ফ্রান্সিস পারে উঠে এল। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–এখনও বেলা আছে। আর দেরি করবো না। এই জলাটা পার হয়ে ওপারে যাবো। তার আগে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করে নাও।
হাত পা ছড়িয়ে বসল সবাই। বিশ্রাম করতে লাগল। ফ্রান্সিস হ্যারিকে বলল রাজা আসিরিয়া বলেছিলেন না তিনজন পাতালঘরের খোঁজে বেরিয়ে জীবিত ফেরেনি। ওরা এই পুকুরের জল পর্যন্ত এসেছিল। হয়তো এটা পার হতে গিয়েছিল। হাঙরটা ওদের মেরে ফেলেছে।
— কিছুক্ষণ পর ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। একটু গলা চড়িয়ে বলল–সবার যাবার– দরকার নেই। আমি শাঙ্কো আর সিনাত্ৰা যাব।
–না ফ্রান্সিস হ্যারি বলল–আবার ওখানে যদি কোন বিপদে পড়। আমরা সবাই একসঙ্গে যাব। বন্ধুরাও অনেকে বলে উঠল–ফ্রান্সিস আমরাও যাব।
বেশ চলো। ফ্রান্সিস বলল। তারপর সিনাত্রাকে বলল–তিনটে মশাল জ্বালো। আমরা তিনজন জ্বলন্ত মশাল নিয়ে যাবো।
সিনাত্রা তিনটে মশাল জ্বালল। তিনটে মশাল হাতে নিয়ে তিনজনে জলে নামল। বাকি বন্ধুরাও জলে নামল। তিনজনে বাঁহাতে মশাল জলের ওপর তুলে ডান হাতে সাঁতরে চলল ওপারের দিকে। বন্ধুরাও সাঁতরে চলল। বন্ধ গুহার শেষ প্রান্ত এসে দেখা গেল একটা পাথরের চাঁই। — ফ্রান্সিস মশালের আলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখল পাথরের চাঁইটার ডানপাশে হাতখানেক ফাঁকা। পিছু ফিরে ফ্রান্সিস বন্ধুদের দিকে তাকাল। বলল–এই পাথরের চাইটা সরাতে হবে। সবাই হাত লাগাও। ফ্রান্সিস মশাল ধরে রইল। শাঙ্কো আর সিনাত্রা সেই ফাঁকটায় হাত গলিয়ে টানল। বেশ ভারি পাথরের চাই। ওরা দুজনে কিছুক্ষণ টানল। ছেড়ে হাঁপাতে লাগল। আরো দু’জন বন্ধু এগিয়ে এল। চলল পাথরের চাঁইটা ধরে টানা।
একসময় পাথরের চাইটা আস্তে আস্তে সরে এল। এবার কয়েকজন মিলে পাথরের চাই অনেকটা সরিয়ে আনল। ফ্রান্সিস মশালের আলো ফেলে দেখল একটা মসৃণ কালো পাথরের দরজা। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–পাথরের চাইটা আরো সরাও। চাইটা সবটা সরানো হতেই মশালের আলোয় ফ্রান্সিস দেখল-দরজাটায় একটা মস্তবড় লোহার কড়া ঝুলছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–বাকি দুটো মশাল নিয়ে এসো। শাঙ্কো আর সিনাত্রা মশাল নিয়ে এগিয়ে এল। তখনই দেখা গেল গোল কড়াটার মাঝখানে কীসের চিহ্ন। একনজর দেখেই ফ্রান্সিস চেঁচিয়ে উঠল–হ্যারি এটাই পাতালঘর। ফ্রান্সিসের কথা গুহায় প্রতিধ্বনিত হল। হ্যারি এগিয়ে এসে পাথরের দরজার গায়ে কুঁদে-তোলা শীলমোহর দেখে বলে উঠল–এটাই তো রাজা আসিরিয়ার শীলমোহর।
-হ্যাঁ। রাজা আসিরিয়ার পূর্বপুরুষ রাজা সার্মেননা প্রচলিত শীলমোহর। এবার এই দরজা খুলতে হবে। সবাই হাত লাগাও।
চার-পাঁচজন বন্ধু এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস মশাল ধরে রইল। কিছুক্ষণ কড়া ধরে টানলে ওরা। ছেড়ে দিয়ে হাঁপাতে লাগল। এবার আরো চার-পাঁচজন মিলে টানল। দরজার ডানদিকে সঁক দেখা গেল। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলে উঠল–সবাই তাড়াতাড়ি সরে এসো। বিষাক্ত বাতাস বেরোতে পারে।
সবাই দ্রুত সরে এল। দরজার সেই ফাঁক লক্ষ্য করে ফ্রান্সিস মশালটা ছুঁড়ে দিল। দপ্ করে আগুন জ্বলে উঠে ভেতরেও আগুন ছড়িয়ে গেল। দরজার ফাঁক দিয়ে আগুন ধোঁয়া বেরিয়ে আসতে লাগল। সবাই দূরে সরে গিয়েছিল। কাজেই আগুন ওদের, কোন ক্ষতি করতে পারল না।
ভেতরে আগুন নিভল। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে দরজার ফাঁকের কাছে গেল। চোখ কুঁচকে ভেতরে তাকাল। একটা ঘরমত দেখা যাচ্ছে। অস্পষ্ট দেখা গেল ঘরের মাঝখানে একটা সিংহাসন। সিংহাসনের ওপর কিছু আছে।
ফ্রান্সিস মুখ ফিরিয়ে বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলল–ভেতরে একটা ঘরমত দেখা যাচ্ছে। এখন দরজা সবটা খুলতে হবে। হাত লাগাও।
লোহার বড় কড়াটা ধরে আবার টানটানি শুরু হল। একসময় দরজা সবটা খুলে গেল। শাঙ্কোর হাত থেকে মশাল নিয়ে ফ্রান্সিস ঘরটায় ঢুকে পড়ল।
এক আশ্চর্য দৃশ্য। সোনার মোটা পাতে মোড়া একটা সিংহাসন ঠিকঘরের মাঝখানটায়। তার ওপর বসা অবস্থায় একনরকঙ্কাল। হাত দুটো হাতলে রাখা।
সবাই ঘরটায় ঢুকে পড়েছে তখন। দেখা গেল ঘরটার দেয়ালগুলো মসৃণ পাথরের। তাতে নানা রঙের মূল্যবান হীরে মনিমানিক্য গাঁথা। সোনার সিংহাসনের গায়ে ফুল লতাপাতার কারুকাজ। সবাই অবাক হয়ে চারদিক তাকিয়ে দেখতে লাগল।
ফ্রান্সিস কত গুপ্তধন খুঁজে উদ্ধার করেছে। সেই ফ্রান্সিসও এই দৃশ্য দেখে অবাক হল। বুঝল নরকঙ্কালটি রাজা সামেনোর। সবাই ধ্বনি তুলতে ভুলে গেল। কিন্তু হ্যারি উল্লাসধ্বনি তুলল–ও-হো-হো। এবার সবাই আনন্দে গলা। মেলাল। গুহার গায়ে সেই ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হল।
এবার ফেরার পালা। কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে ফ্রান্সিস পাথরের দরজাটা বন্ধ করে দিল।
জলে সাঁতার কেটে সবাই পারে এসে উঠল। তারপর গুহা থেকে বেরিয়ে এল। সবাই রাজবাড়ির দিকে চলল। হ্যারি ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–এখন রাজাকে পাতালঘর আবিষ্কারের কথা বলবে না?
না। এখনই সব জানাবো না। কাল সকালে রাজসভায় বলবো। জানাজানি হয়ে গেলে অরক্ষিত গুহাটা দেখতে রাতেই লোকজন ছুটবে। আজ রাতটা চুপ করে থাকবো। কালকে রাজাকে বলবো আর সুরক্ষিত রাখতেও বলবো। আজ রাতটুকু বিশ্রাম। ঘুম। ফ্রান্সিস বলল।
পরের দিন সকালে ফ্রান্সিস হ্যারিকে নিয়ে রাজসভায় গেল।
আজকে কোন বিচার চলছিল না। রাজা আসিরিয়া ফ্রান্সিসকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করলেন। ফ্রান্সিস এগিয়ে এল।
