–সেকি! ওরা তখন তো আমাদের আক্রমন করবে। বিনেলা বলল।
–পাগল। নিরস্ত ওরা ভালো মারেই করেই জানে খালি হাতে লড়াই করতে এলে ওরা মরবে। যাক গে–যা বললাম করো। ফ্রান্সিস বলল।
বিনেলো সৈন্যাবাসের দিক চলে গেল। তখন কয়েকজন কাঠের মিস্ত্রী সৈন্যাবাসের ভাঙা দরজা মেরামত করছিল।
ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভাইসব–নিখুঁত পরিকল্পনা করে আমরা জয়লাভ করেছি। তোমাদের শৌয সাহসের জন্য ই এটা সম্ভব হল। আমাদের কেউ মারাও যায় নি আহতও হয়নি। আমাদের কাজ শেষ। এখন খাবার আনতে বলছি। আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। একটু পরেই রাজা কার্তিনা আসবে। তার সৈন্যদের নিয়ে এ দেশ ছেড়ে চলে যাবে। তখন আমাদের কাজও শেষ হবে। তাই বলছিলাম দুপুরের খাবার খেয়ে তোমরা জাহাজে ফিরে যাও। আমার কাজ এখনও শেষ হয়নি। এখানে এখন আমি থাকব আর আমার সঙ্গে থাকবে হ্যারি আর বিনোলা। এখন খাবার খেয়ে দু’জন পশ্চিমের বনভূমির মন্দিরঘরে চলে যাও। শাঙ্কো ওখানে রয়েছে। ওকে নিয়ে এসো। শাঙ্কো এখনও সম্পূর্ন সুস্থ নয়। জাহাজে ওর চিকিৎসার প্রয়োজন। ফ্রান্সিস থামল।
দু’জন ভাইকিং বন্ধু পশ্চিমের বনভূমির দিকে শাঙ্কোকে আনতে চলে গেল।
বিনেলো ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–অতিথিশালায় চলো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–এখন অতিথিশালায় চলো। বিনেলো ফ্রান্সিসদের নিয়ে চলল। একজন ভাইকিং বন্ধু যেতে যেতে বলল–ফ্রান্সিস–আমরা কি তরোয়াল গুলো অস্ত্রঘারে রেখে আসব?
–না। এখনও আমরা বিপদ-মুক্ত নই। আগে রাজা কার্তিনা তার সৈন্যদের নিয়ে চলে যাক। তারপর আমরা অস্ত্র জমা দেব। ফ্রান্সিস বলল।
রাজবাড়ির উত্তর কোণায় অতিথিশালা। ফ্রান্সিসরা অতিথিশালায় ঢুকল। বেশ বড় ঘর। মেঝেয় দড়ি বাঁধা শুকনো ঘাসের বিছানামত। ভাইকিংরা কেউ কেউ বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস সটান শুয়ে পড়ল। তারপর হ্যারিকে কাছে আসতে বলল। হ্যারি ওর কাছে এল। ফ্রান্সিস বলল
–অতীতের রাজা সিয়াভোর রত্নভান্ডারের কথাতো শুনেছো।
-হ্যাঁ। তাই আমরা তিনজন থেকে যাবো। রাজা এনিমারের সঙ্গে এই নিয়ে কই কথা বলব। তবে আজ নয়। আজ বিশ্রাম। খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছি। ফ্রান্সিস একটু হাঁপিয়ে উঠে বলল।
কাল সকালে হয়ত রাজসভা বসবে। তখনই কথা বলব। হ্যারি বলল।
–তাই ঠিক করেছি। ফ্রান্সিস বলল।
তখনই রাজবাড়ির রাঁধুনিরা কয়েকজন কাঠের বড় বড় পাত্রের খাবার নিয়ে এল। আগে পাতা পেতে দিল। তারপর খাবার দিল। পাখির মাংসের ঝোল। ভাইকিংরা চেটে পুটে খেল। রাজবাড়ির রান্না। তার স্বাদই আলাদা। শাঙ্কোকে নিয়ে দুই বন্ধু এল। তারাও খেল।
তখনই ওরা দেখল- হাত বাঁধা বন্দী সৈন্যদের নিয়ে রাজা কার্তিনা চলে যাচ্ছে। তার মাথা নিচু। বোঝাই যায় এভাবে ছেড়ে যাবে তা কল্পনাও করতে পারেনি।
দুপুর হল। আর এক দফা খাবার এল। সবাই খেল। এবার ভাইকিংরা অস্ত্রঘরের তরোয়াল জমা দিয়ে জাহাজ ঘাটের দিকে দল বেঁধে চলল। ধ্বনি তুলল—ও–হো–হো।
সন্ধ্যের একটু পরে আতলেতা এল। হাতে একটা মোটা চামড়ার বই। বইটা ফ্রান্সিসের হাতে দিল। বলল–সেই স্পেনীয় যুবক পোমিওর লেখা বই। রাজা দিলেন।
ফ্রান্সিস শুয়ে ছিল। দ্রুত উঠে বসল। বলল–মনে হচ্ছে বইটা কাজে লাগবে। হ্যারির হাতে বইটা দিয়ে বলল–হ্যারি তুমি বইটা পড়ে যাও। আমি শুনি। হ্যারি বইটা নিল। চামড়া বাঁধাই বইটার মলাট ওল্টলো। গোটা গোটা অক্ষরে লেখা জনৈক জলদস্যুর কাহিনী। হ্যারি পড়তে শুরু করার আগে একটু পড়ে নিয়ে। বলল–পুরোন স্পেনীয় ভাষায় লেখা। শোন–আমার নাম প্রোমিও। অনেক দুঃখদারিদ্র্যের মধ্যে দিন কেটেছে আমার। স্পেনের সমুদ্র তীরবর্তী একটা ছোট বন্দরশহরে আমার জন্ম। জন্মবধি শুধু অভাবই দেখেছি আমি। বাবা ছিল সেই ছোট বন্দরের মোট বাহক। মা মারা গিয়েছিল। আমরা তিন ভাইবোন। আমি সকলের বড় ছিলাম। বাবা আমাকে একটা চাল-ভাঙা স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল। ছাত্র হিসাবে খারাপ ছিলাম না। কিন্তু বাবা তো আমাকে বই খাতাই কিনে দিতে পারত না। কাজেই স্কুলের বন্ধুদের কাছ থেকে বই ধার নিতে হত। তারাও সব সময় বই দিত না। হঠাৎ বাবা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। মাস মাইনে দিতে না পেরে আমি বিপদে পড়লাম। স্কুলের শেষ পরীক্ষা দিতে আর পাড়লাম না। শেষ পর্যন্ত বাবার কাজটা পেলাম। তখন আমি যুবক। মোট বাহকের কাজ করতে লাগলাম। বাবা সুস্থ হয়ে কাজে যোগ দিল। বন্দরের কর্তা আমাকে ছাড়িয়ে দিল।
আমার বয়সী যুবকদের দেখতাম সুখে আছে। কেউ কেউ বিয়ে করে সংসারীও হয়েছে। বড়লোকের ছেলেদের উদ্দাম আনন্দের জীবন দেখতাম। তখনই ভেবেছিলাম– বড়লোক হতে হবে। তখন এক যাত্রীবাহী জাহাজে কাজ নিলাম।
জাহাজের খালাসি হয়ে সমুদ্রে ভেসে পড়লাম। একঘেয়ে জীবন কাটতে লাগল। তখনই এক জলদস্যু দলের জাহাজের পাল্লায় পড়লাম আমরা। লড়াই করলাম। কিন্তু ওদের সঙ্গে পারলাম না। কিছু যাত্রীর সঙ্গে আমাদেরও অনেকে মারা গেল। তাদের কোনরকম শেষকৃত্য হল না। জলদস্যুদের ক্যাপটন পরে নাম জেনেছি সার্ভানো–সব মৃতদেহ ছুঁড়ে সমুদ্রে ফেলে দিতে আদেশ দিল। আদেশ পালিত হল। যাত্রীদের স্বর্ণমুদ্রা সহ জামাকাপড় সব লুঠ করা হল। আমি দেখলাম জলদস্যুতা করলে বড়লোক হতে পারব। আমি ক্যাপটেন সার্ভানোকে আমার ইচ্ছে জানালাম। আমি অভাবের মধ্যে মানুষ হলেও আমি দীর্ঘদেহী সুঠাম স্বাস্থ্যের অধিকারী ছিলাম। সার্ভানো আমাকে পছন্দ করল। জলদস্যুদের জাহাজে আশ্রয় নিলাম।
