সেনাপতি কথাটা ভাজি ভাষায় রাজাকে বলল। রাজা দু একবার ন্যাড়া মাথাটা আঁকালেন। তারপর বললেন–আগে হীরের খন্ডটা দেখবো, তারপর কথা হবে।
–বেশ–কখন দেখতে আসবেন বলুন–লা ব্রুশ বললো।
–বিকেলে যাবো–রাজা বললেন। কথাবার্তা এখানেই শেষ হলো। ততক্ষণে দু’জন একজন করে আরো কয়েকজন বিচারপ্রার্থী এসে জড়ো হয়েছে। লা ব্রুশ বড় সর্দারের সঙ্গে ফিরে এলো।
বিকেল নাগাদ লা ব্রুশ ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেক-এ দাঁড়িয়ে রাজার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগল। সঙ্গে বড় সর্দার।
একটু পরেই চাঁদের দ্বীপ থেকে অনেকগুলো নৌকো এই জাহাজের দিকে আসছে দেখা গেল। নৌকাগুলো যখন এগিয়ে এলো, দেখা গেল, মাঝখানের নৌকোটায় রাজা বসে আছেন। অন্য নৌকোগুলোতে সেনাপতি, মন্ত্রী ও নানা অমাত্যরা।
রাজা-মন্ত্রী সেনাপতি আর অন্যান্য ব্যক্তিরা জাহাজটায় উঠে এল। হীরে রাখা গাড়ি দু’টোর কাছে তাদের নিয়ে গেল লা ব্রুশ। রাজা, সেনাপতি, মন্ত্রী আর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা ঘুরে-ঘুরে হীরে দু’টো দেখলো। ওদের চোখে গভীর বিস্ময়। হীরে দু’টোর ওপর অস্তগামী সূর্যের আলো পড়ল। বিচিত্র রঙের খেলা চলল হীরে দু’টোর গায়ে। রাজা খুব খুশী। কয়েকবার নিজের ন্যাড়া মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। রাজা সেনাপতিকে ডেকে বললেন, আমরা দু’টো খন্ডই নেবো। সেনাপতি সে কথা লা ব্রুশকে বললো। লা ব্রুশ মাথা নেড়ে বলল–না–একটা খন্ডই আমরা বিক্রী করব।
কথাটা সেনাপতি রাজাকে বলতেই ক্রোধে রাজার মুখ আরক্ত হলো। রাজা চীৎকার করে বলে উঠলেন–দুটো খন্ডই আমার চাই। রাজা আর দাঁড়ালেন না। জাহাজ থেকে সবাই নৌকোয় নেমে গেল। নৌকোয় চড়ে সবাই ফিরে গেল চাঁদের দ্বীপে।
লা ব্রুশ এবার বুঝল, সাবধান হবার সময় এসেছে। ভাজিম্বারা যে কোন মুহূর্তে আক্রমণ করতে পারে হীরে দু’টোর লোভে। তাইলা ব্রুশ গোলন্দাজ জলদস্যুদের ডাকলো। হুকুম দিল–কামান, গোলা সব তৈরি রাখো। তৈরি হও সব?
জলদস্যুরা অস্ত্রঘর থেকে অস্ত্রশস্ত্র এনে ডেক-এ জড়ো করল। সবাই তৈরি হয়ে। অপেক্ষা করতে লাগল।
রাত হতে লাগল। জলদস্যুরা জাহাজের ডেক-এ সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। লা, ব্রুশ অধীর হয়ে কাঠের পা ঠক ঠক করে ডেক-এ পায়চারি করতে লাগল। সময় বয়ে চললো। রাত গম্ভীর হতে লাগল।
হঠাৎ দেখা গেল সোফালার সমুদ্র তীরে মশাল হাতে ভাজিম্বা যোদ্ধারা জড়ো হতে লাগল। হাজার-হাজার মশালের আলোয় সমুদ্রতীর ভরে গেল। ওরা নৌকায় চড়ে লা ব্রুশের ক্যরাভেল-এর দিকে আসতে লাগল।
লা ব্রুশ একদৃষ্টিতে এতক্ষণ তাকিয়েছিল মশালের আলোয় উজ্জ্বল সমুদ্রতীরের দিকে। এবার লা ব্রুশ কোমার থেকে তরোয়াল বের করল। শূন্যে তরোয়ালের কোপ দেবার মতচালিয়ে চীৎকার করে উঠল গোলা ছোঁড়ো। দু’টো কামান সঙ্গে সঙ্গে গর্জে উঠল। কামানের গোলা দু’টো অন্ধকার দিয়ে জ্বলন্ত উস্কার মতো গিয়ে পড়লো সমুদ্রতীরে। আর্ত চীৎকার উঠল ভাজিম্বা সৈন্যদের মধ্যে। একটুক্ষণ বিরতির পর আবার আগুনের গোলা ছুটল। পড়ল গিয়ে মশাল হাতে ভাজিম্বা সৈন্যদের মধ্যে। আবার আর্ত চীৎকার উঠল। এবার দেখা গেল, মশালগুলো ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ভাজিম্বা সৈন্য নৌকা বেয়ে ক্যরাভেলের গায়ে লাগল। ক্যরাভেল থেকে ঝোলানো দড়ি-দড়া নোঙরের দড়ি এসব বেয়ে ভাজিম্বা সৈন্যরা অদ্ভুত তৎপরতার সঙ্গে ক্যারাভেলের ডেক-এ উঠে আসতে লাগল। শুরু হলো সম্মুখ যুদ্ধ। জলদস্যুদের হাতে তরোয়াল। ভাজি সৈন্যদের হাতে লম্বা বর্শা। ওরা বর্শা ছুঁড়ে দু’জন জলদস্যুকে ঘায়েল করলো। কিন্তু বর্শা হাতছাড়া হওয়াতে নিরস্ত্র অবস্থায় ওদের মৃত্যুবরণ করতে হলো। আস্তে-আস্তে ভাজি সৈন্যদের অনেকেই মারা পড়ল। যে দু’একজন বেঁচে ছিল, তারা বর্শা ফেলে দিয়ে সমুদ্রে লাফিয়ে পড়ল। ওদিকেতখনও কামানের গোলা ছুটছে। সমুদ্রতীরে বহু ভাজিম্বা সৈন্য মারা পড়ল। যারা নৌকায় চড়ে এসেছিল, তাদের অনেকে জলদস্যুদের হাতে মারা পড়ল। ভাজিম্বারা হেরে যেতে জলদস্যুরা চীৎকার করে উঠলো।
কামানের গোলার শব্দ যুদ্ধের হৈ-হুঁল্লা ফ্রান্সিসরা কয়েদঘরে বসে শুনতে পাচ্ছিল। বেশ কিছুক্ষণ যুদ্ধ চলার পর যখন জলদস্যুরা এক সঙ্গে মিলে জয়ধ্বনি দিলো তখন ওরা বুঝল, যুদ্ধ শেষ। ভাজিম্বারা পরাজয় বরণ করেছে। ফ্রান্সিস ডাকল–হ্যারি?
হ্যারি চিন্তিতস্বরে বলল–হুঁ, লা ব্রুশ যুদ্ধে জিতে গেল।
–ভাজিম্বারা জিতলে তবুমুক্তির আশা ছিল কিন্তু এখন। ফ্রান্সিস আর কথাটা শেষ করলো না।
–হাল ছেড়ে দিলে চলবে না। একটা উপায় বার করতেই হবে। ফ্রান্সিস কোন কথা না বলে কাঠে ঠেসান দিয়ে চোখ বুজে আধশোয়া হয়ে রইল।
লা ব্রুশ খুব খুশি। ও এটাই চাইছিল। ওর পরিকল্পনাই ছিল চাঁদের দ্বীপ অধিকার করা। তাহলেই মুক্তোর সমুদ্র হাতের মুঠোয়, যত খুশি মুক্তো তোলা যাবে। মুক্তো বিক্রী করে, হীরে বিক্রী করে ও কোটি-কোটি গিনির মালিক হবে। তখন জলদস্যুদের ছেড়ে নিজের দেশে চলে যাবে। প্রচুর জায়গা জমি কিনে রাজপ্রাসাদের মত বাড়ি করে রাজার হালে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবে।
ভোর হলো। লা ব্রুশের কয়েকজন জলদস্যু জলে নামল। যে সব নৌকাগুলো চড়ে ভাজিম্বারা এসেছিল, সেগুলো সমুদ্রের এখানে-ওখানে ভাসছিল। জলদস্যুরা সেসব নৌকাগুলো ক্যারাভেল-এর কাছে নিয়ে এল। সে সব নৌকাগুলোতে জলদস্যুরা উঠল। ক্যরাভেল-এর সঙ্গে যে নৌকাটা থাকে, সেটাতেই জালে করে লা ব্রুশকে নামিয়ে দেওয়া হলো! লা ব্রুশ আর অন্য জলদস্যুরা নৌকায় চড়ে চললো সোফালা বন্দরের দিকে। আজ কিন্তু লা ব্রুশের গলায় ঝুলছে মুক্তোর লকেট বসানো মালাটা।
