কিছুক্ষণ পরে তিরিশ জন যোদ্ধা বেলচা হাতে মাঠে এসে দাঁড়াল। সেনাপতি তাদের কাজের কথা বুঝিয়ে দিল। কাবানা যোদ্ধাদের নিয়ে সমুদ্রেরতীরের দিকে চলল। আমরাও অনুসরণ করতে লাগলাম। যেতে যেতে আমি সার্ভানোকে বললাম–বোঝাই যাচ্ছে বালি খোঁড়ার কাজ বেশ কিছুদিন ধরে চলবে। আত্মগোপনের জন্যে একটা ভাল জায়গা দেখে নিতে হবে। আমরা যেন কোনভাবেই কাবানার নজরে না পড়ি।
যোদ্ধাদের নিয়ে কাবানা সেই পাথরের থামের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। কীভাবে কোথা থেকে বালি খুঁড়তে হবে সেটা বোঝাল।
আমি আর সার্ভানো সেই ফণীমনসার আর কাঁটাঝোঁপের আড়ালে শুয়ে পড়লাম। দৃষ্টি কাবানার দিকে। ওখানে থেকে কাবানার কিছু কথাবর্তাও শুনতে পাচ্ছিলাম।
যযাদ্ধারা বালি তোলার কাজে লাগল। বেলচা দিয়ে বালি তোলা আর একপাশে সমুদ্রের দিকে বালি ফেলা। বালির স্তূপ হতে লাগল।
কাজ চলল। বুঝলাম এত বালি তুলতে সময় লাগবে। তবে যোদ্ধারা কর্মঠ এবং সংখ্যায়ও বেশি। বেশিদিন লাগার কথা নয়।
দুপুর হল। এখন খাওয়ার সময়। কাবানার নির্দেশে যোদ্ধারা নগরের দিকে ফিরে আসতে লাগল। আমরা শুয়ে থেকে বালির এদিক ওদিক সরে সরে অতগুলো লোকের নজর এড়ালাম।
ওরা নগরের কাছাকাছি চলে গেছে তখন আমি উঠে দাঁড়ালাম। দু’জনে খোঁড়ার জায়গায় গেলাম। দেখলাম পাথরের স্তম্ভের বেশ নিচে পর্যন্ত খোঁড়া হয়ে গেছে। গর্তের নিচে পাথরের বালিচাপা সিঁড়ির মত দেখা যাচ্ছে। তাহলে কাবানার অনুমান ঠিক। এখানে রাজপ্রাসাদ ছিল।
যোদ্ধারা বেলচাগুলি জড়ো করে রেখে গিয়েছিল। আমি নিজে একটা বেলচা নিলাম আর একটা সার্ভানোকে দিলাম। সার্ভানোকে নিয়ে সেই ফণীমনসার আর কাটার ঝোঁপের পেছনে এলাম বেলচা দিয়ে বালি খুঁড়তে লাগলাম। দু’জনেই হাত লাগালাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা বড় গর্তমত হল। নিশ্চিন্ত হলাম। এখানে আত্মগোপন করে সবদিক নজর রাখা যাবে। বেলচাগুলো যেখানে ছিল সেখানেই বেলচা দুটো রাখলাম।
সরাইখানায় ফিরে এলাম। খাওয়া দাওয়া সেরে আবার চললাম সমুদ্রতীরে ঐ জায়গটার দিকে।
ওখানে পৌঁছে সেই গর্তে আত্মগোপন করে নজর রাখতে লাগলাম। কাবানা ফিরে এল। বালি খোঁড়ার কাজ চলল।
এইভাবে দিন সাতেক কেটে গেল। ওখানে যাওয়া লুকিয়ে নজর রাখা যেন অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেল।
দুপুরে ওরা চলে গেলে আর বিকেলে চলে গেলে আমরা কতটা খোঁড়া হয়েছে। তা দেখতে যাই।
একদিন বিকেলে গিয়ে দেখলাম অনেক খোঁড়া হয়েছে। খননকাজের পাশেই বালির স্তূপজমে উঠেছে। আমরা নিচেনামলাম। থাক করা বালির সিঁড়ি দিয়ে নামলাম। তারপরই পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে। একটা বিরাট ছাদহীন ঘর। ঘরের দুপাশে দুটো কাঠের সিন্দুমত। আমি ছুটে গিয়ে একটা সিন্দুক খুললাম। ভেতরে মরচে পড়া তরোয়াল আর ঢাল। অন্যটা খুললাম–জাহাজের পাল ভাজ করে রাখা। তাহলে কাবানা এখনও গুপ্ত রত্নভান্ডারের সন্ধান পায়নি। ঘরটার উত্তর দিকে একটা ভাঙা দরজা। তারপরই একটা ছোট পাথরের দেওয়াল। দেখে ভাবলাম নিশ্চয়ই ঐ দেওয়ালের পেছনে কিছু আছে। নিশ্চয়ই ওখানেই রত্নভান্ডার আছে। তখন উত্তেজনায় আমার সমস্ত শরীর কাঁপছে। কিন্তু আমার ধারনার কথা সার্ভানোকে বললাম না। চুপ করে সব দেখে টেখে ওপরে চলে এলাম।
সরাইখানায় ফিরে এলাম।
আমার কেমন মনে হল কাবানা ওই দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা করবে। দেখতে চাইবে দেওয়ালের ওপাশে কী আছে। কিন্তু সেটা ও প্রহরীকে এড়িয়ে যোদ্ধাদের খ এড়িয়ে একা করবে। সুতরাং দিনে নয় রাতে।
সেদিন রাতে খাবার পর আমি শুয়ে পড়লাম। কিন্তু ঘুমোলাম না। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে শুয়ে রইলাম। উদ্দেশ্য সার্ভানোকে না জানিয়ে অতিথিশালায় যাওয়া। রাতে কাবানা বেরিয়ে এসে সমুদ্রতীরে সেই জায়গায় যায় কিনা সেটা দেখা ও পিছু নেওয়া।
হঠাৎ অন্ধকারে সার্ভানোর গলা শুনলাম–
-ঘুমোচ্ছো না কেন? বুঝলাম ধরা পড়ে গেছি। বুঝলাম সার্ভানোও আমার ওপর নজর রাখছে। তখন বাধ্য হয়ে বললাম–সেই বড়ঘরের উত্তরদিকে একটা পাথরের দেওয়াল দেখেছেন তো?
–হুঁ। সার্ভানো মুখে শব্দ করল।
–ঐ দেওয়ালের ওপাশেই আছে গুপ্ত রত্নভান্ডার। আমি বললাম।
বেশ চমকে সার্ভানো উঠে বসল। বলল–তাহলে চলো ঐ দেওয়াল ভাঙবো।
–আমরা না। কাবানাই আজ রাতে ঐ দেওয়াল ভাঙতে যাবে। আমি বললাম।
–কী করে বুঝলে। সার্ভানো জানতে চাইল।
–আড়াল থেকে ওর চোখে মুখে বেশ উত্তেজনা লক্ষ্য করছি। রাতেই যাবে। একা কাজ সারতে যাবে। আমি বললাম।
–তাহলে অতিথিশালার সামনে ঐ বড় গাছটার নীচে-সার্ভানো বলতে গেল। বাধা দিয়ে বললামনা। সমুদ্রতীরের দিকেই যাবো। কাবানাকে তো ওখানেই যেতে হবে। সেইজন্যেই ঘুমোয়নি। আমি বললাম।
–ওঠো তাহলে। সার্ভানো বলল।
–হুঁ। চলুন। এখন রাস্তাঘাট নির্জন। আমরা অনুসরন করতে গেলে আমরা ধরা পড়ে যাবে। তাহলে কাবানা সাবধান হয়ে যাবে। সমস্ত পরিশ্রম মাটি হবে। আমি বললাম।
আমরা সরাইখানা থেকে বেরিয়ে এলাম। উজ্জ্বল জ্যোৎস্নার রাত। নির্জন বড় রাস্তা দিয়ে চললাম সমুদ্রের দিকে। খননকাজের জায়গায় পৌঁছালাম। তখন বেশ রাত। সেই ফণীমনসার গাছের আড়ালে শুয়ে পড়লাম।
অপেক্ষা করছি কখন কাবানা আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই দূর থেকে দেখলাম কাবানা আসছে। একা। প্রহরীর নজর এড়িয়ে এসেছে। ও দ্রুত সেই খননের জায়গায় এল। ওর চলা দেখে বুঝলাম ও বেশ উত্তেজিত। তখনই চাঁদের আলোয় দেখলাম ও একহাতে একটা কুড়ুল অন্যহাতে একটা মশাল নিয়ে আসছে। যা ভেবেছিলাম তাই। ও ছোট দেওয়ালটা ভাঙতে আসছে।
