–বেশ। তোমাদের যা কিছু প্রয়োজন তা আতলেতাকে বল সে সব কিছুর। ব্যবস্থা করে দেবে। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। মাথা কাত করল ফ্রান্সিস। তারপর বলল
আমরা আপনার অন্তঃপুরে খুঁজবো।
–বেশ তো। তবে দু’তিন দিন পরে এসো। রানি অসুস্থ। রাজা বললেন।
–ও। ঠিক আছে। পরেই যাবো। আমাদের সব রকম সাহায্যে করছেন এর জন্যে ধন্যবাদ। আমার আর কিছু বলার নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–আশা করছি–তোমরা সফল হবে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস হ্যারি আতলেতা সভাঘর থেকে বেরিয়ে এল। রাজবাড়ির বাইরে এসে ফ্রান্সিস বলল–
–আতলেতা। আমি এখনই পশ্চিমের বনটা খুঁজে দেখতে চাই।
বেশ তো চলো। বনে একটা গুহা আছে। দু’টো মশাল চকমকি পাথর নিয়ে আসছি। অল্পক্ষণের মধ্যেই আতলেতা ফিরে এল। তিনজন সদর রাস্তায় এল। চলল–পাহাড় ও বনের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই বনের ভেতরে ঢুকল তিনজনে। কিছুদূর যেতেই সামনে পড়ল আধ-ভাঙা মন্দির–ঘর।
–আচ্ছা আতলেতা। মন্দিরঘরটা তো ভেঙে পড়ার অবস্থা। রাজা এটার সংস্কার করেন না কেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–এটা রাজা সিয়োভো প্রতিষ্ঠা করেছিলন। রাজা এনিমার এটাকে যে অবস্থায় আছে সেই অবস্থায় রাখতে চায়নি। পূর্বপুরুষদের স্মৃতি হিসাবে। আতলেতা বলল।
–স্মৃতি চিহ্ন হিসাবে আর কি। হ্যারি বলল।
ওরা মন্দির–ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখতে লাগল। পাথরের বেদীর কাছে এল। বেদীর ওপর একটা বড় লাইলাক ফুল ঘিরে নানা ফুললতা পাতার রঙীন নকশা। অবশ্য রঙগুলি প্রায় বিবর্ন। তবু এখনও নকশাগুলো সুন্দর দেখাচ্ছে।
–ফ্রান্সিস দেখেছো কী সুন্দর নকশা। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ। রাজা সিয়োভোর শিল্পবোধের প্রশংসা করতে হয়। ফ্রান্সিস বলল। তারপর বেদীর পাথরের জোড়াগুলো খুঁটিয়ে দেখল। বেশ শক্ত জোড়। মাথা নিচু করে দেখছিল। এবার মাথা তুলে বলল–চলো। এই বেদীটা পরে ভালো করে দেখতে হবে।
তিনজনে মন্দিরঘরের বাইরে এল। ফ্রান্সিস বলল–আতলেতা এখানে একটা গুহা আছে বলেছিলে।
–হ্যাঁ। চলো। দেখাচ্ছি। আতলেতা বলল।
বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গুহাটার মুখে এসে দাঁড়াল ওরা। আতলে চমকি পাথর ঠুকে মশাল জ্বালল। ফ্রান্সিস আর আতলেতা মশাল নিল। গুহায় ঢুকল ওরা। ফ্রান্সিস মশাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চারদিক তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। গুহার এবড়ো। খেবড়ো পাথরের গা যেমন হয়। গুহার উচ্চতা কোথাও বেশি কোথাও কম। এবড়ো খেবড়ো গুহার দেওয়াল দেখে ফ্রান্সিস বুঝল কোথাও মানুষের হাত পড়েনি। দুতিনটে খোদল পেল। কিন্তু সেগুলোর মুখ পাথর-চাপা নয়। খোলা।
গুহা শেষ। টানা দেয়াল উঠে গেছে। দেয়ালের নিচে একটা পাথরের ছোট চাই পড়ে আছে। তার নিচে একটা খোঁদলের মুখমত। ফ্রান্সিস বসে পড়ল। বলল–হাত লাগাও। পাথরের চাইটা সরাতে হবে। আতলেতা আর হ্যারি চাইটা ধরল। ফ্রান্সিসও বাঁ হাতে মশাল নিয়ে ডানহাতে ধরল। তিনজন মিলে দুতিনবার টানতেই পাথরের চাইটা সরে গেল। হুড় হুড় করে বেশ কয়েকটা চামচিকে খোদল থেকে বেরিয়ে উড়ে গুহামুখের দিকে উড়ে গেল। ফ্রান্সিস খোদলটা দেখল। ফাঁকা। কিচ্ছু নেই।
তিনজনে ফিরে এল। মশাল নিভিয়ে দিল আতলেতা। ফিরে লল। অতিথিশালায় এল।
ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিসরা বসল। একটু পরেই দুপুরের খাবার খেয়ে নিল। আতলেতাও ফ্রান্সিসদের সঙ্গে খেয়ে নিল। আতলেতা বলল–আজকে আর কোথাও যেতে হবে?
না। কাল সকালে বনে যাবো। দেখি বনের কোথাও কোন হদিশ পাই কিনা। ফ্রান্সিস বলল।
–প্রোমিও যে জায়গাটা খুঁড়িয়েছিল সেখানে কবে যাবে? আতলেতা বলল।
রাজবাড়ির অন্তঃপুরটা প্রথমে দেখবো। রানি সুস্থ হল কিনা এই খবরটা এনো। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। তাহলে আমি যাচ্ছি। আতলেতা চলে গেল।
পরের দিন সকালে আতলেতা এল। বিনেলো বলল–এখানে একা একা পড়ে থাকবো না। আমিও তোমাদের সঙ্গে যাবো।
-বেশ। চলো। ফ্রান্সিস বলল।
চারজন হাঁটতে হাঁটতে বনের কাছে এল। বনে ঢুকল। আজকে আকাশটা মেঘলা। তেমন রোদ ওঠে নি। বনতল বেশ অন্ধকার। অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে ফ্রান্সিস বলল–সরোবরের ধারে নিয়ে চলো। ওদিকে সেদিন আত্মগোপন করেছিলাম। তখন ভালো করে ঐ জায়গাটা দেখা হয় নি।
কিছুক্ষণ পরে ওরা সরোবরের ধারে এল। আকাশ মেঘলা বলেই সরোবরের জল কেমন যেন কালচে দেখাচ্ছে। এখানে ঘন বন। গাছগাছালির মধ্যে বেশ কিছুক্ষণ ঘুরে ঘুরে দেখল। কিন্তু গাছ লতাপাতা বুনো ফুল ছাড়া কিছুই দেখা গেল না।
–ওপারে চলো। ফ্রান্সিস বলল-ওদিকটা প্রোমিও দেখে নি। সরোবরের পাশ দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরোবরের ওপারে এল ওরা। এদিকে বন তত ঘন নয়। ফ্রান্সিস ঘুরে ঘুরে দেখল। সেই গাছগাছালি লতাপাতা বুনো ফুল। কিছুক্ষণ ঘোরাঘুরি করে ফিরে এল সবাই।
ফেরার পথে আতলেতা বলল–ফ্রান্সিস রানিমার সঙ্গে কথা বলেছি। তোমরা অন্তঃপুর খোঁজাখুঁজি করতে আসবে সে কথা বলেছি। রানিমা এখন অনেকটা সুস্থ। তোমাদের অন্তঃপুরে যেতে অনুমতি দিয়েছেন।
–ঠিক আছে। কাল সকালে যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিসরা রাজসভাঘরের পাশ দিয়ে অন্তঃপুরের দরজার সামনে এল। প্রহরী দাঁড়িয়ে। ওকে দিয়ে ভেতরে খবর পাঠানো হল। প্রহরী ফিরে এসে বলল–আপনারা যান।
ফ্রান্সিসরা অন্দরমহলে ঢুকল। বেশ ছিমছাম। সাজানো গোছানো চারদিক। ফ্রান্সিসরা ঘুরে ঘুরে সব দেখতে লাগল। পাথরের দেয়ালে রঙীন ফুল লতাপাতা আঁকা। কোথাও কোন পরিত্যক্ত ঘর নেই। ফ্রান্সিস পাথরের মেঝে ভালোভাবে দেখতে লাগল। না। মেঝের নিচে কোন ঘর নেই। আলমারি সিন্দুক সবই ব্যবহৃত হয়। গোপনীয় কিছুই ওসবের মধ্যে থাকতে পারে না। ফ্রান্সিসরা গুপ্ত ধনভান্ডারের কোন হদিশ করতে পারল না। ওরা অন্দরমহল থেকে বেরিয়ে আসছে তখনই ফ্রান্সিসরা দেখল কোনার দেয়ালে একটা রঙীন লাইলাক ফুল আঁকা। ফ্রান্সিস দাঁড়িয়ে পড়ল। কাছে গিয়ে দেখল ফুলটার হাল্কা নীলে রক্তিমাভ রং। রং মোটামুটি উজ্জ্বল। ও বুঝল অতীতের রাজা সিয়াভো ফুল ভালোবাসতেন। বিশেষ করে লাইলাক ফুল। রাজবাড়ির অন্দরমহল দেখা শেষ। বাকি রইল বালি খুঁড়ে বের করা প্রাচীন রাজপ্রাসাদ।
