সারা রাস্তা কেউ কোন কথা বলল না। কারো মন ভালো নেই।
সন্ধের সময় সবাই অতিথিশালায় ফিরে এলো।
পরদিন সকালে হ্যারিকে নিয়ে ফ্রান্সিস রাজসভায় গেল। তখন বিচার চলছিল। বিচার শেষ হতে রাজা ফ্রান্সিসদের কাছে ডাকলেন।
–পাতালঘরের হদিশ করতে পারলে? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
–এখনও পারিনি। তবে দুতিনটি জায়গা এখনও দেখা বাকি। তারপর ফ্রান্সিস গতকালের ঘটনা সব বলল। রাজা আসিরিয়া মাথা নেড়ে দুঃখপ্রকাশ করলেন।
–মান্যবর রাজা আমাদের দশ-পনেরোটা বর্শা চাই। ফ্রান্সিস বলল।
বর্শা নিয়ে কী করবে? রাজা বললেন।
–এই ভয়ঙ্কর হাঙরটা হত্যা করবো। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাদের কোন বিপদ না হয়। রাজা আশঙ্কা প্রকাশ করলেন।
–না। আমরা সাবধানে কাজ সারবো। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক আছে। প্রহরীকে পাঠাচ্ছি। ও বর্শা দিয়ে আসবে। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিসরা অতিথিশালায় ফিরে এল।
ফ্রান্সিসের নির্দেশে সবাই তাড়াতাড়ি খেয়ে নিল। প্রহরী বর্শা দিয়ে গেছে। সবাই বর্শা হাতে নিল। শুধু ফ্রান্সিস একটা তরোয়াল কোমরে গুঁজে নিল।
সবাই চলল সেই পাহাড়ের দিকে। উজ্জ্বল রোদের দিন।
ফ্রান্সিসরা যখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছে তিয়েরাবাসীরা ওদের দেখে পরস্পর বলাবলি করতে লাগল সবুজ রাজা তো হেরে গেছে তবে ওরা কাদের সঙ্গে লড়াই করতে যাচ্ছে?
ফ্রান্সিসরা পাহাড়ী এলাকায় পৌঁছল। সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপ্টা পার হয়ে ওরা গুহামুখে এল। তারপর গুহায় ঢুকে সেই লম্বাটে পুকুরের সামনে এল। ফ্রান্সিসের নির্দেশে একটু দূরে দাঁড়াল সবাই। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–ভাইসব–একটা ভয়ঙ্কর হাঙরের সঙ্গে লড়াই আজ। বন্ধুর নির্মম মৃত্যুর প্রতিশোধ নেবার দিন আজ। একটু থেমে বলল–প্রথমে আমি একা জলে নামছি। হ্যারি চমকে উঠে ফ্রান্সিসের হাত চেপে ধরল। বলল–পাগল হয়েছে। নিশ্চিত মৃত্যু।
–উপায় নেই। যখন সবাই মিলে বর্শা চালাবে তখন জল রক্তে লাল হয়ে যাবে। তখন নিশানা ঠিক রেখে আক্রমণ করা যাবে না। এখন আমি পরিষ্কার জলে হাঙরটাকে দেখতে পাবো। আজকে রোদও উজ্জ্বল। ঠিক ওটার ফুসফুসে বোয়াল ঢুকিয়ে দিতে পারব। তারপর সবাই মিলে আক্রমণ। তুমি নিশ্চিন্ত হও। হাঙরের সঙ্গে এর আগেও লড়েছি। আমি ওদের মতিগতি বুঝি। আক্রমণের ফন্দীফিকির জানি। ঠিক ঘায়েল করবো ওকে। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস তরোয়াল কোমর থেকে খুলে দাঁতে চেপে ধরল। তারপর আস্তে আস্তে জলে নামল। বন্ধুরা সবিস্ময়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে লাগল।
ফ্রান্সিস হাত পা নেড়ে জলে শব্দ করল। তারপর ডুব দিল। দেখল একটু দূরে হাঙরের মুখটা। সত্যিই বীভৎস। মুখে গায়ে কালচে শ্যাওলা জমে গেছে। সাত আট হাত দূরে একটা বড় পাক খেয়ে হাঙরটা একটু দূরে চলে গেল। অভিজ্ঞ ফ্রান্সিস বুঝল এবার হাঙরটা আক্রমণ করবে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ও হাতে পায়ে জল ঠেলে নিচে চলে এল। তখনই হাঙরটা ছুটে ওর মাথার কাছে এল। হাঙরের বিরাট পেটটা দেখল ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস দাঁতে চেপে ধরা তরোয়ালটা খুলে হাতে নিল। এইবার হাঙরটা এসে ওকে আক্রমন করতে উদ্যত হল। ফ্রান্সিস তৈরী ছিল। হাঙরের বুকের ফুসফুস লক্ষ্য করে ফ্রান্সিস ওর তরোয়াল বিঁধিয়ে দিল। যতটা জোরে সম্ভব। রক্ত বেরিয়ে এল। হাঙরটা বোধহয় এরকম আক্রমন আশঙ্কা করেনি। ওটা পাক খেয়ে সরে গেল।
ফ্রান্সিস আর এক মূহুর্ত দেরি করল না। ডুব সাঁতার দিয়ে দ্রুত পারের দিকে চলে এল। তারপর পারে উঠে শুয়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। তোমার কিছু হয় নি তো? হ্যারি ছুটে এসে জিজ্ঞেস করল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে মাথা নাড়ল। বলল–ঠিক ফুসফুসে তরোয়াল বিধিয়েছি। এখন বর্শা দিয়ে ওটাকে মারতে হবে। সবাই তৈরী হও।
সবাই বর্শা হাতে জলের ধারে দাঁড়াল। ফ্রান্সিস উঠে বলল–খুব কাছে যেও না। লেজের ঝাঁপটায় ফেলে দেবে। আর বর্শা হাত ছাড়া করোনা। কারণ অনবরত বর্শার ঘা মেরে যেতে হবে।
পাখনা দিয়ে জল কেটে আহত হাঙরটা পারের দিকে এগিয়ে এল। সবাই বর্শার ঘা মারল হাঙরটার পিঠে। দু’একটা বর্শা একেবারে গেঁথে গেল হাঙরটার পিঠে। যেগুলো খুলে আনা গেল না। পুকুরের জল রক্তে লাল হয়ে উঠল। হাঙরটা একটু– দূরে সরে গেল।
ফ্রান্সিস পার ধরে জলে নামল। জলে হাত পা নেড়ে শব্দ করে দ্রুত পারে উঠে। এল। হাঙরটা ছুটে এল। পার থেকে ভাইকিংরা দ্রুত বর্শার ঘা মারল হাঙরটার পিঠে। হাঙরটা চিৎ হয়ে গেল। এবার ওটার বুকে বর্শা বিধিয়ে দিতে লাগল।
পুকুরটার জল লাল হয়ে গেল। জল তোলপাড় করে হাঙরটা ডুবে গেল।
সবাই পারের কাছে দাঁড়াল। বসে পড়ল কেউ কেউ।
-হাঙরটা কি করছে? শাঙ্কো ফ্রান্সিসকে জিজ্ঞেস করল।
বুঝতে পারছি না। জলে নেমে দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–ভুলে যেও না হাঙরটা আহত। ক্ষেপে আছে। হ্যারি বলল।
ঝুঁকি নিতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে বসে রইল।
এবার ফ্রান্সিস জলে নামল। ডুব দিল। জল রক্তে লাল। ভালো দেখা যাচ্ছে না। একটু অপেক্ষা করে ডুব সাঁতার দিয়ে এগিয়ে গেল। তখনই অস্পষ্ট দেখল ক্ষত বিক্ষত হাঙরের বিরাট দেহটা পাথরের মেঝেয় পড়ে আছে। অনড়। তখনও সারা গা পেট থেকে রক্ত বেরুচ্ছে। ফ্রান্সিস বুঝল হাঙরটা মারা গেছে। ও জলের ওপর ভেসে উঠল। হেসে বলে উঠল–একেবারে খতম। বন্ধুরা ধ্বনি তুলল–ও-হো–
