জাহাজ ততক্ষণে তীরের কাছে চলে এসেছে। ফ্লেজার বলল-তীরের কাছে জল গভীর। জাহাজ তীরে ভেড়ানো যাবে। ফ্লেজার আস্তে আস্তে জাহাজটা তীরে ভেড়াল।
দেখা গেল বালিয়াড়ির পরেই বনভূমি। টানা বনভূমি চলে গেছে। বসতির চিহ্নমাত্র নেই।
হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–কী করবে?
–এখনই এখানে নামবো। দেখি মানুষজনের দেখা পাই কিনা। ফ্রান্সিস বলল,
–কিন্তু এ তো গভীর বন। এখানে মানুষজন কোথায় পাবে? হ্যারি বলল।
মনে হচ্ছে বনের ওপাশে বসতি আছে। এখন নেমে গিয়ে সেটা দেখাত হবে। ফ্রান্সিস বলল।
একটু পরেই ফ্রান্সিসরা সকালের খাবার খেয়ে নিল। এবার ফ্রান্সিস শাঙ্কোকে ডেকে পাঠাল। শাঙ্কো আসতে বলল–শাঙ্কো–সিনাত্রা আর তুমি তৈরী হয়ে নাও। আমরা নামব।
-এখনই? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–হ্যাঁ দিনে দিনেই দেখব সব। মনে হচ্ছে এই বনভূমির ওপারে লোকজনের বসতি এলাকা পাব। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। চলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই ফ্রান্সিস শাঙ্কো আর সিনাত্রা তৈরী হল। শাঙ্কো আর সিনাত্রা কাঠের পাটাতন পাতল তীরভূমি পর্যন্ত। পাটাতন দিয়ে তিনজন নেমে এল। বেলাভূমি পার হয়ে বনের মধ্যে ঢু। সেই অদ্ভুত গাছের জঙ্গল। গাছের পাতা প্রায় গোল। মোটা ভারী পাতা। শক্ত ডাল। অন্য গাছও রয়েছে। কিন্তু এরকম গাছের সংখ্যাই বেশি। এই গাছগুলো বেশ উঁচু। ডালগুলো দেখে মনে হল বেশ শক্ত।
হঠাৎই ওরা দেখল গাছের মধ্যে ঘর। গাছের চারটে ডালের মধ্যে ডাল কেটে বেড়ামত। তাতে দরজা। ঘরের মাথায় শুকনো লম্বাটে ঘাসের ছাউনি। এরকম তিন চারটে ঘর দেখল ওরা। তাহলে এখানকার বাসিন্দারা একরম ঘরেই থাকে। অবাক কান্ড! ঘরগুলো থেকে গাছের ডাল থেকে তৈরি মই লাগানো। ঐ মই বেঁধেই ওঠানামা।
ফ্রান্সিসরা ততক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়েছে। একটা ঘর থেকে একজন বাদামি রঙের পুরুষ মুখ বাড়িয়ে ফ্রান্সিসদের দেখেই ই ই করে মুখে জোরে শব্দ করল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য ঘরগুলো থেকে পুরুষরা হাতে গাছের ডাল কেটে তৈরী বর্শা নিয়ে মই বেয়ে দ্রুত নেমে আসতে লাগল। মই বেয়ে ওঠা নামায় ওরা অভ্যস্থ। কাজেই ফ্রান্সিসরা পালিয়ে আসার সুযোগ পেল না। ততক্ষণে বর্শা হাতে যোদ্ধারা ঘিরে ধরেছে। ফ্রান্সিস দু’হাতে ওপরে তুলে চীৎকার স্পেনীয় ভাষায় বলে উঠল–আমরা বন্ধু। তোমাদের শত্রু নই। যোদ্ধারা আর বর্শা ছুঁড়ে মারল না।
–পালিয়ে গেলে হত। শাঙ্কো মৃদুস্বরে বলল।
–এখন আর সম্ভব নয়। পালাতে গেলে আহত হব। বর্শা বুকে ঢুকে গেলে মরেও যেতে পারি। তার চেয়ে দেখা যাক এরা আমাদের নিয়ে কি করে। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
একজন যোদ্ধা এগিয়ে এসে ফ্রান্সিসের গায়ে বর্শা খোঁচা দিল। ফ্রান্সিস ফিরে তাকাল। যোদ্ধা ওকে সামনের জঙ্গলের দিকে হাঁটতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস রেগে গেল। কিন্তু কিছু বলল না। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে লাগল। শাঙ্কো আর সিনাত্রাও চলল।
কিছুদূর যেতে দেখা গেল চারপাঁচটা গাছের গায়ে শুকনো লতার ডালমত। সমস্ত জায়গাটতেই লতার জাল। ফুট পাঁচেক উঁচু। সেই যোদ্ধাটি এগিয়ে গেল। জালির গায়ে গাছের ডাল কেটে দরজামত বানানো। যোদ্ধাটি দরজা দিয়ে ফ্রান্সিসদের ভেতরে ঢুকতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা একে একে ঢুকলো। ওপরের ডাল মাথায় লেগে যাচ্ছে। তিনজনে বসে পড়ল। ফ্রান্সিস দেখল আরোও তিনজন বন্দী ঐ জালঘরে আগে থেকেই রয়েছে। জালঘরের মেঝে বালিভরা। তার ওপর শুকনো ঘাস বিছানো। ফ্রান্সিস শুয়ে পড়তে পড়তে বলল–শাঙ্কো এরকম বিচিত্র কয়েদঘর আর কোনদিন হয়ত দেখবো না।
-হ্যাঁ। মনে হচ্ছে আমরা যেন জীবজন্তু। ফাঁদে ধরা পড়েছি।
–আমাদের মেরে ফেলবে না তো? সিনাত্রা ভয়ার্তস্বরে বলল।
সময় সুযোগ মত পালাবো। কিচ্ছু ভেবো না। শাঙ্কো বলল। যোদ্ধাটি দরজাটা শুকনো লতা দিয়ে বাঁধল। শাঙ্কো যোদ্ধাটিকে ইঙ্গিত ওদের সর্দার আছে কিনা জানতে চাইল। যোদ্ধাটি মাথা দোলাল। একজন যোদ্ধাকে পাহারাদার রেখে অন্য যোদ্ধারা চলে গেল।
ফ্রান্সিস মাথা তুলে চারিদিক এবার দেখে নিল। দেখল চারদিকেই গভীর জঙ্গ ল। সেই মোটা ভারিপাতার গাছের সংখ্যাই বেশি।
ফ্রান্সিস শুয়ে বসে সময় কাটাতে লাগল। দুপুর নাগাদ কয়েকজন যোদ্ধাকে নিয়ে একজন লম্বামত লোক জালঘরের দরজার সামনে এল। পাহারাদার তাকে দেখে ডান হাত তুলে নামল। ফ্রান্সিস বুঝল এই লোকটাই গোষ্ঠীপতি। ফ্রান্সিস এই। গোষ্ঠিপতির জন্যেই সাগ্রহে অপেক্ষা করছিল। গোষ্ঠীপতি ভাঙা ভাঙা স্পেনীয় শব্দে বলল–পরিচয়?
–আমরা বিদেশী ভাইকিং। জাহাজে চড়ে জাহাজ ঘাটায় এসেছি। ফ্রান্সিস বলল। গোষ্ঠীপতি মোটামুটি বুঝল। কিন্তু সত্যি বলে মেনে নিল না। দুপাশে মাথা নেড়ে বলল–ওরাইকাবু–একসঙ্গে শাস্তি।
–কী শাস্তি? শাঙ্কো বলে উঠল। গোষ্ঠীপতি এতক্ষণে একটু হাসল। বলল– দেখবে।
–কিন্তু আমাদের শাস্তি দেবেন কেন? আমারা কী অন্যায় করেছি? ফ্রান্সিস বলল।
–ইকাবু–গুপ্তচর। গোষ্ঠীপতি বলল। ফ্রান্সিস বুঝল ইকাবুরা এদের শত্রু। ফ্রান্সিসদের ইকাবুদের গুপ্তচর ধরে নিয়েছে। ফ্রান্সিস বুঝল গোষ্ঠীপতিকে বোঝানো হয়। যাবে না। তবু ও হাল ছাড়ল না। বলল–ইকাবু কারা কী ব্যাপার আমরা কিছুই জানি না। আমরা এখানে এই প্রথম এসেছি। ইকাবু তো দূরের কথা এই জায়গাই আমরা চিনতাম না। গোষ্ঠীপতি আবার মাথা দোলাল। বলল–বন্দী–শাস্তি। কথাটা বলেই গোষ্ঠীপতি ফিরে দাঁড়াল। তারপর বনের দিকে চলে গেল। একজন পাহারাদার রইল। বাকিরা গোষ্ঠীপতির পিছনে পিছনে চলে গেল।
