ফ্রান্সিস হাত তুলে চিৎকার করে উঠল–থামো। দলপতি হাঁপাতে হাঁপতে রাজার দিকে তাকাল।
–চাবুক চালিয়ে মেরে ফেল। রাজা কার্তিনা চেঁচিয়ে বলে উঠল। ফ্রান্সিস দাঁত চাপাস্বরে বলল–আর একবার চাবুক মারলে আমরা লড়াইয়ে নামব।
রাজা হো হো করে হেসে উঠল। বলল–তোমাদের হাতে একটা লাঠিও নেই।
–নিরস্ত্র অবস্থায় কী করে লড়াই করতে হয় আমরা জানি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা সবাই মরবে। রাজা বলল।
আমাদের বন্ধুকে বাঁচাতে আমরা মরতে প্রস্তুত। ফ্রান্সিস বলল। মনে রাখবেন আমরা ভাইকিং। আমরা মৃত্যুর পরোয়া করি না।
তখনই মন্ত্রী উঠে দাঁড়াল। বলল–কিন্তু ও তো আমাদের এক যোদ্ধাকে হত্যা করেছে।
–তার জন্যে আমরা ক্ষমা চাইছি। আমরা তো বললাম–ও হত্যা করতে চায়নি। যোদ্ধাটিকে আহত করতে চেয়েছিল। হ্যারি বলল।
-বেশ। তার শাস্তি ও পেয়েছে। মন্ত্রী বলল। তারপর আসনে বসে পড়ে রাজাকে বলল–মান্যবর রাজা–ক্ষমা করে দিন। রাজা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল–বেশ। আপনার কথাই থাক।
–মান্যবর রাজা–ফ্রান্সিস বলল–আমাদের কোথায় বন্দী হয়ে থাকতে হবে?
কয়েদ ঘরে। রাজা বলল।
একটা কথা ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো। রাজা বলল।
মারিয়াকে দেখিয়ে ফ্রান্সিস বলল ইনি আমাদের দেশের রাজকুমারী। কয়েদঘরের পরিবেশে উনি থাকতে পারবেন না। অনুরোধ করছি তাঁকে আমাদের জাহাজে রাখুন। উনি তো আর একা জাহাজ চালিয়ে পালাতে পারবেন না।
-থাকুক। তবে আমাদের এক যোদ্ধা পাহারায় থাকবে। রাজা বলল।
–বেশ। ফ্রান্সিস এবার ভেনকে দেখিয়ে বলল–ইনি আমাদের চিকিৎসক বৈদ্য। ইনিও মধ্যবয়স্ক। একা ওর পক্ষে পালানো অসম্ভব। ওঁকেও আমাদের জাহাজে থাকতে অনুমতি দিন।
–তাহলে দুজন প্রহরী থাকবে। রাজা বলল।
–ঠিক আছে। আমাদের আহত দুই বন্ধুকে উনিই চিকিৎসা করবেন। সেই অনুমতি দিন।
–আমার কোন আপত্তি নেই। তোমাদের আর কোন অনুরোধ রাখা আমার হবে না। রাজা এবার সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বলল–এদের দু’জন ছাড়া সব কজনকে কয়েদঘরে বন্দী করুন। সেনাপতি বলল– মাননীয় রাজা–আমাদের হুকুমে বন্দরে একটা স্পেনীয় জাহাজ থেকে আর একটা মালবাহী জাহাজ থেকে নাবিকদের বন্দী করে এনে কয়েদঘরের রাখা হয়েছে।
জাহাজ দুটো তল্লাশী হয়েছে? রাজা জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ। সেনাপতি ঘাড় কাত করে বলল।
–মূল্যবান কিছু পাওয়া গেছে? রাজা আবার প্রশ্ন করল।
–সামান্য কিছু বিদেশী স্বর্ণমুদ্রা পাওয়া গেছে। সেনাপতি বলল।
–ওদের মুক্তি দাও। প্রতিদিনের খাওয়ার খরচ বাঁচানো যাবে। রাজা বলল।
সেনাপতি মাথা নুইয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের কাছে এসে বলল–চলে সব। বিনেলো শাঙ্কোকে ধরে ধরে নিয়ে এল। সিনাত্রাও সাহায্য করল।
রাজবাড়ির বাইরে এল সবাই। সামনে পেছনে যোদ্ধারা। রাজবাড়ির পেছনে কয়েদঘরের সামনে এল। দলপতি সকলের আগে ছিল। ঘুরে দাঁড়িয়ে সবাইকে দাঁড়াতে ইঙ্গিত করল। তারপর এগিয়ে গিয়ে প্রহরীদের একজনকে বলল–বন্দর থেকে যে নাবিকদের বন্দী করা হয়েছে তাদের সবাইকে ছেড়ে দাও।
প্রহরীরা দরজা খুলে নাবিকদের বেরিয়ে আসতে বলল। বন্দী নাবিকরা আস্তে। আস্তে বেরিয়ে এল। তারা সংখ্যায় পঁচিশ তিরিশ জন।
তারা সদর রাস্তায় নেমে জাহাজ ঘাটের দিকে চলল।
তোমরা তো হত দরিদ্র। তল্লাশী হয়ে গেছে। প্রায় কিছুই পাওয়া যায় নি। দলপতি বলল। কথাটা হ্যারিও শুনতে পেল। গলা নামিয়ে বলল–রাজকুমারীর সোনার চাকতি গুলো লুকিয়ে রেখেছিলেন। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। মৃদ্যু হাসল। কষ্ট করেই হাসল। কারন শাঙ্কোর জন্যে ওর মন ভালো নেই।
ফ্রান্সিসদের কয়েদঘরে ঢোকানো হতে লাগল। মারিয়া আর ভেন একপাশে দাঁড়িয়ে রইল। ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে ঢুকে গেল।
দলপতি দু’জন প্রহরীকে সঙ্গে নিয়ে মারিয়াদের কাছে এল। প্রহরীদের দেখিয়ে বলল–এরা তোমাদের জাহাজে যাচ্ছে। পালাবার চেষ্টা করবে না। মারিয়ার কথা বলতে ইচ্ছা করল না। দু’জনে প্রহরীর পাহারায় জাহাজ ঘাটের দিকে চলল।
কয়েদঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখল ঘরটা নেহাৎ ছোট না। হাত পা ছড়িয়ে থাকা যাবে। দেখল আগে থেকেই তিনজন বন্দী রয়েছে। মধ্য বয়স্ক একজন বৃদ্ধ আর অন্যজন যুবক। মধ্যবয়স্কর চেহরায় বেশ রাশভারি। মুখে অল্প কাঁচাপাকা দাড়ি গোঁফ। সুগোঠিত দেহ। একজন সাহসী যোদ্ধার মতই চেহারা।
শাঙ্কোকে ততক্ষণে ধরে ধরে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। ও চিৎ হয়ে শুতে পারছে না। ও বাঁদিকে কাতর হয়ে শুয়ে রইল। ও গোঙাচ্ছে না। কিন্তু ওর যন্ত্রনাক্লিষ্ট মুখ। দেখে বোঝা যাচ্ছে ও প্রাণপণে যন্ত্রনা সহ্য করছে।
ফ্রান্সিস আশায় রইল কতক্ষণে ভেন আসে।
বেশ কিছুক্ষর পরে ভেন ঝোলা কাঁধে এল। যাহোক প্রহরীরা ওকে বাধা দিল না। দরজা খোলা হল। ভেন ঘরে ঢুকল। কাধ থেকে ঝোলা নামিয়ে মেঝেতে রাখল। শাঙ্কোর কাছে গেল। বলল–জামাটা খোল। শাঙ্কো মাথা নেড়ে বলল–পারবেনা। খুলে দাও। বিনেলা এগিয়ে গেল। শাঙ্কোর গায়ে চাবুকেরমারেছিড়ে ছিঁড়ে যাওয়া জামাটা কোনরকমে খুলে দিল। তারপর পিঠের ক্ষত ভেন পরীক্ষা করল। বোঝা থেকে দুটো বোয়াম বের করল। হাতের তালুতে ওষুধ নিয়ে ঘষে ঘষে বড়ি বানাল। বিনেলোকে বলল–এখন একটা বড়ি খাইয়ে দাও। পরে দিনে তিনটে করে বড়ি খাওয়াবে। ওষুধগুলো ঠিকমত খাইয়ে দিও। বিনেলোর পা থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত পড়ছে তখনও। ভেন ঝোলা থেকে একটা কাঠের কৌটো বার করল। কৌটার মুখ খুলে সবুজেমত গুঁড়ো ক্ষতস্থানে ঢেলে দিল। বিনেলা আঃ শব্দ করল মুখে। ভেন বলল–রক্ত পড়া বন্ধ হবে। ব্যাথাও কমবে। একটু সহ্য কর। বিনেলো কিছু বলল না।
