— ফ্রান্সিস গহ্বরের ভেতরে তাকাল। অন্ধকার। কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ও ভাবল এই গহুরটা নিশ্চয়ই পাথর কেটে করা হয়েছে। নিশ্চয়ই এই গহ্বরে কিছু আছে। হয়তো পাতালঘরটাই আছে।
ও চূড়ো থেকে নেমে এল। বন্ধুদের কাছে এসে বলল,
–সবকিছু দেখলাম। একটা গহ্বরও দেখলাম। কালকে ঐ গহ্বরে নামবো। শক্ত দড়ি আর মশাল চকমকি পাথর লোহার টুকরো আনতে হবে। এখন নেমে চলল।
সবাই পাহাড়ের চাইয়ের ওপর পা রেখে রেখে নেমে এল।
–তোমার কি মনে হয় ওখানে কোন পাতালঘর আছে? হ্যারি জিজ্ঞেস করল।
–গহ্বরে না নেমে বলতে পারছি না। তবে এখানেই তো পুরোনো রাজবাড়ি ছিল। কাজেই গহ্বরটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু একটা নিশ্চয়ই আছে ওখানে। ফ্রান্সিস বলল।
পরদিন দুপুরের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিসরা আবার পাহাড়ী এলাকায় এলো। শাঙ্কোদের নিয়ে ফ্রান্সিস পাহাড়টায় উঠল। চূড়োর কাছাকাছি এসে শাঙ্কো সঙ্গে আনা দড়িটার একটা মাথা একটা বড় পাথরের চাইয়ের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধল। অন্য মাথাটা ফ্রান্সিসের হাতে দিল। ফ্রান্সিস দড়ির মাথাটা কোমরে বাঁধল। সিনাত্ৰা চকমকি ঠুকে একটা মশাল জ্বালিয়ে দিল।
মশালটা বাঁ হাতে নিয়ে ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে গহ্বরে নামতে লাগল। ওপর থেকে শাঙ্কোরা দড়ি ছাড়ছিল। গহ্বরে মশালের আলো পড়ল। চারপাশের পাথুরে প্রায় মসৃণ দেয়াল দেখা যেতে লাগল।
একসময় ফ্রান্সিসের পায়ে পাথরের মেঝে ঠেকল। ও দেখল একটা ঘর। মশালের আলো ফেলে ফেলে ঘরটার চারদিকে দেখতে লাগল। শুধুই একটা ঘর। তার জানালা দরজা নেই। তবে দেখে মনে হল এই ঘরটা ব্যবহৃত হত। এই ঘরটা কয়েদঘর হবার সম্ভাবনাই বেশি। ফ্রান্সিস বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল যদি শীলমোহরের নকশা কোথাও খোদাই করা থাকে। না। সেরকম কোন নকশা কুঁদে তোলা নেই। আর কিছু দেখার নেই।
ফ্রান্সিস দড়িতে দুটো হ্যাঁচকা টান দিল। ওপর থেকে শাঙ্কোরা দড়ি টানতে লাগল। আস্তে আস্তে ফ্রান্সিস ওপরে উঠে এল। চূড়ো থেকে নেমে আসতে হ্যারি বলল–কিছু দেখলে?
-একটা পুরোনো ঘর। বোধহয় কয়েদঘর ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–কোন চিহ্নটিহ্ন কিছু পেলে? হ্যারি জানতে চাইল।
–না। সেরকম কিছু নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–তাহলে ওটা পাতালঘর নয়। হ্যারি বলল।
–তাই তো মনে হল। তবে পাহাড়গুলো খুঁজে দেখতে হবে। এরকম কোন ঘর পাওয়া যায় কিনা। গহুর গুহা সবই দেখতে হবে। ফ্রান্সিস বলল।
ওরা পাহাড়ী এলাকায় ঘুরে বেড়াল। কিন্তু কোন গহুর বা গুহা পেল না। ফ্রান্সিস। বলল–চলো সমুদ্রের দিক থেকে দেখি। সমুদ্রের দিকে গেল সবাই। সমুদ্রের জলের বড় বড় ঢেউ পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে। জল ছিটকে উঠেছে। তার মধ্যে দিয়েই ওরা পাহাড়ের ধার দিয়ে চলল।
বিকেলের ম্লান আলোয় হঠাৎ একটা গুহামুখ নজরে পড়ল। সমুদ্রের জলের বড় বড় ঢেউ সেই গুহামুখে আছড়ে পড়ছে। একদিকে ঢেউয়ের ছিটকানো জল অন্যদিকে পায়ের নীচে শ্যাওলাধরা পিছল পাথর। তার মধ্যে দিয়ে হেঁটে ওরা গুহামুখে এসে দাঁড়াল।
গুহামুখ দিয়ে বিকেলের নিস্তেজ আলোয় যতদূর দেখা গেল বোঝা গেল গুহাই। অন্য কিছু দেখা গেল না। গুহার ভেতরটা অন্ধকার।
ভেতরে ঢুকে গুহাটা দেখতে হয়। ফ্রান্সিস বলল।
সন্ধ্যে হতে বেশি দেরি নেই। এখন একটা অজানা অচেনা গুহায় ঢুকবো? হ্যারি বলল।
উপায় নেই। মারিয়া ওরা নিশ্চয় ভাবছে। তাই দেরি করতে চাই না। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ চলো। হ্যারি বলল।
সবাই গুহার মধ্যে ঢুকল। কিছুটা এগোতেই দেখা গেল একটা লম্বাটে পুকুর মত। জল কতটা গভীর বোঝা গেল না। পুকুরটার ওপারে অন্ধকার গুহা।
–সিনাত্রা–একটা মশাল জ্বালো। ফ্রান্সিস বলল।
সিনাত্ৰা চকমকি পাথর ঠুকে একটা মশাল জ্বালাল। ফ্রান্সিস জ্বলন্ত মশালটা কয়েকবার দুলিয়ে দুলিয়ে পুকুরটার ওপারে ছুঁড়ে ফেলল। এবার মশালের আলোয় ওপারটা দেখা গেল। টানা গুহা চলে গেছে। ফ্রান্সিস বলে উঠল-জলে নেমে ওদিকটা দেখে আসি। কতটা দূরে গেছে গুহাটা।
-কিন্তু আলো পড়ে গেছে। এখন ফিরে চল। কালকে না হয়–হ্যারি বলতে গেল।
-না-না। এই ধনসম্পদ উদ্ধারের কাজটা তাড়াতাড়ি সারতে হবে। ফ্রান্সিস বলল। তারপর জলে ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। সাঁতরে কিছুটা যেতেই দেখলে আছামত কী একটা চোখের সামনে দিয়ে সরে গেল। এবার অস্পষ্ট দেখল একটা বিরাট পানা জল কেটে বেরিয়ে গেল। হাঙর! দেখল অতিকায় হাঙর একটু দূরে মোড় ঘুরল। ফ্রান্সিস সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে বন্ধুদের দিকে যত দ্রুত সম্ভব সাঁতরে চলল। তীরের পাথরে পা রেখে শরীরের এক ঝটকা ওপরে উঠে এল। ও হাঁপাচ্ছে তখন। হ্যারি শাঙ্কো এগিয়ে এল। হ্যারি বলল–কী হয়েছে?
–একটা অতিকায় হাঙর। বীভৎস। হাঁপাতে হাঁপাতে ফ্রান্সিস বলল। এই কথা শুনে এক ভাইকিং বন্ধু জলের কাছে গিয়ে মুখ বাড়াল। জলে হাঙরের লেজটা ভেসে উঠেই প্রচন্ড জোরে আছড়ে পড়ল বন্ধুটির ওপর। মুহূর্তে বন্ধুটি ছিটকে জলে পড়ে গেল। জল আলোড়িত হল। জলে ঢেউ উঠল। পরক্ষণেই আর কোন শব্দ নেই।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে গলা চড়িয়ে বলে উঠল–সবাই জলের ধার থেকে সরে এসো। ভয়ঙ্কর হাঙর। সবাই দ্রুত সরে এলো।
–এই হাঙরটা না মেরে ওপারে যাওয়া যাবে না। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল।
বন্ধুর এই আকস্মিক মৃত্যুতে সবারই মন খারাপ হয়ে গেল। ফ্রান্সিস আবার গলা চড়িয়ে বলল–আমাদের এক বন্ধুকে এই ভয়ঙ্কর হাঙর মেরে ফেলেছে। আমি এটাকে নিকেশ করবোই। কাল দুপুরে আবার আসবো আমরা। এখন ফেরা যাক।
