দুপুরে ফ্রান্সিসদের ভারী শুকনো পাতায় খেতে দেওয়া হল। বুনো গমের রুটি, আনাজের ঝোল আর আধ কাঁচা চিংড়ি মাছ। একটু অন্যরকম খাবার। একনাগারে সামুদ্রিক মাছ আর ভাল লাগছিল না। ওরা চেটে পুরে খেল।
ওদের খাওয়া শেষ হতেই কালো মেঘের আড়ালে সূর্য ঢাকা পড়ল। ফ্রান্সিস বলল–জালঘরের মাথায় কোন ছাউনি নেই। বৃষ্টি হলে ঠায় বসে বসে ভিজতে হবে।
হঠাৎ আকাশে বিদ্যুৎ চমকাতে লাগল।
ঝির ঝির বৃষ্টি শুরু হল। বনের গাছগাছালির পাতার শব্দ হতে লাগল–চট চট। ফ্রান্সিসরা ভিজতে লাগল।
ওদের ভাগ্য ভাল। একটু পরেই বৃষ্টি থেমে গেল। ততক্ষণে মেঘ সরে গিয়ে সূর্য দেখা দিয়েছে। চড়ারোদ উঠল। ওদের ভেজা পোশাক গায়েই শুকোতে লাগল।
শাঙ্কো তখন বন্দী তিনজনের সঙ্গে ভাব জমাতে ওদের কাছে গেল। স্পেনীয় ভাষায় বলল–তোমরা কে?
ওরা কিছুই বুঝল না। বারকয়েকের চেষ্টায় একজন বলল–ইকাবু। শাঙ্কো বুঝল, এরা গোষ্ঠীপতির শত্রু আর এক গোষ্ঠীর মানুষ। শাঙ্কো আকার ইঙ্গিতে কী ধরনের শাস্তি গোষ্ঠীপতি দিতে পারে সেটা জানতে চাইল। বন্দী ইকাবু হাত পা জোড়া করে দেখিয়ে দিতে বোঝাল হাত পা বাঁধা হবে। তারপর সমুদ্রের খাঁড়িতে ছুঁড়ে ফেলা হবে। শাঙ্কো আর কোন কিছু জানতে চাইল না। ফ্রান্সিসের কাছে এসে বন্দীটির কথা জানাল। ফ্রান্সিস মৃদু স্বরে বলল। তাহলে তো পালাতে হয়।
–কিন্তু কী ভাবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
দেখছো তো হাত পা বাঁধে নি। খোলা হাত পা নিয়ে একবার বনের মধ্যে ঢুকতে পারলে সহজেই পালানো যাবে।
–তা ঠিক। শাঙ্কো মাথা ওঠা নামা করল।
–পালাতে পারবে? সিনাত্রা আগ্রহে বলল।
অনায়াসে। এসব শুকনো লতা বুনে বানানো দড়ি। শাঙ্কো সহজেই ছোরা দিয়ে কাটতে পারবে। রক্ষী ও মাত্র একজন। ও বুঝতেই পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
-দেখ চেষ্টা করে। সিনাত্রা বলল।
–সিনাত্রা একটা গান গাও। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমার মাথা খারাপ। ভয়ে আমার গলা দিয়ে কথা সরছে না।
আর গান গাইব? সিনাত্রা বলল।
–ঠিক আছে! শুয়ে বিশ্রাম কর। গায়ের জোর রাখো। এখান থেকে বনের দূরত্ব হাত পঞ্চাশেক। সময় মত এ টুকু ছুটে পার হবার মত মনের জোর রাখো। তাহলেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
-দেখি। সিনাত্রা দু’হাত ছড়িয়ে বলল। তারপর ফ্রান্সিসের কথা মত শুয়ে পড়ল। বৃষ্টির জল বালির মধ্যে তখন অনেকটা শুষে গেছে। ভেজা বালির ওপরই শুয়ে রইল ওরা।
রাতে সেই একই খাবার খেতে দেওয়া হল। দু’জন প্রহরী পাহারায় রইল। দু’জন প্রহরী খাবার দিল। ফ্রান্সিসরা বেশ খুশি মনে খেয়ে নিল। ফ্রান্সিসের ততক্ষণে পালাবার ছক ভাবা হয়ে গেছে।
কিন্তু তারপরই বোঝা গেল গোষ্ঠীপতি ফ্রান্সিসদের মত চালাক না হলেও যথেষ্ঠ বুদ্ধি ধরে। প্রহরীরা প্রত্যেকের হাত আর পা লতা দিয়ে বেঁধে দিল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস গোষ্ঠীপতিকে যতটা বোকা ভেবেছিলাম সে ততটা বোকা নয়। পালাবার রাস্তা বুদ্ধি করে আটকে দিল।
–কিন্তু আমি ভাবছি অন্য কথা। হাত পা বাঁধা হল। তবে কি আজ রাত্রেই আমাদের সমুদ্রের খাঁড়িতে ফেলে দেবে? ফ্রান্সিস বলল।
–চিন্তার কথা। শাঙ্কো মাথা দুপাশে নাড়িয়ে বলল।
–শাঙ্কো একটা কাজ কর। বন্দীদের কাছ থেকে জানো তো হাত পা কেন বাঁধা হল? ফ্রান্সিস বলল।
শাঙ্কো বন্দীদের কাছে গেল। বেশ কয়েকবার আকার ইঙ্গিতে কথাটা জানতে চাইল। একজন বন্দী আকার ইঙ্গিতে সেই মোটা পাতার গাছ দেখাল। ফুল টুল দেখাল। দু’হাত তুলে প্রনাম করার ভঙ্গী দেখাল। শাঙ্কো বুঝল সমুদ্রের খাঁড়িতে ছুঁড়ে ফেলার আগে এরা বৃক্ষপূজা করে। ফ্রান্সিসের কাছে এসে বলল সে কথা। ফ্রান্সিস বলল–এই বড় বড়। মোটা পাতাওয়লা গাছ গুলো এদের কাছে খুব পবিত্র গাছ। দেখছো না গাছের ডালে ঘর তৈরী করে। এই গাছের শুকনো পাতা আর ঘাস দিয়ে ঘরের ছাউনি তৈরী করে। এই গাছের পাতা পেতে খাবার খায়। বোধহয় কাছেই কোথাও কোন গাছ ওরা কোন কাজের আগে মানে বিয়েটিয়ে বন্দীকে শাস্তি দেওয়ার আগে পূজো করে ফুল পাতা দিয়ে। ঐপূজো সেরেই আমাদের শাস্তি দেওয়া হবে। আজ রাতে সেই পূজো হচ্ছে না। হলে হৈ চৈ শুনতাম। কাজেই আজ রাতের মত আমরা নিশ্চিন্ত। তবে সময় নষ্ট করা চলবে না। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কাজ সারতে হবে।
ফ্রান্সিসরা শুয়ে পড়ল। আকাশে চাঁদ উজ্জ্বল। চারিদিক মোটামুটি দেখা যাচ্ছে। ফ্রান্সিস আড়চোখে প্রহরীর ওপর নজর রাখল। প্রহরী বর্শা হাতে ঘুরাঘুরি করছিল। একটু রাত হতেই প্রহরী আবার কাটাগাছের গুঁড়িতে বসল। হাতের বর্শাটা মাটিতে রাখল। বোধহয় একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা।
ফ্রান্সিস একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পরে ফ্রান্সিস বুঝল প্রহরটি অনড় বসে। তাহলে একটু ঘুম মত এসেছে। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে ডাক–শাঙ্কো। শাঙ্কো ঘুমোয় নি। শুয়ে শুয়েই গড়িয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস বাঁধা দু’হাত শাঙ্কোর বুকের কাছ দিয়ে ঢুকিয়ে দিল। তারপর শাঙ্কোর জামার তলা থেকে ছোরাটা বের করল। শাঙ্কোর হাত বাধা লতাটায় ছোরাটা ঘষতে লাগল। লতা কেটে গেল। শাঙ্কো ছোরাটা নিয়ে গড়িয়ে পেছনে জালের কাছে গেল। তারপর জাল কাটতে লাগল। বেশ কিছুক্ষণ ছোরা ঘষেও লতার জাল কাটতে পারল না। ঘন বুনটের জাল কাটা প্রায় অসম্ভব মনে হল। শাঙ্কো গড়িয়ে ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফিস ফিস করে বলল–লতা কাটা যাচ্ছে না।
