আমি ঘরটার সামনে উপস্থিত হলাম। দেখলাম একজন প্রহরীদরজার সামনে পাহারা দিচ্ছে। প্রহরীটি আছে। তার মানে কাবানা এখন রত্নভান্ডার খুঁজতে বেরোয়নি। চারদিকে তাকিয়ে দেখলাম ঠিক সামনেই একটা বিরাট চেন্টনাট গাছ। আমি গাছের তলায় দাঁড়ালাম। অপেক্ষা করতে লাগলাম–কখন কাবানা বেরোয়।
কিছুক্ষণ পরে কাবানা বেরিয়ে এল। আমি বেশ দূরত্ব রেখে কাবানা আর প্রহরীর পেছনে পেছনে চললাম।
বড় রাস্তা দিয়ে ওরা চলল পশ্চিমের পাহাড় জঙ্গলের দিকে। আমিও ওদের পেছনে চললাম। লক্ষ্য করলাম কাবানা একটা নেভানো মশাল নিয়ে যাচ্ছে। কারণ বুঝলাম না। তারপর রাস্তাটা পাহাড়ের পাশ দিয়ে চলে গেছে দক্ষিণমুখো। ঐদিকে কাবানা গেল না। ও পাহাড়ের নিচের জঙ্গলে ঢুকল। আমিও একটু দূরত্ব রেখে ওদের পেছনে পেছনে চললাম। এখানে নগরের ভিড় নই যে লোকের আড়াল নেব। তাই সাবধানে চললাম।
ঘন বন। অন্ধকার। গাছ লতাপাতার আড়ালে আড়ালে চললাম। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক ঘুরল ওরা। তারপর একটা আধভাঙা ঘরের কাছে এল। বুঝলাম না এখানে ঘর তৈরী হয়েছিল কীসের জন্যে? কাবানা ঘরের মধ্যে ঢুকল। প্রহরী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল। আমি গাছের আড়ালে লুকোলাম।
কিছুক্ষণ পরে কাবানা বেরিয়ে এল। চলল পশ্চিমমুখে।
প্রায় অন্ধকার বনের মধ্যে দিয়ে চলতে চলতে সামনেই পাহাড়ের পাদদেশ। কাবানা পাহাড়ে উঠতে লাগল। পেছনে প্রহরী। আমিও পাথরের আড়ালে আড়ালে উঠতে লাগলাম। কিছুক্ষণে মধ্যেই দেখলাম একটা বড় গুহামুখ। এবার বুঝলাম কেন কাবানা একটা মশাল নিয়ে এসেছে। ও কোমর থেকে চমকি পাথর বার করল। পাথরে লোহার টুকরো ঠুকে মশাল জ্বালাল। তারপর জলন্ত মশাল হাতে গুহায় ঢুকল।
আমিও ওদের পেছনে পেছনে ঢুকলাম। মশালের আলো লক্ষ্য করে আমিও চললাম। মশাল হাতে কাবানা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গুহার এবড়ো খেবড়ো পাথুরে গা দেখতে দেখতে চলল। ওদের এগোতে সময় লাগছিল। বেশ কিছুক্ষণ যাবার পর একটু দূর থেকে মশালের আলোয় দেখলাম গুহা শেষ। কাবানা সেখানে কিছুক্ষণ দাঁড়াল। তারপর ফিরে আসতে লাগল। বুঝলাম এর আগে ও এখানে এসেছিল।
আমিও ফিরে দাঁড়িয়ে দ্রুত গুহার মুখের দিকে চললাম। আমার পায়ের শব্দ হল। কাবানা চেঁচিয়ে বলল–কে? গুহায় জোর শব্দ হল। আমি ততক্ষণে গুহার বাইরে চলে এসেছি। ছুটে গিয়ে একটা পাথরের চাইয়ের পেছনে গিয়ে লুকোলাম।
কিছুক্ষণ পরেই ওরা দুজনেই বেরিয়ে এল। আড়াল থেকে কাবানার মুখ দেখেই বুঝলাম ও গুপ্তধনের খোঁজ পায়নি।
দু’জন বনের মধ্যে ঢুকল। একটুক্ষণ অপেক্ষা করে আমি ওদের পেছনে পেছনে আর গেলাম না। এখন আর ওদের অনুসরন করার কোন অর্থ নেই। কাবানার সব দেখা হয়ে গেছে। ও আর এখন অন্য কোথাও যাবে না। আমি এখানেই একটা ভুল করলাম। আমি অন্য পাশ দিয়ে বনের বাইরে রাস্তার কাছে এলাম। বনের আড়াল থেকে লক্ষ্য করলাম ওরা কখন বেরিয়ে আসে। কিন্তু অপেক্ষাই করতে লাগলাম। ওরা আর বেরিয়ে আসে না। তাহলে ওরা কি অন্য কোথাও গেল? কোথায় গেল?
আমি আবার বনের মধ্যে ঢুকলাম। ওদের খুঁজতে লাগলাম। দক্ষিণমুখো চললাম। বেশ কিছুটা যেতে হঠাৎ দেখি সামনে একটা হ্রদ। কাবানা আর প্রহরীটি জলের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে। আমি দ্রুত জলের ধারে জংলা গাছের জঙ্গলের আড়ালে বসে পড়লাম। হ্রদের ধারে ধারে কাবানা একবার ডানদিকে একবার বাঁদিকে গেল। ঘুরে ঘুরে চারপাশ ভালো করে দেখল। তারপর দুজনেই ফিরে এল। বুঝলাম ও কিছু হদিশ করতে পারেনি। এবার আর আমি ভুল করলাম না। বনের মধ্যে দিয়ে ওদের পেছনে পেছনে আসতে লাগলাম। এখানে একটা হ্রদ আছে তা আমি জানতাম না। কাজেই আবার ওদের হারাই তাই ওদের দিকে লক্ষ্য রেখে বনের মধ্যে দিয়ে আসতে লাগলাম। কী জানি-কাবানা যদি অন্য কোথাও যায়?
বন শেষ। ওরা রাস্তায় উঠল। এবার আমি ওদের সঙ্গে দূরত্ব বাড়িয়ে দিলাম। অল্প লোকই রাস্তায় যাতায়াত করছে। কাজেই ওদের ওপর নজর রাখার সুবিধে। হল।
নগরীর ভিড় শুরু হল। কাবানা আর অন্য কোথাও গেল না। সোজা অতিথিশালায় ঢুকল। তারপর কাবানা আর বেরোলো না দেখে সরাইখানায় ফিরে এলাম।
সেদিন রাতে খাবার আগেই আমি মহাবিপদে পড়লাম। বিপদে ফেলল আমার, ডান গালের আঁচিল। আমি জানতাম না জলদস্যু ক্যাপ্টেন সার্ভানো এই বন্দরেই জাহাজ ভিড়িয়েছে। জানতাম জলদস্যু এসব সময়ে জাহাজের মাথায় সাদা মরার হাড় আর মাথা আঁকা কালো পতকা নামিয়ে সাদা পতকা উড়িয়ে দেয়। কেউ ওদের জলদস্যু বলে চিনতে পারে না।
আমি যে জাহাজে চড়ে এসেছিলাম সেই জাহাজটা তখনও বোধহয় নোঙর করা ছিল। সেই জাহাজের কারে-কাছ থেকে আঁচিলওয়ালা আমার খোঁজ পেয়েছিল ক্যাপ্টেন সার্ভানো।
আমাকে ঠিক খুঁজে খুঁজে আমার সরাইখানায় এসে হাজির। সঙ্গে একজন সাধারন পোশাকের জলদস্যু। ক্যাপ্টেনের পোশাক ক্যাপ্টেনের মতই। ক্যাপ্টেন সার্ভানো তরোয়াল কোষমুক্ত করে আমার গলায় তরোয়ালের ডগাটা ঠেকিয়ে বলল–পালিয়েছিলে। এর শাস্তি তো জানো। জাহাজে চলো। বুঝলাম–রেহাই নেই। সরাইখানার লোকজন তার মারমূর্তি দেখে এগোতে সাহস করল না। আমি তখন অসহায়। বুঝলাম ক্যাপ্টনকে ঠেকাতে হলে গুপ্তধনের লোভ দেখাতে হবে। এছাড়া উপায় নেই। আমি তখন বললাম–একটা গুপ্তধনের উদ্ধারের কাজে লেগেছি। এখন জাহাজে চলে গেলে গুপ্তধনের আশা ছাড়তে হবে।
