— ফ্রান্সিস—একটা গুহা আছে। আতলেতা বলল।
–না। ওখানে নয়। গুহার কথাও ওরা জানে। ঘন বনের এলাকাটা কোনদিকে? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-একটা সরোবর আছে। তার পূর্বদিকে বন খুব ঘন। বড় বড় গাছলতাপাতার সংখ্যাটা বেশি। নিচে দিয়ে হাঁটাই যায় না। আতলেতা বলল।
–ওখানেই চলো সব। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই উঠে দাঁড়াল। সারা রাত ঘুম নেই করো। শরীর একটু দুর্বল লাগছে সবারই। কিন্তু উপায় নেই। সবাই নিরস্ত্র। কার্তিনার সৈন্যরা এলে ধরা পড়তে হবে সহজেই। এসব কথা ভাবতে হল সবাইকে। রাজা এনিমার উঠে দাঁড়ালেন। আতলেতার পেছনে পেছনে চলল সবাই।
বেশ কিছুটা যেতে দেখা গেল সামনেই একটা সরোবর। সকালের আলো পড়ে। জলে মৃদু ঢেউ চিকচিক্ করছে। সরোবরের ডানপাশে জঙ্গলে ঢুকল সবাই। সত্যিই গভীর বন। বড় বড় গাছের জটলা। একফোঁটাও রোদ ঢুকছে না। অন্ধকার বনতল। মোটা মোটা গাছের গুঁড়িতে পা রেখে অথবা কোনরকেমে পাশ কাটিয়ে একটা একটু ফাঁকা জায়গায় এল সবাই। অতলেতা বলল–এখানেই বিশ্রাম নেব। চারধারে বড় বড় গাছ। নজরে পড়ার কোন সম্ভবনা নেই। সবাই এখানে ওখানে বসল। কেউ মোটা দুলছে এমন লতায় কেউ গাছের গুঁড়িতে কেউ ঝরাপাতার স্কুপের ওপর। সবাই কম বেশি হাঁপাচ্ছে তখন। রাজা এনিমার বসলেন একটা গাছের গুঁড়িতে। কেউ কোন কথা বলছে না।
তখন একটু বেলা হয়েছে। হঠাৎ দূরে ঐ মন্দিরঘরের দিকে রাজা কার্তিনার সৈন্যদের ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির শব্দ কিছুটা অস্পষ্ট শোনা গেল। বোঝা গেল ফ্রান্সিসের অনুমান ঠিক। ওরা সকলেই ফ্রান্সিসদের খুঁজতে বেরিয়েছে।
হঠাৎ রাজা এনিমার গাছের গুঁড়ি থেকে উঠে দাঁড়ালেন। একটু গলা চড়িয়ে বললেন–তোমরা এখানেই থাকো। আমি রাজা কার্তিনার হাতে ধরা দিতে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস শুকনো পাতার স্তূপের উপর বসেছিল। দ্রুত উঠে রাজার কাছে ছুটে এল। বলল–আপনি কী বলছেন? আপনি ধরা দিলে রাজা কার্তিনা আপনাকে ফাঁসি দিতে পারে।
–দিক। লড়াইতো বন্ধ হবে। আর কারো প্রান যাবে না। রক্তপাত বন্ধ হবে। রাজা বললেন।
–আপনি ধরা দিলে রাজা কার্তিনা নির্বিঘ্নে আপনার প্রজাদের হত্যা করতে মরীয়া হয়ে উঠবে। ফ্রান্সিস বলল।
–না-না। ও এই লাগাস রাজত্বে রাজা হবে। আর নরহত্যা করবে না। রাজা। বললেন। ফ্রান্সিস নানাভাবে রাজা এনিমাকে বোঝাতে লাগল। কিন্তু রাজা এনিমা নিজের সিদ্ধান্তে অটল। ফ্রান্সিস আতলেতাকে বলল-ভাই তুমি রাজাকে বোঝাও। আতলে মৃদুস্বরে বলল তুমি রাজা এনিমাকে জানোনা। ওর সঙ্কল্প থেকে কেউ ওকে নড়াতে পারবে না। তখন ফ্রান্সিস রাজাকে বলল–মান্যবর রাজা আমার অনুরোধ–আজকের রাতটা আমাকে সময় দিন। যা করবার কালকে করবেন।
–দেখ–তোমরা বিদেশী–আমার জন্যে তোমরা প্রান দেবে কেন? রাজা বললেন।
আমরা সবাই মারা যাবো এটা ভাবছেন কেন? আমরা পরিকল্পনা মত এগোব। যাতে একজন যোদ্ধাও মারা না যায়। তার জন্যে সাবধান হব আমরা। আর আমাদের দু’একজন বন্ধু যদি লড়াই করতে গিয়ে মারা যায় বা আহত হয় তার জন্যে আপনাকে আমরা দোষী মনে করব না। তাই আবার অনুরোধ করছি আজ রাতটা আমাকে সময় দিন। রাজা মাথা নিচু করলেন। কিছুক্ষণ ভাবলেন। মাথা তুলে বললেন–ঠিক আছে। আজকের রাতটাই তোমাকে সময় দিলাম। কিন্তু যাই করনা কেন কেউ যেন মারা না যায়।
কিন্তু মান্যবর রাজা লড়াই হবেই। ওরা সহজে আত্মসমর্পন করবে না। তবে কেউ যাতে মারা না যায় সেভাবেই লড়াই চালাব আমরা। তবে আহত হতে পারে। এটা আপনাকে মেনে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। মৃত্যু না হলেই হল। রাজা বলল।
–কিন্তু ওরা তো মারা যেতে পারে আহত হতে পারে। ফ্রান্সিস বলল।
–তার দায়িত্ব ওদের রাজার কার্তিনার আমার নয়। রাজা বললেন।
যাইহোক রাজা এনিমাকে তাঁর সংকল্প থেকে সরাতে পেরেছে এই ভেবে ফ্রান্সিস খুশি হল। তবে দায়িত্ব বাড়লো। মাত্র আজ রাতের মত সময়টুকু পেল। রাজা কার্তিনাকে যুদ্ধে হারাতে হবে। তার জন্যে পরিকল্পনা চাই। বেশ ভেবে চিন্তে আক্রমণ করতে হবে। জয়ী হতেই হবে। ভরসা এইটুকুই যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধা বন্ধুরা রয়েছে। রাজা এনিমার সৈন্যরাও রয়েছে। লড়াইটা প্রায় সমানে সমানেই হবে। আর একটা বড় সমস্যা ভাবতে হচ্ছে। ওরা দু’জন বাদে সবাই নিরস্ত্র। যে করেই হোক রাজা এনিমারের অস্ত্রাগার থেকে অস্ত্র জোগাড় করতে হবে। এটা করতে পারলে অর্ধেক লড়াই জেতা হয়ে যাবে। লড়াই করতে হবে বুদ্ধি খাটিয়ে যাতে আমাদের হতাহতের সংখ্যা কম হয়।
রাজা এনিমার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন। সবাই নিশ্চিন্ত হল। ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। ও যা ভাবছে সব বলল। সব শুনে হ্যারি বলল–চোরাগোপ্তা আক্রমন চালাতে হবে। আমাদের লোকক্ষয় যাতে কম হয় অথবা একেবারেই যাতে না হয়।
হ্যাঁ। দায়িত্বটা বেড়ে গেল। এখন চূড়ান্ত লড়াইয়ের জন্যে আমাদের তৈরী হতে হবে।
হঠাৎ আরো দূরে রাজা কার্তিনার সৈন্যদের হৈ হল্লা খুব অস্পষ্ট শোনা গেল। আতলেতা কাছেই বসে ছিল। বলল–গুহার কাছে গেছে ওরা। ভেবেছে ঐ গুহাতেই আশ্রয় নিয়েছি আমরা।
–বলছিলাম কি না যে গুহায় আশ্রয় নেওয়া চলবে না। ধরা পড়ে যাবো। নিরস্ত্র অসহায় আমরা। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে লাগল। রাজা কার্তিনার সৈন্যরা হয়ত বনের মধ্যে খোঁজাখুঁজি শুরু করেছে। কিন্তু এদিককার গভীর বনের দিকে ওরা এল না। বোধহয় বুঝে নিল ফ্রান্সিসরা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে চলে গেছে।
