ওরা সমুদ্রতীরে পৌঁছে দেখলো, কামানের গোলায় এখানে-ওখানে নানা জায়গায় গর্ত হয়ে গেছে। বহু ভাজি সৈন্যদের মৃতদেহ সমুদ্রতীরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে। সবার সামনে লা ব্রুশ। হাতে খোলা তরোয়াল। কোমরে গোঁজা পিস্তল। ওর পেছনেই বড় সর্দার। তারপর অন্য জলদস্যুরা। সবার হাতেই খোলা তরোয়াল।
ওরা রাজবাড়ি পৌঁছে দেখলো রাজবাড়ি খাঁ-খাঁ করছে। জনপ্রাণীর চিহ্ন পর্যন্ত নেই। লা ব্রুশ আস্তে-আস্তে গিয়ে কাঠের সিংহাসনে বসলো। খুশিতে হা-হা করে হাসতে লাগল। জলদস্যুরাও ক্যপ্টেনের হাসির সঙ্গে যোগ দিল। কিন্তু মুক্তোর খোঁজ করতে গিয়ে দেখা গেল, একটা মুক্তোও রাজদরবারে নেই। শুধু সিংহাসনে যে ক’টা মুক্তো গাঁধা ছিল, সে ক’টাই আছে শুধু। লা ব্রুশ রেগে আগুন হয়ে গেল। ক্রুদ্ধস্বরে বড় সর্দারকে হুকুম দিল–রাজা-সেনাপতি এরা সব কোথায় লুকিয়ে খুঁজে বের কর। কোন দয়া-মায়া দেখাবে না। যাকে পাবে কচুকাটা করবে।
হৈ-হৈ করতে জলদস্যুরা তরোয়াল হাতে বেরিয়ে পড়লো। সব ঘর বাড়ি খুঁজতে লাগল। স্ত্রীলোক, শিশুদের অবাধে হত্যা করতে লাগল। পুরুষ যাদের পেল, কিছু মেরে ফেলল–কিছুকে ধরে এনে শাস্তিঘরে পুরল। কিন্তু কেউ রাজা বা সেনাপতির কোন হদিশ দিতে পারল না।
রাজবাড়িতে গিয়ে জলদস্যুরা লা ব্রুশকে এই সংবাদ দিল। লা ব্রুশ চীৎকার করে বলল– নিশ্চয়ই জঙ্গলে লুকিয়েছে। সব কটাকে খুঁজে বের কর।
বড় সর্দার কয়েকজন জলদস্যুকে রাজা, সেনাপতি আর অন্যদের খুঁজে বের করবার ভার দিল। তারা বনের দিকে চলে গেলো।
লা ব্রুশ কাঠের সিংহাসন থেকে সব ক’টা মুক্তো বের করে নেবার হুকুম দিল। জাহাজে মেরামতে কাজ করে, কাঠের কাজ জানা এক জলদস্যু মুক্তোগুলো বের করবার জন্যে ছেনি-বাটালি-হাতুড়ি নিয়ে এল। লা ব্রুশ ঝড় সর্দারকে বলল যে কটা ভাজিম্বাকে ধরেছো, আমার কাছে নিয়ে এসো।
শাস্তিঘর থেকে আট-দশজন ভাজিম্বাকে লা ব্রুশের সামনে আনা হ’ল। লা ব্রুশ ওদের দিকে তাকিয়ে বললো–তোমাদের মধ্যে যে আমাদের মুক্তোর সমুদ্র থেকে মুক্তো এনে দিতে পারবে, তাকেই আমি ছেড়ে দেব।
বন্দী ভাজিম্বারা লা ব্রুশের কথা এক বর্ণও বুঝলো না। ওরা নির্বাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইলো। ব্রুশ তখন গলায় ঝোলানো মুক্তোর লকেটটা দেখাল। নানাভাবে ওদের বোঝাল’ এবার ওরা বুঝলো। ভয়ে ওদের মুখ শুকিয়ে গেল। ওরা মাথা ঝাঁকাতে লাগল।
লা ব্রুশ বড় সর্দারকে ডেকে বললো–এদের মধ্যে চারজনকে বেছে রাখো। কাল সকালে এদের নিয়ে মুক্তোর সমুদ্রে যাবো।
বড়সর্দার ভাজিম্বাদের শাস্তিঘরে ফিরিয়ে নিয়ে গেল। চারজনকে বেছেনিয়ে আলাদা ঘরে, রাখল। যারা রাজা, সেনাপতির খোঁজে জঙ্গলে গিয়েছিল, তারা সন্ধ্যেবেলা ফিরে এল। ওরা দিন কারো খোঁজ পায় নি। গভীর অরণ্য ভাজিম্বাদের নখদর্পণে। জঙ্গলের লুকানো জায়গা থেকে ওদের বের করা একরকম অসম্ভব ব্যাপার। একথা বড় সর্দারই লা ব্রুশকে বোঝাল। কোন কথা না বলে গুম হয়ে বসে রইল লা ব্রুশ। শুধু দাড়িতে হাত বুলাতে লাগল।
সন্ধ্যের পর থেকেই লা ব্রুশ ভাজিম্বাদের প্রিয় তোয়কো মদ খেতে লাগল। জলদস্যুরা তোয়কো খেয়ে রাস্তায় কোন বাড়ির উঠানে, নয়তো গাছের নীচে ফুর্তির চোটে গড়াগড়ি খেতে লাগল। লা ব্রুশ তোয়কোর নেশায় বুঁদ হয়ে কাঠের সিংহাসনের ওপরেই গুটি শুটি মেরে ঘুমিয়ে পড়ল। নিজেকে ভাবতে লাগল সম্রাট নেপোলিয়ন।
পরের দিন একটু বেলায় লা ব্রুশের ঘুম ভাঙল। বড় সর্দারকে ডেকে বলল চারজনকে বেছে রেখেছো?
বড় সর্দার মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, চলো সব, মুক্তোর সমুদ্রে যাবো। এক্ষুণি।
মুক্তোর সমুদ্রে যাবার পথ বলে কিছু নেই। ঘন গভীর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে গাছের ডাল, ঝোঁপ কেটে-কেটে পথ করে নিতে হচ্ছে। কত বিচিত্র বর্ণের বিচিত্র আকারের পাখি এই বনে। কত রকমের গাছ-পাখি এই বনে। প্রচুর রেন-ট্রী, র্যাফিয়া-রাখা গাছ, পঞ্চাশ-ষাট ফুট উঁচু। মাথায় পাতাগুলো সুন্দরভাবে ছড়ানো। বিচিত্র রকমের লেমুর, ফোসা, তন্দ্রাকাস প্রাণী। বনের মধ্যে দিয়ে পথ করে-করে ওরা যখন মুক্তোর সমুদ্রের ধারে পৌঁছল, তখন বেশ বেলা হয়ে গেছে। মুক্তোর সমুদ্রের জল নীল, নিস্তরঙ্গ। দূরে কাঁচপাহাড় দেখা যাচ্ছে।
যে চারজন জিম্বাকে লা ব্রুশ ধরে নিয়ে গিয়েছিল, এবার তাদের জলে নামাবার তোড়জোড় চলল। বড় সর্দার ওদের জলে ঠেলে-ঠেলে শাসাচ্ছে আর ওরা, ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে উঠে আসছে। লা ব্রুশ বলল–জন-দু’জন করে নামাও। উঠে আসতে চাইলে বর্শা দিয়ে খুঁচিয়ে দাও, তাহলেই আর উঠে আসতে সাহস পাবে না।
তাই করা হলো। লা ব্রুশ চেঁচিয়ে বললো–ডুব দিয়ে নিচে থেকে মুক্তো এনে দাও, তাহলেই তোমাদের ছেড়ে দেবো। ভাজিম্বারা এতক্ষণে ভালোভাবেই বুঝে ফেলেছে লা ব্রুশ কি চায়। দু’জন ভাজিম্বাকে ঠেলে নামিয়ে দেওয়া হল। একজন উঠে আসতে-আসতে পারের দিকে এলে বড় সর্দার বর্শার খোঁচা দিতে লাগল। তারপর কেউ তরোয়ালের খোঁচা, কেউ ভাঙা ডাল দিয়ে মাথায় মারতে লাগল। এবার ভাজি যুবকটি জলে ডুব দিল। অন্যজন যে ডুব দিয়েছিল, সে আর উঠল না। এই যুবকটি মাত্র একবার জলের ওপর মাথা তুলেছিল। তারপর ডুবে গেল। আর উঠলো না। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর আর দু’জনকে নামানো হ’ল একইভাবে। তরোয়াল বর্শা, আর গাছের ডাল উঁচিয়ে রইল জলদস্যুরা। ওরাও উঠে আসতে সাহস পেল না। একজন ডুব দিলো। ওর দেখাদেখি অন্য মধ্যবয়স্ক ভাজিম্বাটিও ডুব দিল। যে প্রথম ডুব দিয়েছিল সে আর উঠল না। কিন্তু মধ্যময়স্ক ভাজিম্বাটি উঠল। তাড়াতাড়ি পারের দিকে সাঁতরে আসতে লাগল। জলদস্যুরা চীৎকার করে উৎসাহ দিতে লাগল। মধ্যবয়স্কটি এসে পারে উঠল। দেখা গেল ওর ডান হাতের মুঠোয় একটা মুক্তো। লোকটা হাঁপাতে লাগল। দেখা গেল ওর সারা গায়ে যেন উঁচ বিঁধিয়ে ফুটো করে দেওয়া হয়েছে। রক্ত বেরুচ্ছে ফুটোগুলো দিয়ে। লোকটা বারকয়েক মাথা এপাশ করল। তারপর আস্তে-আস্তে চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ল। ওর দিকে তখন কারো খেয়াল নেই। সবাই লা ব্রুশের চারপাশে জড়ো হয়ে মুক্তোটা দেখছে। লা ব্রুশের লকেটের চেয়ে এই মুক্তোটা বড়। লা ব্রুশ হাসছে ঘিরে দাঁড়ানো জলদস্যুরাও আনন্দে অধীর হয়ে চীৎকার করতে লাগল। কেউ কেউ নাচতে লাগল। মুক্তো এনেছিল যে মধ্যবয়স্ক ভাজিম্বাটি, সে তখন মারা গেছে।
