দুপুর গড়িয়ে বিকেল হল। সকলেই ক্ষুধার্ত সেই রাতে শুধু রুটি খাওয়া হয়েছে।
ফ্রান্সিস ঝরা পাতার স্তূপের উপর বসে ছিল। এবার উঠে দাঁড়াল। একটু গলা চড়িয়ে বলল–মন্দিরঘরে চলো সবাই। আগে খেয়ে বিশ্রাম করে নিতে হবে। রাতে ওদের আক্রমন করতে হবে। চলো।
গভীর বনের মধ্যে দিয়ে ফ্রান্সিসদের চলা শুরু হল। ফ্রান্সিস একটু গলা চড়িয়ে বলল–দেখবে যাতে কম শব্দ হয়।
বেশ সাবধানে চলল সবাই। সবার আগে ফ্রান্সিস আর বিনেলো খোলা তরোয়াল হাতে চলল। তরোয়াল দিয়ে জংলা ঝোঁপের গাছ লতা কাটতে কাটতে চলল।
মন্দির ঘরের কাছাকাছি এসে ফ্রান্সিস হাত তুলে সবাইকে দাঁড়িয়ে পড়তে ইঙ্গি। ত করল। তারপর এক গাছের আড়ালে আড়ালে মন্দিরঘরের খুব কাছে চলে এল। একটা গাছের আড়াল থেকে দেখল মন্দিরঘরে ধারে কাছে কার্তিনার কোন সৈন্য নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। মন্দিরঘরের মধ্যেও কোন শব্দ হচ্ছে না।
ফ্রান্সিস ফিরে এসে চাপা গলায় বলল–ওরা চলে গেছে। সবাই মন্দিরঘরে এসো।
সবাই মন্দিরঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস আর বিনেলো খোলা তরোয়াল হাতে মন্দিরঘরে আস্তে আস্তে ঢুকল। দেখল মন্দিরঘর জনশূন্য। ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে বলল–এসো সবাই।
সবাই ঘরে ঢুকল। মেঝেয় বসল। কেউ কেউ শুয়ে পড়ল। ফ্রান্সিস বন্ধু রাঁধুনি দু’জনকে বলল–যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রুটি করো। রুটি চিনি খাওয়া হবে।
রাঁধুনি বন্ধুরা রান্নায় লেগে পড়ল। উনুন জ্বালা হল। কাঠের পাটাতনে আটাময়দা মাখা চলল। ভাগ্য ভাল রাজা কাৰ্জিার যোদ্ধারা হাঁড়ি উনুন ভেঙ্গে দিয়ে যায়নি। অনেক তাড়াতাড়ি রুটি করা হল। চিনি দিয়ে রুটি খাওয়া হল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে সবাই শুয়ে বিশ্রাম করতে লাগল। শুধু রাজা এনিমার মন্দিরঘরের বেদীর কাছে চুপ করে বসে রইলেন। ফ্রান্সিস তাঁর কাছে এল। বলল মান্যবর–আপনি একটু বিশ্রাম করে নিন। আপনি কিন্তু আমাদের সঙ্গে যাবেন না। আপনি এখানেই থাকবেন ঘুমোবেন।
–না–রাজা মাথা নাড়লেন–আমি তোমাদের সঙ্গে যাবো। আমার জন্যে তোমরা জীবন বিপন্ন করবে আর আমি এখানে নিশ্চিন্তে ঘুমাবো এটা হয় না। আমি অবশ্য লড়াই করতে ভাল জানি না। তবু আমি তোমাদের কাছাকাছি থাকব।
–বেশ। আপনার যেমন ইচ্ছে। তবে চেষ্টা করবেন যেন ওদের হাতে ধরা না পড়েন।
–আমার জন্যে ভেবো না। রাজা বললেন।
এবার ফ্রান্সিস নিজেও শুয়ে পড়ল। কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়ল। তবে বেশির ভাগ বন্ধু আর রাজার সৈন্যরা জেগেই রইল।
রাত গভীর হল। ফ্রান্সিসের একটু তন্দ্রা মত এসেছিল। পরক্ষণেই তন্দ্রা ভেঙে গেল। ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে বলল–তুমি থাকো।
–বেশ। শাঙ্কো বলল। সবাইকে নিয়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে মন্দিরঘর থেকে বেরিয়ে এল। সবশেষে রাজাও চললেন। প্রায় অন্ধকার বনতল দিয়ে সবাই চলল।
বন শেষ। সামনেই সদর রাস্তা। দোকান ঘরগুলোর পেছনের ঝোঁপঝাড় দিয়ে সবাই চলল। ফ্রান্সিস কাউকে সদর রাস্তায় উঠতে দিল না। চাঁদের উজ্জ্বল আলোয় সবই দেখা যাচ্ছিল।
রাজবাড়ির কাছাকাছি এসে দেখল রাজবাড়ির দেউড়িতে দু’জন প্রহরী রয়েছে। এ ফ্রান্সিস রাজবাড়ির পেছনে দিয়ে ঘুরে চলল। তারপর রাজবাড়ির পাশে এল। দেখল সৈন্যবাসের সামনে মশাল জ্বলছে। সামনের মাঠে বা সদর রাস্তায় কোন সৈন্য নেই। ফ্রান্সিস আশ্বস্ত হল।
এবার ফ্রান্সিস শুধু বিনেলোকে সঙ্গে নিয়ে রাজবাড়ির ছায়ায় ছায়ায় অস্ত্রঘরের কাছে। এল। দেখল দু’জন প্রহরী বর্শা হাতে অস্ত্রাগার পাহাড়া দিচ্ছে। ফ্রান্সিস একটুক্ষণ লক্ষ্য করে চাপা গলায় বলল–আমি বাঁদিকেরটা তুমি ডানদিকেরটা। লড়াইয়ের জন্যে সময় দেবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ওদের আহত করবে। চলো।
দ্রুত ছুটে গিয়ে দুজনে দুই প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বাঁদিকের প্রহরীটি ফ্রান্সিসের তরোয়ালের কোপ বাঁ কাঁধে পেয়ে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস এক ঝটকায় ওর হাত থেকে বর্শা কেড়ে নিল। বর্শার ছুঁচোলো মুখ ওর বুকে ঠেকিয়ে বলল–একেবারে শব্দ করবে না। কয়েদঘরে গিয়ে ঢোকো। প্রহরীটি বাঁ কাধ ডান হাতে দিয়ে চেপে বিকৃতমুখে কয়েদঘরের দিকে চলল। ততক্ষণে বিনেলো অন্য প্রহরীটির পায়ে তরোয়ালের ঘা মেরেছে। প্রহরীটি পা দুহাত চেপে বসে পড়েছে। ফ্রান্সিস তাকেও কয়েদঘরের দিকে নিয়ে চলল। দু’জনকেই খোলা দরজা দিয়ে কয়েদঘরে ঢুকিয়ে দিল। দরজার পাশে বড় তালাটা ঝুলছিল। দরজা আস্তে বন্ধ করে কড়ায় তালা ঝুলিয়ে দিল। চাপাস্বরে বলল–কোনরকম শব্দে করলেই মরবে। একেবারে চুপ করে থাকবে। এবার অস্ত্রঘরের চাবিটা দাও। একজন কোমরের চামড়ার বন্ধনী থেকে চাবিটা খুলতে লাগল। ফ্রান্সিস তাড়া দিল–জদি। প্রহরীটি চাবি খুলে নিয়ে দরজার ফাঁক দিয়ে চাবিটা ফ্রান্সিসকে দিল।
ফ্রান্সিস ছুটল। অস্ত্রঘরের সামনে এল। পেছনে বিনেলো। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–সবাইকে ডাকো। তাড়াতাড়ি। বিনেলে সঙ্গে সঙ্গে ছুটল। অল্পক্ষণের মধ্যেই সবাই অস্ত্রাগারের সমানে এল। ততক্ষণে ফ্রান্সিস দরজার তালা খুলে ফেলেছে। সবাই ঘরে ঢুকে তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে আসতে লাগল। রাজবাড়ির আড়াল থেকে রাজা এনিমার এসব দেখতে লাগলেন।
সবাই তরোয়াল হাতে একত্র হলে ফ্রান্সিস সবাইকে চাপাস্বরে বলল–এবার আমরা সৈন্যাবাস আক্রমন করব। ওরা নিরস্ত্র এবং ঘুমন্ত। নিজের জীবন বিপন্ন না হলে কাউকে হত্যা করবে না। আহত করবে। চলো সব। এক মূহুর্ত দেরি করা চলবে না। সবাই খোলা তরোয়াল হাতে ছুটে মাঠ পার হয়ে সৈন্যাবাসের দরজার সামনে এল। ফ্রান্সিস বলে উঠল-লাথি মেরে দরজা ভাঙো। ওরা দরজায় লাথি মারতে লাগল। দরজা ভেঙে যেতে লাগল। রাজা কার্তিনার সৈন্যদের ঘুম ভেঙে যেতে লাগল। বিছানায় উঠে বসে দেখল সামনে তরোয়াল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে হয় ভাইকিংরা নয় তো রাজা এনিমারের সৈন্যরা। রাজা কান্সিার নিরস্ত্র সৈন্যরা সহজেই হার স্বীকার করল।
