জাহাজের পাটাতন পাতাই ছিল। তখন সূর্য উঠেছে। ভোরের আলোয় পাটাতন দিয়ে দ্রুতপায়ে ওরা জাহাজে উঠে পড়ল। ফ্রান্সিসরা তখন মুখ হাঁ করে হাঁপাচ্ছে। ওরা দু’জনে পটাতন তুলে ফেলল।
জাহাজের ডেক-এ যেসব ভাইকিংরা শুয়ে ছিল তারা ছুটে ফ্রান্সিসদের কাছে এল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপতে বলল–এখন কথা নয়। পাল খুলে দাও। দাঁড় ঘরে যাও। নোঙর তোল। যত তড়াতাড়ি সম্ভব এখান থেকে পালাবো আমরা।
ভাইকিং বন্ধুরা কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ল। যোদ্ধারা তখন হালের কাছাকাছি চলে এসেছে। কিন্তু অসহায় চোখে ফ্রান্সিসদের দেখতে লাগল। কিছুই করার নেই। ওরা লড়াইয়ের ডাক দিল–হি-ই-ই। কিন্তু কাদের সঙ্গে লড়াই করবে? জাহাজ ততক্ষণে চলতে শুরু করেছে। আস্তে আস্তে সমুদ্রতীর থেকে জাহাজের দূরত্ব বাড়তে লাগল। এক সময় ফ্রান্সিসদের জাহাজ মাঝ সমুদ্রে চলে এল। শাঙ্কো তখন হাত পা নেড়ে বন্ধুদের বলছে বৃক্ষবাসী মানুষদের কথা। কী করে পালাল সেইসব কথা।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলছে। সেদিন সকাল থেকে বাতাস পড়ে গেছে। কেমন একটা গুমোট ভাব। অগত্যা জাহাজের গতি বাড়াতে দাঁড় ঘরে যেতে হল কিছু ভাইকিংকে। বিনেলা নামে এক ভাইকিংকে ফ্রান্সিস দায়িত্ব দিল দাঁড় ঘরের কাজ দেখার জন্যে। বিনেলো শাঙ্কোর মতই দুঃসাহসী। ফ্রান্সিস ওকে নানা দায়িত্ব দিয়ে দিয়ে তৈরী করতে লাগল। বিস্কোর অভাব ও পূরণ করবে। ভাইকিংরা বিনেলোর নির্দেশ মানতে লাগল। বিনেলো লক্ষ্য রাখল যাতে দাঁড় টানার ছন্দে কোন ছেদ না পড়ে।
দিন আট দশ কাটল। সমুদ্রে সেদিন উত্তাল হাওয়া। পালগুলো ফুলে উঠছে যেন বেলুনের মত। পূর্ণ গতিতে জাহাজ চলছে। কিন্তু তখন ও পর্যন্ত ডাঙ্গা দেখা গেল না। নজরদার পেড্রো মাস্তুলের উপরে নিজের জায়গায় বসে চারিদিক নজর রাখছে। কিন্তু কোথায় ডাঙ্গা?
দিন পনেরো পরে সেদিন বিকেলে পেড্রো ডাঙ্গা দেখতে পেল। বরাবরের মত চিৎকার করে মাস্তুলের ওপর থেকে বলল–ডাঙা-ভাইসব ডাঙা দেখা যাচ্ছে। ডানদিকে। মারিয়া তখন জাহাজের রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়ে। ও যেমন প্রত্যেকদিন সূর্যাস্ত দেখতে আসে। ডানদিকে তাকিয়ে দেখল–সূর্যাস্তের ঘোর কমলা রঙের আকাশের নিচে কালো মাটি। অস্পষ্ট দেখল জাহাজ ঘাট। দু’একটা জাহাজও রয়েছে।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসও ডেক-এ উঠে এসেছে। সঙ্গে হ্যারি। দু’জনেই জাহাজ ঘাট দেখল। অন্য বন্ধুরাও এসেও রেলিং ধরে দাঁড়াল। হ্যারি বলল–এখন কী করবে ফ্রান্সিস?
একটু পরেই সন্ধ্যে হয়ে যাবে। অন্ধকারে এখানে নামা চলবে না? এখানের কিছুই আমারা জানি না। এটা কোন দ্বীপ না দেশের অংশ তাও জানি না। কাল সকালে নামা যাবে। ফ্লেজারকে গিয়ে বলো তীরের কাছে জল গভীর থাকলে তীরে জাহাজ ভেড়াতে–ফ্রান্সিস বলল। কিছুক্ষণ পরে ফ্লেজার জাহাজ তীরে ভেড়াল। জল ওখানে গভীর। নোঙর ফেলা হল। তখনই ঘাটে নোঙর করা জাহাজ দুটো হ্যারি মনোযোগ দিয়ে দেখল। একটা জাহাজ ছোট। অন্যটা মালবাহী জাহাজ। ছোট জাহাজের মাথায় সাদা পতাকা। তার মানে যে কোন দেশের জাহাজ হতে পারে ওটা। মালবাহী জাহাজের মাথায় স্পেন দেশের পতকা উড়ছে। তার মানে স্পেনীয় মানুষদের জাহাজ।
আশ্চর্য। দুটো জাহাজই জনহীন। কোন মানুষের চিহ্নমাত্র নেই।
ফ্রান্সিস–হ্যারি ডেকে বলল–লক্ষ্য করে দেখ জাহাজে দু’টোয় কোন নাবিক বা ক্যাপ্টেন কেউ নেই।
–কী জানি। শাঙ্কো বলল–তবে হতে পারে কাছেই এখানকার নগর। জাহাজীরা ফুর্তিটুর্তি করতে গেছে। কতদিন পরে মাটির দেখা পেয়েছে। খুশি হওয়ারই কথা। ফ্রান্সিস বলল।
উঁহু। ব্যাপারটা তেমন মনে হচ্ছে না। হ্যারি মাথা নেড়ে বলল।
–দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
গভীর রাত তখন। শাঙ্কোরা কয়েকজন ডেক-এ ঘুমিয়ে আছে। পেড্রোও ওদের সঙ্গে ঘুমিয়ে আছে। নজরদারি করছে না। সমুদ্রের বেগবান বাতাসে অন্যরাও ঘুমোচ্ছে।
হঠাৎ তরোয়ালের খোঁচা খেয়ে পেড্রোর ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম ভেঙে ও ভাঙা চাঁদের আলোয় দেখল খোলা তরোয়াল হাতে কয়েকজন যোদ্ধা দাঁড়িয়ে আছে। ও চিৎকার করে উঠতে গেল। যোদ্ধাটা তরোয়ালের ডগাটা ওর গলায় ঠেকিয়ে মৃদুস্বরে বলল–কোন শব্দ করবে না। উঠে চুপ করে বসে থাকো। পেড্রো আর কী করবে? উঠে বসে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। শাঙ্কোরাও উঠে বসেছে। যোদ্ধাদের সবার হাতেই খোলা তরোয়াল। ওরা সংখ্যায় আট দশজন। মাথায় লম্বা লম্বা চুল। গায়ে নানা রঙের সূতোয় কাজ করা ঢোলা হাতা পোশাক?
শাঙ্কো তখন ভাবছে হাতে তরোয়াল থাকলে একটা লড়াই দেওয়া যেত। শাঙ্কো লক্ষ্য করল যোদ্ধাদের পোশাক ভেজা। তার মানে জলে ডুব সাঁতার দিয়ে এসে ওরা জাহাজে উঠেছে। বোঝাই যাচ্ছে এরা জলদস্যু নয়। কিন্তু এভাবে সহজে এসে ওদের বন্দী করার কারন কী? এরা কারা?
ওদিকে চারপাঁচজন যোদ্ধা সিঁড়ি দিয়ে নিচের কেবিনঘরের দিকে নেমে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে ফ্রান্সিস, মারিয়া, হ্যারি, ভেন আর অন্য বন্ধুরা ডেক-এ উঠে এল। পেছনে খোলা তারোয়াল হাতে যোদ্ধারা। একজন বেশ মোটা যোদ্ধা গলা চড়িয়ে বললে– তোমাদের দল নেতা কে? ফ্রান্সিস এগিয়ে গিয়ে বলল–আমি।
–তোমরা রাজা কার্তিলার আদেশে বন্দী হলে। দলপতি বলল।
–আমাদের অপরাধ? ফ্রান্সিস বলল।
–সেটা মহামান্য রাজা কার্তিলা বুঝবে। দলপতি বলল।
