–পাতালঘর বোধহয় খুঁজে বের করতে পারো নি। রাজা বললেন।
না। খুঁজে পেয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
–বলো কি। রাজা অবাক।
এবার ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে সমস্ত ঘটনা বলল। রাজা আসিরিয়া সব শুনে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। পরে বললেন,
-তোমরা বেশ চিন্তা করে কষ্ট করে আমাদের পূর্বপুরুষ রাজা সার্মেনোর সম্পদ উদ্ধার করেছে। শত্রুর হাত থেকে আমার রাজ্য উদ্ধার করে দিয়েছে। কী বলে যে আমি কৃতজ্ঞতা জানাবো।
-না মান্যবর রাজা। গুপ্ত ধনসম্পদ উদ্ধার করতে আমরা ভালোবাসি। তাই বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্ধার করেছি। সবুজ রাজার সঙ্গে লড়াইয়ে আপনাকে সাহায্য করেছি, আপনি একজন মহানুভব রাজা বলে। কিন্তু দুঃখ এই যে আপনার সব প্রজাদের রক্ষা করতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
-চেষ্টা তো করেছে। সেটাই বা কম কী। রাজা বললেন।
এবার তাহলে সমুদ্রতীরে ফিরে যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল।
-কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষ রাজা সার্মেনো জলদস্যুতা করে সম্পদ সঞ্চয় করেছিলেন। আগেই বলেছি সেই ধনসম্পদের প্রতি আমার কোন লোভ নেই। চাইলে তোমাদের সব দিয়ে দিতে পারি। রাজা বললেন।
আমরা তো কিছুই নেবো না। তাই বলি ঐ সোনার সিংহাসন, মণিরত্ন বিক্রি করে যে অর্থ পাবেন তাই দিয়ে আপনার প্রজাদের মঙ্গল করুন। প্রজাদের জন্যে অনেক কিছুই করতে পারেন আপনি। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ ভাবলেন। তারপর মাথা তুলে বললেন–ঠিক আছে। তোমার কথাই আমি মেনে নিলাম। প্রজাদের দুঃখদৈন্য দূর করতে এই মূল্যবান সম্পদ কাজে লাগাবো। তোমাদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি অতিথিশালায় ফিরে এল। ফ্রান্সিস বন্ধুদের সব বলল। তারপর বলল-দুপুরে খাওয়াদাওয়া সেরে আমরা সমুদ্রতীরের দিকে যাত্রা করবো। সবাই তৈরী হয়ে নাও।
দুপুরে খাওয়াদাওয়া সারল ওরা। তারপর রাস্তায় নেমে এল। বালিভরা রাস্তা দিয়ে চলল সমুদ্রতীরের দিকে। যেতে যেতে দেখল তিয়েরাবাসীরা দলে দলে ছুটেছে সমুদ্রের ধারের পাহাড়ী এলাকার দিকে। পাতালঘর আবিষ্কারের কথা এখন বোধহয় তারা জেনে গেছে।
–এত লোক যাচ্ছে রাজা নিশ্চয়ই গুহাটা পাহারার ব্যবস্থা করেছেন। হরি বলল।
নিশ্চয়ই। সিংহাসনে বসা নরকঙ্কাল–এটা কিন্তু একটা অদ্ভুত ব্যাপার। ফ্রান্সিস বলল।
–অদ্ভুত বলে অদ্ভুত। আমি তো ভীষণ চমকে উঠেছিলাম। হ্যারি বলল।
বন্ধুদের নিয়ে ফ্রান্সিস যখন সমুদ্রতীরে পৌঁছল তখন সন্ধ্যে হয়ে গেছে। বালিয়াড়িতে দুটো নৌকোই তোলা ছিল। নৌকোয় চড়ে দফায় দফায় ফ্রান্সিসরা জাহাজে উঠতে লাগল।
জাহাজে ছিল মারিয়া, ভেন আর এক অসুস্থ বন্ধু। তিনজনেই রেলিঙ ধরে দাঁড়িয়েছিল। ফ্রান্সিস হেসে বলল–মারিয়া এবারও আমার হাত খালি। মারিয়া হেসে বলল–তোমরা অক্ষত শরীরে ফিরে এসেছো এটাই আমার কাছে অনেক। ফ্রান্সিস অসুস্থ বন্ধুটিকে জিজ্ঞেস করল-কেমন আছো?
ওদের বদ্যি ভেন বলল–ও এখন সুস্থ। তোমাদের সঙ্গে যেতে পারল না। খুবই দুঃখ ওর।
–পরের বার নিয়ে যাবো। আমরাও দুঃখ পেয়েছি। এক বন্ধুকে হারিয়েছি। ফ্রান্সিস বলল।
ওদিকে শাঙ্কো তখন হাত পা নেড়ে মারিয়াকে পাতালঘর আবিষ্কারের কথা বলছে।
সিয়োভোর রত্নভান্ডার
ফ্রান্সিসদের জাহাজ পূর্ণগতিতে চলেছে। জাহাজের পালগুলো বেগবান হাওয়ায় ফুলে উঠেছে। মোটামুটি উত্তর দিক ধরে জাহাজ চলছে। জাহাজচালক ফ্লেজারের লক্ষ্য স্বদেশে ফেরার। ডেক ধোওয়া মোছা সেরে ভাইকিংদের হাতে যথেষ্ট সময়। কারন দাঁড়ও বইতে হচ্ছে না বেশ খুশির মেজাজে ভাইকিংরা।
রাতের খাওয়া সেরে ডেক-এ নাচগানের আসর বসায়। ফ্রান্সিস ওদের উৎসাইই দেয়। আসরে মারিয়াকে নিয়ে আসে। নাচের আসরে দুজনে নাচেও। মারিয়া খুশি মনে এসব দেখে। হাসে। যা মারিয়া খুশি। ফ্রান্সিস নিশ্চিন্ত হয়।
সিনাত্রা সুরেলা কন্ঠে দেশের চাষীদের ভেড়াপালকদের গান গায়। দ্রুত লয়ের বিয়ের বাসরের গানও গায়। আসর জমে ওঠে। কাঠের ডেকে থপ থপথপ্ পা ঠুকে ভাইকিংরা নাচে। শাঙ্কো খালি জীপে বাজায়। এভাবেই রাতের আসর জমে ওঠে।
মাঝে কয়েকদিন বাতাস পড়ে গিয়েছিল। তখন ভাইকিংদের ব্যস্ততা। পাল খাটাবার কাঠের কাঠোমোয় উঠে পাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে যথাসাধ্য হাওয়া লাগাতে চেষ্টা করে। অনেকে দাঁড় ধরে গিয়ে দাঁড় টানে। তখন আর নাচের আসর বসে না। তখন শুধু কাজ। ছক্কাপাঞ্জা খেলা বন্ধ। সবাই ব্যস্ত। নাচগানের আসর আর বসে না। জাহাজের চলার বেগ বাড়াবার জন্যে চেষ্টা চলে। দেশে ফিরে যাচ্ছে এই চিন্তা উৎসাহ জোগায়।
দিনকয়েক পরে বাতাসের বেগ বাড়ে। জাহাজ চলে দ্রুত গতিতে। আবার আনন্দ ভাইকিংদের মনে। জাহাজের কাজ কমে যায়। অবসর। আবার নাচ গানের আসর বসে। নেচে গেয়ে খুশির সময় কাটায় ওরা।
জাহাজ পুণগতিতে চলছে। কিন্তু ডাঙার দেখা নেই। এভাবেই দিন দশেক কাটল। ভাইকিংরা চিন্তায় পড়ে–পথ হারালাম না তো?
রাতে ফ্রান্সিসরা ডেকে উঠে আসে। অনুজ্জ্বল চাঁদের আলোয় চারিদিকে তাকায় যদি ডাঙ্গার দেখা পাওয়া যায়। ওপরের দিকে তাকিয়ে নজরদার পেড্রোকে বলে ঘুমিয়ে পড়ো না। নজর রাখো। পেড্রো মাস্তুলের ওপরে নিজের গলা চড়িয়ে বলে– কিচ্ছু ভেবো না। ঠিক নজর রাখছি। হ্যারিও ডেকে উঠে আসে। ফ্রান্সিস বলে হারি– চিন্তার কথা। এখনও ডাঙ্গার দেখা পাচ্ছি না।
