শুরু হল এক নতুন জীবন। যাত্রীবাহী জাহাজ লুঠ করা, যাত্রীদের বন্দী করে ক্রীতদাসের হাটে বিক্রী করা–লড়াই নরহত্যা–এসবে অভ্যস্ত হয়ে গেলাম। কিন্তু বড়লোক হতে পারলাম না। লুন্ঠিত সবকিছুই ক্যাপ্টেন সার্ভানো নিজের কাছে নিয়ে নিত। বদলে আমাদের সামান্য কিছু দিত। অথচ লড়াই করছি আমরাই লুঠ করছি আমরাই আহত হয়েছি রক্ত হয়েছি আমরাই–সেই আমরাই বঞ্চিত হয়েছি।
তখন জলদস্যুদের পাকড়াও করতে বিভিন্ন দেশ থেকে নৌবাহিনী পাঠানো শুরু হয়েছে। বেশ কয়েকটি জলদস্যুদের জাহাজ ধরা পড়েছে। সেই সব দেশে জলদস্যুদের ধরে নিয়ে গিয়ে তাদের ফাঁসিও দেওয়া হয়েছে।
হতাশ আমি পাবার উপায় ভাবতে লাগলাম। ক্যাপ্টেনের সজাগ দৃষ্টি এড়িয়ে পালানো সহজ কাজ নয়। কিন্তু আমি তখন মরিয়া হয়ে উঠেছি যদিও জানতাম ধরা পড়লে মৃত্যু।
সেসময় আমাদের জাহাজ একটা ছোট বন্দরের কাছ দিয়ে যাচ্ছিল। রাতও ছিল, অন্ধকার রাত। গভীর রাতে ডেক থেকে উঠে গড়াতে গড়াতে হালের কাছে। এলাম। দড়িদড়া ধরে জলে কোন শব্দ না তুলে জলে ডুব দিলাম। ভেসে উঠে দেখলাম জাহাজ বেশ দূরে চলে গেছে। অন্ধকার সমুদ্রে আস্তে আস্তে জলে কোন শব্দ না তুলে তীরের দিকে সাঁতরাতে লাগলাম। তীরের বন্দরে যখন পৌঁছলাম তখন ভোর হয় হয়। কোমরে আমার পুরোনো পোশাক বেঁধে এনেছিলাম। জল দস্যুর মার্কামারা পোশাক ছেড়ে সেই ভেজা পোশাক পরলাম।
বন্দরের দোকানপাট খুলছে তখন। একটা ছোট সরাইখানায় আশ্রয় নিলাম।
তারপর বেঁচে থাকার লড়াইয়ের জীবন। এ জাহাজ সে জাহাজ কাজ নিয়ে এদেশে সেদেশে ঘুরে বেড়ালাম। কিছু স্বর্ণমুদ্রাও জমালাম।
অবশেষে এক জাহাজে চড়ে এলাম এই লাগাসে। আশ্রয় নিলাম এক সরাইখানায়। ভেবেছিলাম কয়েকদিন থাকব। মাটির ওপরতো বিশেষ থাকতে পারিনি। শুধু জলে জলেই দিন কেটেছে। কাজেই মাটির ওপর ভীষন টান আমার। কিন্তু এদেশ ছেড়ে যাওয়া হল না। একদিন একটা ঐতিহাসিক ঘটনা শুনলাম।
সেদিন রাজা এনিমারের রাজসভায় গেছি। রাজবাড়ি রাজসভা রাজাকে দেখতে। দেখলাম একটা শুনানি চলছে। অপরাধি এক পর্তুগীজ যুবকের বিচার চলছে। রাজা জিজ্ঞেস করলেন–তোমার নাম কী?
–কাবানা। যুবকটি বলল।
–তুমি কোন দেশের মানুষ? রাজা জানতে চাইলেন।
–পোর্তুগাল। কাবানা বলল।
–এই দেশে এসেছো কেন? রাজা জিজ্ঞেস করল।
মাননীয় রাজা জাহাজে আসার সময় এক বৃদ্ধ নাবিকের কাছে শুনেছিলাম এই লাগাসে অতীতের এক রাজার মহামূল্যবান গুপ্ত রত্নভান্ডার আছে। যুবকটি বলল।
— হ্যাঁ–রাজা সিয়োভোর গুপ্ত রত্ন ভান্ডার। কিন্তু সেসবের সঙ্গে তোমার কী সম্পর্ক? রাজা বললেন।
–আমি সেই রত্নভান্ডার উদ্ধার করার জন্যে চেষ্টা করছি। যুবক কাবানা বলল।
-বৃথা চেষ্টা। অতীতে সিয়াভোর পরে দু তিনজন রাজা সেই রত্নভান্ডার উদ্ধার করার জন্যে অনেক চেষ্টা করেছিলেন। কোন হদিশ পান নি। তুমি এখানে কয়েকদিনের মধ্যেই তা উদ্ধার করবে ভেবেছো?
–আমি চেষ্টা করব। আপনি অনুমতি দিন। কাবানা বলল।
–তোমার এই অপরাধের জন্যেই তোমাকে বন্দী করা হয়েছে। তুমি আমার অনুমতি না নিয়েই গোপনে রাজ অন্তঃপুরে প্রবেশ করেছিলে। কেন? রাজা বললেন।
–গোপন রত্নভান্ডার খুঁজতে। কাবানা বলল।
–অথচ আমার কোন অনুমতি নাওনি। রাজা বললেন।
মাননীয় রাজা–আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি। আমাকে ক্ষমা করুন। গুপ্ত রত্নভান্ডার উদ্ধারের জন্যে আমাকে অনুমতি দিন। কাবানা বলল।
–বেশ। তুমি এখানে বিদেশী। তবু তোমাকে অনুমতি দিচ্ছি। কিন্তু তোমার পরিশ্রম বৃথাই যাবে। রাজা এনিমার বললেন।
তবু আমি চেষ্টা করব। কাবানা বলল।
-করো চেষ্টা। কিন্তু অন্তঃপুরে আবার যেতে হলে দু’জন প্রহরী তোমার সঙ্গে থাকবে। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। আপনার আদেশ শিরোধার্য। কাবানা বলল।
–কোথায় উঠেছো তুমি? রাজা এনিমার জানতে চাইলেন।
–এক সরাইখানায়। কাবানা বলল।
–না। সরাইখানায় থাকা চলবে না। আমার অতিথিশালায় আমার প্রহরীদের নজরের মধ্যে থাকবে। রাজা বললেন।
–কিন্তু আমাকে তো সারা রাজ্য ঘুরে বেড়াতে হবে। কাবানা বলল।
বেশ তো। ঘুরে বেড়াবার সময় একজন প্রহরী তোমার সঙ্গেই থাকবে। যদি গুপ্ত রত্নভান্ডার উদ্ধার করতে পারো তবে আর ঐ রত্নভান্ডার নিয়ে পালাতে পারবে না। রাজা এনিমার বললেন।
–ঠিক আছে। যেমন আপনার আদেশ। কাবানা বলল।
–যাও। একজন প্রহরী তোমাকে অতিথিশালায় নিয়ে যাবে। তোমাকে পাহারা দেবে। রাজা এনিমার বললেন।
একজন প্রহরীর সঙ্গে কাবানা বেরিয়ে গেল।
এই ঘটনা আমার মনে গভীর রেখাপাত করল। মনের বড়লোক হওয়ার ইচ্ছাটা মাথা চড়া দিল। আমিও চেষ্টা করে উদ্ধার করতে পারে কি না। সেটা করতে গেলে সমস্ত ঘটনাটা জানতে হবে। তার চেয়ে সহজ পথ কাবানাকে অনুসরন করা। ও কীভাবে খোঁজে সেটা আবিষ্কার করা। যদি ও সত্যিই সেই রত্নভান্ডার আবিষ্কার করতে পারে তখন ও কে আর যদি ওর সঙ্গে প্রহরী থাকে তাহলে দু’জনকেই মেরে রত্নভান্ডার নিয়ে পালাতে পারবো। একটা ছোরা সবসময়ই আমার কোমরে গোঁজা থাকে। আর ছোরা চালাতে আমি ওস্তাদ। তরোয়ালের দরকার নেই।
দুপুরে সরাইখানার খাওয়া সেরেই বেরিয়ে পড়লাম রাজার অতিথিশালায় খোঁজে। রাজবাড়ির দেউড়ির সামনে পাহারারত এক প্রহরীকে জিজ্ঞেস করতে সে আঙ্গুল তুলে রাজবাড়ির পেছনে বাঁদিকে একটা ঘর দেখিয়ে দিল।
