–ঠিক ডাঙ্গার দেখা পাওয়া যাবে। আট দশদিন কেটেছে মাত্র। কয়েকদিনের মধ্যেই ডাঙ্গার দেখা পাওয়া যাবে। তাছাড়া খাদ্য জল সব মজুত আছে। আরোও কিছুদিনের জন্যে নিশ্চিন্ত। জাহাজ চলুক। হ্যারির কথা শুনে ফ্রান্সিসের উদ্বিগ্ন মন শান্ত হয়। ও কিন্তু শুধুমাত্র হ্যারির সঙ্গেই এসব কথা বলে। অন্য বন্ধুদের সঙ্গে। এসব কথা বলে না। তাহলে মারিয়াও উদ্বিগ্ন হবে। সেটা মারিয়ার শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক হবে।
দিন কয়েক পরের কথা। সেদিন শেষরাতে মাস্তুলের ওপর থেকে পেড্রো চেঁচিয়ে বলল–ভাইসব সাবধান জলদস্যুদের জাহাজ। এদিকেই আসছে। ফ্রান্সিসকে খবর দাও। সবাই তৈরী হও। সামনে লড়াই।
ডেকের ওপর কয়েকজন বন্ধুদের সঙ্গে শাঙ্কোও ঘুমিয়ে ছিল। পেড্রোর উঁচু গলায় কথায় ওর ঘুম ভেঙে গেল। ছুটে জাহাজের রেলিংয়ের ধারে গেল। কিছুটা উজ্জ্বল চাঁদের তালোয় দেখল একটা জাহাজ দ্রুত গতিতে ওদের জাহাজের দিকে আসছে। জলদস্যুদের ক্যারাভেল জাহাজ।
শাঙ্কো আর একমূহুর্তে দেরি করল না। সিঁড়ির দিকে ছুটল। নিচে নামতে নামতে গলা চড়িয়ে বলতে লাগল–ভাইসব–তৈরী হও–তৈরী হও। একটা জলদসুদের জাহাজ আসছে। লড়াই। অস্ত্র নাও।
ফ্রান্সিসের কেবিনঘরের দরজায় ধাক্কা দিয়ে শাঙ্কো চেঁচিয়ে বলল-ফ্রান্সিস জলদস্যুদের জাহাজ আসছে শিগগির এসো।
ফ্রান্সিসসের ঘুম ভেঙে গেল। এক লাফে বিছানা থেকে নামল। বিছানার তলা থেকে তরোয়াল বের করল। ছুটে গিয়ে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
ততক্ষনে জাহাজে সাজো সাজো রব পড়ে গেছে। ভাইকিংরা অস্ত্রঘর থেকে তরোয়াল বের করে ডেক উঠে আসতে লাগল।
অল্পক্ষনের মধ্যেই খোলা তরোয়াল হাতে ডেকএ এসে জড়ো হল সবাই। সবাই দেখল জলদস্যুদের জাহাজের ডেক-এ খোলা তরোয়াল হাতে জলদুস্যরা দাঁড়িয়ে। মাথায় কালো কাপড়ের ফট্টি। গাল অব্দি জুলপি মোটা গোঁফ। জলদস্যুর দল ভেবেছিল নিঃশব্দে জাহাজ দখল করবে। কিন্তু যখন দেখল ফ্রান্সিসরা ওদের দেখে ফেলেছে তখন ওরা : লড়াইয়ের জন্য তৈরী হল।
জলদস্যুদের জাহাজটা ফ্রান্সিসদের জাহাজের গায়ে এসে লাগল। জলদস্যুরা তরোয়াল উঁচিয়ে লাফ দিয়ে ফ্রান্সিসদের জাহাজে উঠতে লাগল। ফ্রান্সিসরা ওদের প্রথম আক্রমণ করল। শুরু হল লড়াই। জলদস্যুরা ফ্রান্সিসদের চেয়ে সংখ্যায় কম। তবে ওরা তো নৃশংস আর নিভীক। ওদের প্রাণেরও মায়া নেই। ওরা জানে মানুষ মেরে ফেলতে। কাজেই ওরা প্রথম উন্মাদের মত তরোয়াল চালাতে লাগল। দুজন ভাইকিং আহত হয়ে ডেক-এ পড়ে গেল। কয়েকজন ভাইকিং থমকে গেল। ফ্রান্সিস উচ্চকণ্ঠে ধ্বনি তুলল–ও–হো–হো। এই ধ্বনি লড়াইয়ের ধ্বনি। মন্ত্রের মত কাজ হল। ভাইকিংরা নতুন উদ্যমে লড়াই চালাতে লাগল। কয়েকজন জলদস্যুকে আহত করল ওরা। ফ্রান্সিস নিপুনহাতে তরোয়াল চালিয়ে ঘুরে ঘুরে লড়াই করতে লাগল।
একজন জলদস্যু মারা গেল। দু’তিনজন আহত হল।
এমন সময় জলদস্যুদের ক্যাপ্টেন তাদের জাহাজের ডেক-এ এসে দাঁড়াল। সে গভীর মনোযোগ দিয়ে লড়ই দেখতে লাগল। অল্পক্ষণের মধ্যেই বুঝল–ভাইকিংরা তরোয়াল চালনায় যথেষ্ট দক্ষ। জলদস্যুরা হেরে যেতে লাগল। ক্যাপ্টেন গলা। চড়িয়ে বলে উঠল-লড়াই থামাও। সবাই চলে এসো। জলদস্যুরা লড়াই করতে করতে নিজেদের জাহাজে পালাতে লাগল।
ফ্রান্সিসও গলা চড়িয়ে বলল–যে কটাকে পারো আহত করো। জাহান্নামে যাক সব। ভাইকিংরা নতুন উদ্যমে জলদস্যুদের আক্রমন করল। এবার জলদস্যুরা বুঝল লড়াই করতে গেলে বাঁচার আশা নেই। ওরা দ্রুত লড়াই থামিয়ে নিজেদের জাহাজের ডেক লাফিয়ে লাফিয়ে উঠে পড়তে লাগল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই লড়াই শেষ। নিহত আহত জলদস্যুরা ফ্রান্সিসদের জাহাজের ডেকএ পড়ে রইল। ফ্রান্সিস বলে উঠল–এগুলোকে জলে ফেলে দাও। ভাইকিংরা সব কটা জলদস্যুকে সমুদ্রের জলে ছুঁড়ে ফেলল।
জলদস্যুদের জাহাজের মুখ ঘুরল। আস্তে আস্তে জলদস্যুদের ক্যারাভেল জাহাজটা মাঝ সমুদ্রের দিকে চলে যেতে লাগল। লড়াইয়ে বিজয়ী ভাইকিংরা ধ্বনি তুলল ও–হো–হো।
জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচা গেছে এই ভেবে ফ্রান্সিস স্বস্তির শ্বাস ফেলল। গলা চড়িয়ে ডাকল–পেড্রো? পেড্রো নিজের জায়গা থেকে মুখ বাড়িয়ে বলল কী বলছো? অনেক ধন্যবাদ, তোমাকে। সময়মত জানানি দিয়েছে। ফ্রান্সিস বলল।
তখন ভোর হয়েছে। ভোরের নিস্তেজ আলো পড়েছে সমুদ্রে জাহাজে নির্মেঘ আকাশে।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলল।
দিন কয়েকের মধ্যেই ডাঙা দেখা গেল। সেদিন ভোরে মাস্তুলের ওপর থেকে নজরদার পেড্রো গলা চড়িয়ে বলে উঠল–ভাইসব বাঁদিকে ডাঙ্গা দেখা যাচ্ছে– ডাঙ্গা। ডেক-এ ঘুম ভেঙে শাঙ্কো বসেছিল। ছুটল ফান্সিসকে খবর দিতে। একটু পরেই ফ্রান্সিস ডেক-এ উঠে এল। ডানদিকে তাকিয়ে দেখল একটা খাঁড়িরমত। তার এ পাশে গভীর বন। ওপাশে পাহাড়। বুঝতে পারল না-এটা কোন দ্বীপ না দেশের অংশ। এপাশে একটা ঘাটমত দেখা গেল। এদিকে সমুদ্র গভীর। বড় বন্দর নয়। তবে জাহাজ ভেড়ানো থাকে।
হ্যারি এসে ওর পাশে দাঁড়াল। ওকে ফ্রান্সিস এসব কথা বলল। হ্যারি বলল দেখা যাক জাহাজ ভেড়ানো যায় কিনা। ফ্লেজারের কাছে চলো। দু’জনে জাহাজ চালক ফ্লেজারের কাছে এল।
–ফ্লেজার –ফ্রান্সিস বলল–বুঝতে পারছি না এটা কোন দ্বীপ না দেশের অংশ। যাহোক তুমি দেখো জাহাজ তীরে ভেড়ানো যায় কিনা।
