ভেন ঝোলায় বোয়াম কৌটো ভরতে ভরতে বলল
–তরোয়ালের ক্ষত শুকিয়ে যাবে। ভয়ের কিছু নেই। তবে শাঙ্কোর ঘা সারতে একটু সময় লাগবে। ও যেন বেশি নাড়াচাড়া না করে। আমি পরশু আসবো। ওষুধ দেব।
রাজকুমারীর দিকে নজর রেখো। জাহাজে তুমি ছাড়া আর কেউ তো রইল। না। হ্যারি বলল।
তোমরা নিশ্চিন্ত থাকো। রাজকুমারীকে আমি প্রাণ দিয়ে হলেও রক্ষা করব। ভেন বলল। তারপর ঝোলা কাঁধে নিয়ে চলে গেল।
দুপুরে খাবার দেওয়া হল। লম্বাটে শুকনো পাতায় দেওয়া হল আধপোড়া গোলরুটি আনাজের ঝোল আর সবশেষে আশ্চর্য! পাখির মাংস। ফ্রান্সিসরা, পেট পুরে খেল। প্রহরীরাই খেতে দিয়েছিল। শাঙ্কোকে ওষুধ খাওয়ানো হল। পাখীর মাংস বেশ পেট পুরেই খেল ওরা। পাথরের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে ফ্রান্সিস চোখ বুজে ছিল। হঠাৎ প্রশ্ন শুনল–তোমরা তো বিদেশী। ফ্রান্সিস চোখ মেলে তাকাল। দেখল লম্বা চুলওয়ালা যুবকটি কখন ওর কাছে এসে বসেছে। শাঙ্কোর জন্যে মনটা ভাল নেই তবু কথা বলল
-হ্যাঁ অমারা ভাইকিং।
–ও। দুঃসাহসী হিসেবে তোমাদের সুনাম আছে। যুবকটি বলল।
ফ্রান্সিস চুপ করে রইল।
–তোমার নাম কী? যুবকটি জানতে চাইল।
–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস বলল।
–আমার নাম আতলেতা। পর্তুগালে আমার জন্ম। কিন্তু বড় হয়েছি এখানে। আতলেতা বলল।
–রাজা কার্তিনা তোমাদের বন্দী করেছেন কেন? আতলে জিজ্ঞেস করল।
ফ্রান্সিস আহত শাঙ্কোকে দেখিয়ে বলল-ও মাথা গরম করে কার্তিনার এক যোদ্ধাকে মেরে ফেলেছে।
মাত্র একটাকে মেরেছে। গোটা পাঁচেক যোদ্ধাকে মারতে পারল না। আতলেতা বলল।
–একটাকে মেরেই চাবুক খেয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
–রাজা কার্তিনা তোমার বন্ধুকে মেরে ফেলেনি এটাই আশ্চর্য। কার্তিনার মত নরপশু দুটি নেই। আতলেতা বলল।
-তোমাদের অপরাধ। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
সেই রাশভারি চেহারার মানুষটি দেখিয়ে আতলেতা বলল
–উনি এই লাগাস রাজ্যের রাজা–এনিমার। বৃদ্ধকে দেখিয়ে বলল– উনি মন্ত্রীমশাই। রাজা কার্তিনার রাজ্য পশ্চিমের পাহাড়ের ওপর। লড়াই করে এই লাগাস রাজ্য জয় করেছে রাজা কার্তিনা। মন্ত্রীকে আর আমাকে এই কয়েদ ঘরে বন্দী করে রেখেছে। এখন আমাদের ফাঁসি দিলেও আমরা অবাক হব না। আতলেতা বলল।
–আর সেনাপতি? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
লড়াইয়ে মারা গেছেন। তখন আমাকেই সেনাপতির কাজ চালাতে হচ্ছিল। সেই আমিও হেরে গিয়ে বন্দী। আতলেতা বলল।
–রাজা এনিমারের তো এখানে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। ফ্রান্সিস বলল।
উনি অন্য রকম মানুষ। নিজের গ্রন্থাগারেই দিনের অধিকাংশ সময় কাটাতেন। লড়াই রক্তপাত মৃত্যু এসব মোটেই পছন্দ করেন না। তাই রাজা কার্তিনা সহজেই জয়লাভ করেছে।
-রাজত্ব রাখতে গেলে যুদ্ধ লড়াই আছেই। তারপর পাশ্ববর্তী রাজ্য যদি আক্রমণকারী হয়। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা এনিমার এসব ব্যাপারে উদাসীন। ভালো মানুষ যেমন হয় আর কি। আতলেতা বলল।
–তোমরা বন্দী হলে কীভাবে। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
রাজা এনিরের জন্যে। দিন দশেক আগের কথা। তখন বেশ রাত। ঘুমিয়ে ছিলাম। হঠাৎই বড় রাস্তায় হৈ চৈ শুনলাম। তরোয়াল নিয়ে বেরিয়ে এলাম। দেখি রাজা কার্তিনার নেতৃত্বে তার যোদ্ধারা রাস্তা দিয়ে ছুটছে আমাদের সৈন্যবাসের দিকে। বুঝলাম ঘুমন্ত সৈন্যদের ওরা অক্রমন করতে চলেছে। তখন আর আমাদের সৈন্যদের সাবধান করার সময় নেই। রাজা এনিমারকে বাঁচাতে আমি বাড়িঘরের ছায়ায় ছায়ায় লুকিয়ে রাজবাড়ির সামনে এলাম। দেখলাম প্রহরীদের সঙ্গে ওদের সৈন্যদের লড়াই চলছে। আমি লড়াইয়ে জড়ালাম না। যেকরে তোক রাজা এনিমারকে বাঁচতে হবে। লড়াইয়ের ফাঁকে আমি রাজবাড়ির অন্দরমহলে ঢুকে পড়লাম। দেখি রাজা এনিমার ঘুম ভেঙ্গে বিছানায় উঠে বসে আছেন। আমি ছুটে এসে অন্দরমহলে প্রহরীকে বললাম
-শিগগিরি যাও। পেছনের দরজা খুলে দাও। ফিরে এসে দেখি রাজা পোশাক বদল করেছেন। বেরোবার জন্যে তৈরি। আমি বললাম
–প্রহরীরা শত্রুসেনার সঙ্গে লড়ছে। এই সুযোগ আমরা পেছনের দরজা দিয়ে পালাবো।
–না। আমি ধরা দেবো। রাজা এনিমার বলল।
–বলেন কি? আমি বেশ চমকে উঠলাম।
–হ্যাঁ। আমি ধরা দিলেই লড়াই বন্ধ হবে। আর রক্ত ঝববে না। রাজা বললেন।
–আপনার ফাঁসিও দিতে পারে। আমি বললাম।
–দিক। তবু রক্তপাত তো বন্ধ হবে। রাজা বললেন।
আমি নানাভাবে রাজা এনিমার বোঝাবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু রাজা অনড়। বন্দীদশাই মেনে নেবেন। আতলেতা থামল।
-তারপর? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–তখনই একজন প্রহরী এসে জানিয়ে গেল লড়াই করতে করতে সেনাপতি মৃত্যবরণ করেছেন। মন্ত্রীর বাড়ি আক্রমন করে মন্ত্রীকে বন্দীকে করা হয়েছে। রাজা এনিমার আমাকে বললেন-যাও। এখনও যে যোদ্ধারা বেঁচে আছে তারা যেন অস্ত্রত্যাগ করে। অথবা লড়াই থামিয়ে পশ্চিমে বনজঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে আত্মরক্ষা করে। মোট কথা লড়াই নয়। রাজার আদেশ। মানতেই হবে। একটু থেমে আতলেতা বলতে লাগল–রাজবাড়ির দেউড়ি ছাড়িয়ে রাস্তায় এলাম। তখন প্রহরীদের সঙ্গে লড়াই শেষ। আহত মৃত প্রহরীরা দেউড়ি এখানে ওখানে পড়ে আছে। একটু থেমে আতলেতা বলতে লাগল
রাস্তায় গিয়ে দাঁড়ালাম। তখনও আমাদের যোদ্ধারা লড়াই করে চলেছে। আমি দুহাত তুলে চিৎকার করে লড়াই থামালাম। আমাদের যোদ্ধাদের রাজার আদেশ জানালাম। আত্মসর্মপন করতে বললাম। যোদ্ধারা আমার ইঙ্গিত বুঝল। গ্রেপ্তারি এড়াতে সবাই দলে দলে পশ্চিমের জঙ্গলের দিকে ছুটল। কিছু বন্দী হল অবশ্য। তাদের সৈন্যবাসের একটি ঘরে বন্দী রাখা হয়েছে। একটু থেমে আতলেতা বলতে লাগল-রাজবাড়ির অন্তঃপুরে তখন রাজা কার্তিনার সৈন্যরা ঢুকে পড়েছে। রাজা কার্তিনা স্বয়ং রাজা এনিমারের শয়নঘরে এসে হাজির হল। হাতে খোলা তরোয়াল। রাজা এনিমার বললেন–আমাকে বন্দী করুন। অনুরোধ লড়াই বন্ধ করুন। লড়াই ততক্ষণে থেমে গেছে। রাজা কার্তিনা আমাকে আর রাজাকে বন্দী করল। তারপরে আমাদের এই কয়েদঘরে বন্দী করে রাখা হল। ওরা মন্ত্রীর বাড়িও আক্রমন করেছিল। সেখান থেকে মন্ত্রীকেও বন্দী করেছিল। ফ্রান্সিস চুপ করে সব শুনল। তারপর বলল–আতলেতা আমাকে তুমি তোমাদের রাজার কাছে নিয়ে চলো।
