–রাজা এলিমারের সঙ্গে একবার দেখা করা প্রয়োজন।
–এখনই চলো। রাজসভাতেই রাজাকে পাবে।
–চলো। হ্যারিদের দিকে তাকিয়ে বলল–তোমরা অপেক্ষা কর। আমি ঘুরে আসি।
দুজনে রাজসভায় এল। তখন বিচারপর্ব শেষ হয়েছে। লোকজনের ভিড়ও কম। আতলেতা এগিয়ে গিয়ে রাজাকে কিছু বলল। রাজা ফ্রান্সিসকে ইঙ্গিতে এগিয়ে আসতে বললেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে গেল। বলল–মহামান্য একটা কথা বলছিলাম।
-বলো। রাজা বললেন।
–অতীতের রাজা সিয়াভো যা কিছু নির্মাণ করেছিলেন সেসব জায়গায় লাইলাক ফুলের নকশা করিয়েছিলেন। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। যতদূর শুনেছি উনি লাইলাক ফুল খুব ভালোবাসতেন। তাঁর যেসব পোশাক অন্তঃপুরে সযত্নে রাখা আছে সেসব পোশাকে লাইলাক ফুলের নকশা তোলা আছে। পোশাকের বুকের কাছে। শুনেছি তার আমলের প্রাসাদের বাগানে শুধু লাইলাক ফুলের গাছই লাগিয়েছিলেন। লাইলাক ফুলের সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিলেন তিনি। রাজা বললেন।
লাইলাক ফুল সত্যিই সুন্দর। ফ্রান্সিস বলল।
অতিথিশালায় ফিরে আসার পথে আতলেতাকে ফ্রান্সিস বলল–কাল থেকে বালি খোঁড়ার কাজে লাগবো। তুমি যোদ্ধাদের এনো। অন্দরমহলটাকে বের করতে হবে।
–ঠিক আছে। আতলেতা বলল। তারপর চলে গেল।
অতিথিশালায় ঢুকে ফ্রান্সিস দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসল।
–রাজার সঙ্গে কী নিয়ে কথা বললে? হ্যারি জানতে চাইল। ফ্রান্সিস সব বলল।
পরদিন সকালেই পঁচিশ তিরিশজন যোদ্ধাকে নিয়ে আতলেতা অতিথিশালার সামনে এসে হাজির হল। আতলেতা বলল–পোমিত্ত যাদের নিয়ে বালি খোঁড়ার কাজ চালিয়েছিল বেশিরভাগ তাদেরই এনেছি।
–এটা একটা কাজের কাজ করেছে। অভিজ্ঞ লোকের খুব দরকার ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
সকালের খাবার খেয়েই সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সিস চলল। খোঁড়ার জায়গায় পৌঁছে ফ্রান্সিস যোদ্ধাদের বলল–খোঁড়ার সময় লক্ষ্য রাখবে যেন খুব বেশি ভাঙচুর না হয়। বেলচার হাতল ঠুকতেই দেয়াল হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। যোদ্ধারা ভেতরে ঢুকল। তারপর বালি খুঁড়তে লাগল।
দুপুর পর্যন্ত কাজ চলল। ফ্রান্সিসরা যোদ্ধাদের নিয়ে নগরে ফিরে এল। সবাই খাওয়াদাওয়া সেরে আবার খোঁড়ার জায়গায় এল। আবার বালি খোঁড়া শুরু হল। চলল বিকেল পর্যন্ত। সন্ধ্যের আগেই সবাই ফিরে এল।
প্রতিদিনই এইভাবে বালি খোঁড়া চলল।
দিন সাতেকের মধ্যে অন্দরমহলের বালি খোঁড়া হয়ে গেল। অন্দরমহলের আয়তন বেশ বড়। কিছু ভাঙা কাঠের আসবাবপত্র পাওয়া গেল। পাথরের দেয়ালে কোথাও কোথাও দেয়াল আলমারিমত ছিল। সেসব এখন ফঁকা। কয়েকটা ভেঙেও পড়েছে।
