ওদিকে সিঁড়িঘরের আড়ালে বিনেলো ঘুমিয়ে ছিল। ওই জায়গাটাই ওর বরাবরের ঘুমের জায়গা। মোটা যোদ্ধাটিই যযাদ্ধাদের সর্দার। ওর কথাবার্তায় বিনেলোর ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। ও আড়াল থেকে উঁকি দিয়ে সব দেখল।
কেউ কিছু বোঝার আগেই বিনেলো ছুটে এসে এক দলপতিকে প্রচন্ড ধাক্কা দিল। দলপতি এই হঠাৎ আক্রমণে টাল সমালাতে পারল না। উবু হয়ে ডেক-এ উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল। হাতের তরোয়াল খাস পড়ল। বিনোলা তরোয়ালটা তুলে নিল। তারপর বিনেলো নিপুণ হাতে ওদের সঙ্গে লড়াই চালাতে লাগল। ফ্রান্সিস বাধা দেবার সময়ই পেল না। চারজন সৈন্যের সঙ্গে বিনেলা একাই লড়াই করছে। একজন যোদ্ধা সুযোগ বুঝে বিনেলোর পায়ে তারোয়ালের ঘা বসাল। রক্ত বেরিয়ে এল। তবু বিনেলে লড়াই চালাতে লাগল। দু’জন যোদ্ধা আহত হয়ে সরে দাঁড়াল। শাঙ্কো আর স্থির করতে পারল না। ও বুকের দিক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে ওর ছোরাটা বের করল। তারপর যে যোদ্ধাটি বিনেলোকে আহত করেছিল ছুটে গিয়ে তার পেটে আমূল ছোরা বসিয়ে দিল। ফ্রান্সিস বুঝল বিপদ। এবার যোদ্ধারা সবাই ওদের দু’জনের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে। বিনোলা আর শাঙ্কোর জীবন বিপন্ন হবে।
ফ্রান্সিস দু’হাত তুলে উঠে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল–বিনোলা–শাঙ্কো– লড়াই নয়। বিনোলা দাঁড়িয়ে পরে হাঁপাতে লাগল। যোদ্ধারাও হাঁপাচ্ছে তখন। লড়াই থেমে গেল। দলপরি চেঁচিয়ে বলল-তোমাদের বিচার হবে। চলো সব।
যোদ্ধারা নিজেরাই কাঠের পাটাতন পেতে দিল। আগে আহত যোদ্ধাদের নিয়ে ওরা কয়েকজন নেমে গেল। দলপতি ফ্রান্সিসদের ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা নেমে গেল। অন্য যোদ্ধারা ওদের পেছনে পেছনে নামল। সবাই বড় রাস্তা ধরে চলল।
তখন ভোর হয়ে গেছে। রাস্তায় লোকজনের চলাচল শুরু হয়েছে। রাস্তার দু’পাশে দোকান টোকান খুলছে। ফ্রান্সিসরা নির্দেশমত চলল। হাঁটতে হাঁটতে ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ওর কাছে এল। ফ্রান্সিস একই স্বরে বলল–ওরকম মাথা গরম করা তোমার উচিত হয়নি। এতে আমাদের বিপদ বাড়ল।
–যোদ্ধাটি অন্যায়ভাবে বিনেলোকে আহত করেছে। শাঙ্কো বলল।
–স-অব মেনে নিতে হবে। পরে অস্ত্রহাতে লড়াইয়ের সুযোগ করে নেবে। এখন এ চুপচাপ সব সহ্য করে যাও। ফ্রান্সিস বিনেলোকে কাছে ডেকে একই কথা বলল।
রাস্তার লোকজন ফ্রান্সিসদের বেশ উৎসুকের সঙ্গে দেখছে। এতজন বিদেশী ক. নিশ্চয়ই সাজা হবে এদের।
ওদিকে বিনেলোর পায়ের ক্ষত থেকে রক্ত পড়ছে। ফ্রান্সিস পিছনে ফিরে ভেনকে দেখল মারিয়ার সঙ্গে দাঁড়িয়ে আছে। ও বলল–ভেন। বিনোর তো চিকিৎসার দরকার।
–উপায় কি বলো। আমার ওষুধ পড়লে এক্ষুণি রক্ত পড়া বন্ধ হয়ে যেত। কিন্তু ওষুধ তো জাহাজে। ভেন বলল।
-দেখ রাজাকে বলে। ভেন বলল। মারিয়া নিজের পোশাকের নিচে থেকে কিছুটা লম্বা কাপড় ছিঁড়ে ভেনকে দিয়ে বলল–তুমি অন্তত পট্টিটা বেঁধে দাও। ভেন কাপড়ের পুটলিটা নিয়ে বিনেলার কাছে যাচ্ছে তখনই একজন যোদ্ধা ছুটে এল বলল–নড়াচড়া চলবে না। সব দাঁড়িয়ে থাক।
–ওর পা থেকে রক্ত পড়া বন্ধ হচ্ছে না। অন্তত পট্টিটা বাঁধতে দাও। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল।
–না। মহামান্য রাজার হুকুম না হলে কিছু হবে না। যোদ্ধাটি বলল।
–তাহলে তোমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা কর। ঠান্ডা মাথার হ্যারি চিৎকার করে বলল।
–না। রাজার হুকুম চাই। যোদ্ধাটি বলল। ফ্রান্সিস আর কোন কথা বলল না।
বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর যযাদ্ধাদের দলপতি এগিয়ে এল। বলল– সবাইকে রাজসভায় নিয়ে যাও।
যোদ্ধারা সামনে এসে দাঁড়াল। ফ্রান্সিসদের রাজসভায় নিয়ে চলল। ..
রাজসভায় ঢুকে ফ্রান্সিসরা দেখল বেশ বড় ঘর। রাজা কার্তিলা একটা কাঠের সিংহাসনে বসে আছে। ফ্রান্সিসরা গিয়ে দাঁড়াতেই দলপতি এগিয়ে গিয়ে সেনাপতিকে কিছু বলল। সেনাপতি ফ্রান্সিসদের রাজার কাছে এগিয়ে যাবার ইঙ্গি ত করল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি এগিয়ে গেল। রাজা কিছু বলার আগেই ফ্রান্সিস বলে উঠল–আমরা বিদেশী ভাইকিং। আপনার রাজত্বে আমরা এই প্রথম এলাম। এখানকার নিয়ম কানুন আমরা কিছুই জানি না। কী অপরাধে আমাদের বন্দী করা হল তাই জানতে চাইছি। রাজা দলপতির দিকে তাকাল। দলপতি মাথা একটু নিচু করে সম্মান জানিয়ে বলল–মহামান্য রাজা এরা আমাদের সঙ্গে লড়াই করেছে। দু’জনকে আহত করেছে। আর একজনকে হত্যা করেছে। ফ্রান্সিস চমকে উঠল। বুঝল–খুবই বিপদ উপস্থিত। হ্যারি বলে উঠল–
–আমাদেরও একজন আহত হয়েছে। তবু মৃত্যুর জন্যে আমরা গভীরভাবে দুঃখিত। আমাদের বন্ধু এক বন্ধুকে আহত হতে দেখে মাথা ঠিক রাখতে পারেনি। আঘাতকারীকে সে আহতই করতে চেয়েছিল। হত্যা করতে চায়নি।
কোন কথা শুনতে চাই না। রাজা প্রায় চিৎকার করে বলল। তারপর e সেনাপতির দিকে তাকিয়ে বলল–কে সেই হত্যাকারী?
দলপতি শাঙ্কোকে অঙ্গুল তুলে দেখাল।
–চাবুক মারো। উপযুক্ত শাস্তি। রাজা বলে উঠল।
দলপতি ছুটে এসে শাঙ্কোকে রাজার সামনে নিয়ে এল। একজন প্রহরী চাবুক হাতে এগিয়ে এল। দলপতি চাবুকটা হাতে নিল। তারপর শাঙ্কোর পিঠে চাবুক মারতে লাগল। চারপাঁচটা চাবুকের ঘা শাঙ্কো মুখ বুঝে সহ্য করল। তারপর আর পারল না। ওর মুখ থেকে গোঙানির আওয়াজ বেরিয়ে এল। শাঙ্কোর কষ্ট বিকৃত মুখের দিকে ফ্রান্সিস তাকিয়ে থাকতে পারল না। মাথা নিচু করল। শাঙ্কোর পিঠের দিকে পোশাক ছিঁড়ে রক্ত বেরিয়ে এল।
