–বলো কি? ফ্রান্সিস বেশ চমকে উঠল।
–সর্বনাশ। ঐ লতার জাল না কাটতে পারলে তো–আবার দেখ। ফ্রান্সিস গলা নামিয়ে বলল।
শাঙ্কো আবার গড়িয়ে জালের কাছে গেল। জোরে ছোরা ঘষতে লাগল জালে। জাল একটু কাটল। কিন্তু সময় লাগল বেশি। যেটুকু কাটল তাতে ফাঁক হল সামান্যই। সেই ফাঁকা দিয়ে গলে যাওয়া অসম্ভব। আবার গড়িয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। ওর অসাফল্যের কথা বলল। ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ল। বোঝাই যাচ্ছে সহজে ঐ লতার বুনট করা কাটা যাবে না। অন্য উপায় ভাবতে হবে। সেক্ষেত্রে প্রহরীকে কবজা করে পালাতে হবে এবং একবারের চেষ্টায় না পারলে প্রহরীর সংখ্যা গোষ্ঠীপতি বাড়িয়ে দেবে। তখন পালানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
ফ্রান্সিস এসব ভাবতে ভাবতে পাশ ফিরল। তখনই দেখল বন্দী তিনজন একেবারে কোনে লতার জালের কাছে শুয়ে পড়ে কী করছে। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো ওর কাছে এল।
–দেখ তো ঐ তিনজন কী করছে? শাঙ্কো একবার প্রহরীর দিকে তাকাল। দেখল প্রহরী ঝিমোচ্ছ। ও গড়িয়ে কোনার দিকে এল। বন্দীদের একজন হাতের চেটো দেখিয়ে শাঙ্কোকে চুপ করে থাকতে বলল। শাঙ্কো দেখল তিনজন লতার দড়ি বুনট নিপুন হাতে খুলছে। শাঙ্কো এবার বুঝল লতা দড়ি কাটা যাবে না। বুনট খুলে লতার দড়ির জাল খুলতে হবে। আর সেটা করতে হবে উল্টে দিকের বুনট খুলে। ও গড়িয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। বন্দীরা কী করছে বলল। ফ্রান্সিস বলল–এটাই পালাবার সহজ পথ। ওরা বুনট খুললেই বেরিয়ে যাওয়া যাবে।
তখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। বন্দীরা চেষ্টা করেও বেশি অংশ খুলতে পারল না।
ভোর হওয়ার আগেই ওরা খোলা লতার দড়ি জালে জড়িয়ে রাখল। তারপর সরে এল। ফ্রান্সিস এবার শাঙ্কোর হাতের কাটা বাঁধনটা নিয়ে শাঙ্কোর হাতে বেঁধে দিল। শাঙ্কোর হাত খোলা দেখলে বিপদে পড়তে হবে। বাঁধা হাত নিয়ে শাঙ্কো শুয়ে পড়ল।
তখনই সিনাত্রার ঘুম ভেঙ্গে গেল। ও এতসব ঘটনা জানতে পারল না। ফ্রান্সিস ওকে কিছু বলল না। ও ফ্রান্সিসকে বলল–তাহলে পালাতে পারবে না?
-হা পারবো। সময় এলেই দেখবে। শাঙ্কো বলল।
–কী ভাবে সেটা বল। সিনাত্রা জানাতে চাইল।
–আজ রাতেই দেখবে। ফ্রান্সিস বলল।
ততক্ষণে বন্দী তিনজন কোনা থেকে সরে এসে মাঝামাঝি জায়গায় শুয়ে পড়েছে। অবশ্যই ঘুমের ভান করে।
সকাল হল। প্রহরীরা সকালের খাবার নিয়ে এল। সবার হাতের বাঁধন খুলে দিল। সবাই খেল। প্রহরীরা জাল ঘরের দরজা বন্ধ করে চলে গেল। একজন প্রহরী বর্শা হাতে পাহারা দিতে লাগল।
এরপরে প্রহরীরা ওদের দুবার খেতে দিল। দুপুরে আর রাতে। রাতের খাওয়া দাওয়ার পর আবার সবার হাত পা বেঁধে দেওয়া হল। দু দুবারেও ভোলা জাল প্রহরীদের নজর পড়ল না। প্রহরীরা একজন প্রহরীকে রেখে চলে গেল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে বলল–যাক–ফাড়া কাটল। আজ রাতেই পালাতে হবে।
সব বন্দীরাই শুয়ে পড়ল।
রাত বাড়তে লাগল। প্রহরীটি কাটাগাছের গোড়ায় বসল। একটু পরেই তন্দ্রায় ঢুলতে লাগল। ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল সেটা। ও গলা চেপে ডাকল–শাঙ্কো। শাঙ্কো উঠে বসল। ফ্রান্সিস ওর জামার মধ্যে হাত চালিয়ে ছোরাটা বার করল। শাঙ্কোর হাতের বাঁধনে ঘষতে ঘষতে কেটে ফেলল। এবার শাঙ্কো ছোরাটা ঘষে ঘষে ওর পায়ের বাঁধন কাটল। ঘুমন্ত সিনাত্রার পিঠে আস্তে ধাক্কা দিয়ে বলল–চুপ করে শুয়ে থাকো। তারপর সিনাত্রার হাত পায়ের বাঁধন কেটে দিল। সিনাত্রা হাঁ করে দেখতে লাগল। এবার শাঙ্কো বন্দী তিনজনের হাতপায়ের বাঁধন কেটে দিল। খোলা হাত পা পেয়ে ওরা খুশি। এবার অনেক দ্রুত হাতে বুনট খুলতে হবে।
শেষ রাত নাগাদ অনেকটা বুনট ওরা খুলে ফেলল। ওরা আর দাঁড়ল না। ফাঁক গলে দ্রুত বনের দিকে ছুটল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–পালাও। তিনজনে ফাঁক গলে তাড়াতাড়ি বাইরে এল।
ফ্রান্সিসের পালাও কথাটা বোধহয় তন্দ্রাচ্ছন্ন প্রহরীর কানে গিয়েছিল। ওর তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। ও অবাক হয়ে দেখল ফ্রান্সিসরা জাল ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসেছে। ও মাটি থেকে বর্শা তুলে ছুটে এল। ওদের কাছাকাছি এসে বর্শা তোলার আগেই শাঙ্কো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ধাক্কা খেয়ে প্রহরীটি মাটিতে চিৎ হয়ে পড়ে গেল। হাত থেকে বর্শাটা ছিটকে পড়ল। শাঙ্কো দ্রুত ফ্রান্সিসের কাছে এল। এবার তিনজনই ছুটল বনের গাছগাছালির দিকে। প্রহরীটা উঠে বসে গলায় শব্দ করল– হি-হি-ই। এটা বোধহয় ওদের লড়াইয়ের ডাক।
তখন ফ্রান্সিসরা বনের মধ্যে ঢুকে পড়েছে। কখনও গাছের গুঁড়িতে পা রেখে কখনও গাছের পাশ দিয়ে ওরা ছুটল সমুদ্রের দিকে। বনতল অন্ধকার। কাজেই খুব জোরে ওরা ছুটতে পারল না। সিনাত্রা দু’একেবার হোঁচট খেল। ওদিকে প্রহরীর চিৎকার বনের মধ্যে শোনা যেতে লাগল। গাছের ঘরে ঘরে লোক জনের কথা। শোনা যেতে লাগল। যোদ্ধারা বর্শা হাতে মই বেয়ে গাছের ওপরের ঘর থেকে নেমে আসতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে ফ্রান্সিসদের দেখতে পেল না। ওরা এদিক ওদিক খুঁজতে লাগল। ততক্ষণে ফ্রান্সিসরা বনের বাইরে চলে এসেছে। ছুটে চলেছে। বালিয়াড়ির দিকে। বালিয়াড়ি পার হচ্ছে তখনই যোদ্ধারা বনভূমি থেকে বেরিয়ে এল। দূর থেকে বর্শা ছুঁড়ল কয়েকজন যোদ্ধা। বর্শাগুলো বালিয়াড়ির বালিতে গেঁথে গেল।
