রাত বাড়ল। রাতের খাবার নিয়ে দু’জন প্রহরী ঢুকল। একজনের হাতে কাঠের গামলায় খাবার রাখার লম্বাটে শুকনো পাতা। ফ্রান্সিস বাইরের দিকে তাকাল। ভেজানো দরজার লম্বাটে ফাঁকের মধ্যে দিয়ে দেখল তরোয়াল হাতে দু’জন যোদ্ধা এদিক ওদিক ঘুরছে। তরোয়াল কোষবদ্ধ।
সঙ্গে সঙ্গে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়িয়ে এক প্রহরীর হাতের খাবার-ভরা কাঠের গামলাটা তুলে নিয়ে প্রহরীর মুখে ছিটিয়ে দিল। প্রহরীটি এই হঠাৎ আক্রমনে দিশেহারা হল। খাবারের ঝোল লেগে ওর চোখ জ্বালা করে উঠল। দুহাতে দুচোখ চেপে বসে পড়ল। বিনেলো ততক্ষণে অন্য প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। তার হাত থেকে রুটির থালা পাতা ছিটকে গেল। ও ছিটকে মেঝেয় পড়ে গেল। সিনাত্রা ছুটে এসে ফেট্টির কাপড় দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল। অন্য প্রহরীটি তার চোখ দু’হাতে চোখ মুছে দিল। সিনাত্রা এক লাফে তার সামনে এসে ফেট্টি কাপড় দিয়ে ওর মুখ বেঁধে ফেলল। দু’জন প্রহরীর মুখ দিয়ে গোঁ গোঁ শব্দ বেরোতে লাগল।
বাইরের যোদ্ধা দু’জন তরোয়াল খাপ থেকে খুলে নিয়ে ছুটে ঘরের মধ্যে এসে ঢুকল। বিনেলো সঙ্গে সঙ্গে একজন প্রহরীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার কাঁধে ছোরা বসিয়ে দিল। প্রহরীটি তরোয়াল ফেলে দিয়ে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে তরোয়াল তুলে নিল। অন্য প্রহরীটা ফ্রান্সিসের মাথা লক্ষ্য করে তরোয়াল চালাল। ফ্রান্সিস তৈরিই ছিল। এখন লড়াইয়ের সময় নেই। দ্রুত প্রহরীটিকে পরাস্ত করতে হবে। ফ্রান্সিস প্রচন্ড বেগে তার তরোয়ালের ঘা মারল। প্রহরীর হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। বিনো সঙ্গে সঙ্গে সেই তরোয়ালটা তুলে নিল।
সিনাত্রা ছুটে এসে আহত প্রহরীটির মুখ বেঁধে ফেলল। অন্য প্রহরীটিকে তখন কয়েকজন ভাইকিং চেপে ধরেছে। তার মুখ ফেট্টির কাপড় দিয়ে বাঁধা হল। চারজনের মুখই বাঁধা পড়ল। ফ্রান্সিস প্রহরী আর যোদ্ধাদের দিকে তাকিয়ে চাপাস্বরে বলল–কেউ টু শব্দটি করবে না। বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–পালাও-জলদি। বন্ধুরা খোলা দরজার দিকে ছুটল। রাজা এনিমার হাঁ করে এসব দেখছিলেন। আতলেতা রাজার কাছে এসে বলল–মাননীয় রাজা বেরিয়ে আসুন–তাড়াতাড়ি।
রাজা উঠে দাঁড়িয়ে যতটা সম্ভব দ্রুত কয়েদঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল। কার্তিনার যোদ্ধাদের ঘর থেকে বেরোতে দিল না ফ্রান্সিস। নিজে বাইরে এসে দরজায় তালা ঝুলিয়ে দিল। চাবি নেই। ঝোলানো তালাতেই কাজ চলবে।
সবাই বাইরের ছোট মাঠটায় এল। ফ্রান্সিস ডেকে বলল–আতলেতা কোনদিকে পালাবো?
পশ্চিম দিকে। পাহাড়ে জঙ্গলে। চলো সব। আতলেতা বলে উঠেই বড় রাস্তা দিয়ে পশ্চিমদিকে ছুটল। পেছনে আর সবাই। বিনেলো শাঙ্কোকে প্রায় জড়িয়ে ধরে ছুটল। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। সবকিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। সবাই ছুটে চলেছে। সিনাত্রা রাজাকে ছুটতে সাহায্য করছে। ফ্রান্সিস আগেই ওদের এই দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছে।
সবাই হাঁপাচ্ছে তখন।
ফ্রান্সিস পিছনে তাকিয়ে দেখল দূরে সৈন্যরা ছুটে আসছে। ততক্ষণে ফ্রান্সিস বনের গাছগাছালির কাছে চলে এসেছে।
অল্পক্ষনের মধ্যেই সবাই অন্ধকার বনভূমিতে ঢুকে পড়ল।
পেছনে দূর থেকে সৈন্যদের হৈ হল্লা শোনা যাচ্ছে। বনের মধ্যে ভাঙা জ্যোৎস্না পড়েছে। কখনও বড় বড় গাছের গুঁড়ির ওপর পা রেখে কখনো পাশ কাটিয়ে ফ্রান্সিসরা বনের মধ্যে যেতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে সৈন্যদের হৈ হল্লা আর শোনা গেল না।
হঠাৎ সামনে একটা আধভাঙা ঘর। আতলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এই মন্দিরেই আশ্রয় নেওয়া যাক। এই মন্দিরে রাজা এনিমারের কুলদেবতা প্রতিষ্ঠিত আছেন। রাজা এখানেই প্রতি শনিবার সকালে পূজো দিতেন।
সবাই মন্দির ঘরে ঢুকল। লম্বাটে ঘরটার এক কোনায় উঁচু পাহাড়ের বেদী। তার উপর একটা পাথরের এবড়ো খেবড়ো মূর্তিমত। কিছুটা ভাঙা চালা দিয়ে জোৎস্না পড়েছে। মূর্তির সামনে ফুলপাতা ছড়ানো।
এবড়োখেবড়ো পাথরের মেঝেয় সবাই বসে পড়ল। সবাই হাঁপাচ্ছে। রাজা এনিমার বেদীর কাছে গিয়ে বসে পড়লেন। বেদী ছুঁয়ে হাতটা বুকে রাখলেন।
ফ্রান্সিস দ্রুত শাঙ্কোর কাছে এল। বলল–শাঙ্কো—তুমি–। ওকে থামিয়ে দিয়ে শাঙ্কো হেসে বলল–আমি ঠিক আছি। আমার জন্যে ভেবো না। ফ্রান্সিস আর কিছু বলল না।
এবার ফ্রান্সিস হ্যারির কাছে এল। দেখল হ্যারি শুয়ে পড়েছে। হ্যারি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–ওরা হয়ত আমাদের খোঁজে এখানে আসবে।
উঁহু। এখন নয়। কাল সকালে আসবে। দিনে তবু কিছু আলো পাবে। তখনই খোঁজা সুবিধে। এখন তো বনতল অন্ধকার। ফ্রান্সিস হ্যারির পাশে শুয়ে পড়ল।
রাতে কারো খাবার খাওয়া হয়নি। খাবারভর্তি কাঠের গামলা প্রহরীর মুখে ছুঁড়ে ফেলে ফ্রান্সিসরা পালিয়েছে। কাজেই সবাই ক্ষুধার্ত।
ফ্রান্সিস শুয়ে শুয়ে এই খাবারের সমস্যার কথাই ভাবছিল। একটু পরে ডাকল হ্যারি?
-বলো।
–আমরা সবাই ক্ষুধার্ত। ফ্রান্সিস বলল।
-হ্যাঁ।
কতদিন বনে জঙ্গলে পাহাড়ে লুকিয়ে থাকতে হবে বুঝতে পারছি না। সুতরাং খাবারের জোগাড় রাখতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে তো খাবারের দোকান থেকে সেসব চুরি করে বা সোনার চাকতির বিনিময়ে কিনে আনতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
-পারবে? হ্যারি একটু সংশয়ের সঙ্গে বলল।
–সেটা সদর রাস্তায় না গেলে বুঝতে পারছি না। মনে হয় রাজা কার্তিনার সৈন্যরা সৈন্যাবাসে চলে গেছে। অন্ধকার বনে জঙ্গলে-আমাদের খোঁজ পাবে না। কাজেই সকালের জন্যে ওরা অপেক্ষা করবে। এই সুযোগে আমাদের খাবার জোগাড়– করতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
