–সেই পাতালঘর কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–জানি না। রাজা মাথা নেড়ে বললেন।
–আপনি সেই ধনসম্পদের খোঁজ করেন নি? ফ্রান্সিস বলল।
না। কারণ সেই ধনসম্পদ রাজা সার্মেনো জলদস্যুতা করে সঞ্চয় করেছিলেন। নিরীহ জাহাজযাত্রীদের রক্তে ভেজা সেই ধনসম্পদের ওপর আমার কোন লোভ নেই। রাজা বললেন।
–কেউ কি ধনভান্ডার খুঁজেছিল? ফ্রান্সিস প্রশ্ন করল।
-হ্যাঁ তিনজন খুঁজতে সমুদ্রতীরের পাহাড়টায় গিয়েছিল। কিন্তু তারা জীবিত অবস্থায় ফেরেনি। রাজা বললেন।
–তাদের মৃতদেহও পাওয়া যায়নি? ফ্রান্সিস বলল।
–না। রাজা মাথা নেড়ে বললেন।
–তারা সমুদ্রতীরের পাহাড়ের দিকে গিয়ে খুঁজেছিল কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–আমি তাদের বলেছিলাম অতীতের রাজবাড়ি ছিল ঐ পাহাড়ের কাছে। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। আমরা খুঁজে দেখতে চাই। আমাদের অনুমতি দিন। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু তিনজন ফেরেনি। তারপরেও তোমরা–রাজা বলতে গেলেন।
ফ্রান্সিস বাধা দিয়ে বলল–বেশ কিছু গুপ্ত ধনভান্ডার আমি বুদ্ধি খাটিয়ে উদ্ধার করেছি। আশা করছি এই ধনভান্ডারও উদ্ধার করতে পারবো।
–বেশ। কথাটা বলে রাজা আসিরিয়া সেনাপতির দিকে তাকালেন। সেনাপতি পাশে রাখা কাঠের আসনের দিকে হাত বাড়াল। একটা ছোটো চৌকোনো চামড়া মেশানো কাগজ তুলে ফ্রান্সিসকে দিল। ফ্রান্সিস দেখল কাগজের মাঝখানে একটা শীলমোহর। নিচে স্পেনীয় ভাষায় লেখা–অনুমতিপত্র।
–এটা আপনার অনুমতির শীলমোহর? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-হ্যাঁ। এই অনুমতিপত্র নিয়ে আমার রাজ্যের যে কোন জায়গায় তোমরা অবাধে যেতে পারবে। এমনকি রাজঅন্তঃপুরেও যেতে পারবে। রাজা বললেন।
–এই শীলমোহর কি আপনিই প্রচলিত করেছেন? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
-না। শুনেছি পূর্বপুরুষ রাজা সার্মেনো এই শীলমোহর ব্যবহার করতেন। তখন থেকেই এই শীলমোহরের ব্যবহার চলে আসছে। এই শীলমোহর আমার সিংহাসনেও আছে। রাজা বললেন। রাজা আসনের ওপরের কাপড়ের ঢাকনা সরালেন। দেখা গেল সিংহাসনের মাথায় এই শীলমোহর কাঠ কুঁদে তোলা আছে। এখানকার সব আসনেই। তাছাড়া অন্দরমহলের প্রত্যেক পাথরের দেয়ালে এই শীলমোহর কুঁদে ভোলা আছে। রাজা বললেন।
–আমি শীলমোহরের নকশাগুলো দেখতে চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমাকে তো অনুমতিপত্র দেওয়াই হয়েছে। যাও। রাজা বললেন।
–তাহলে অন্দরমহলে একটু খবর পাঠান যে আমরা যাবো। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা একজন প্রহরীকে ডাকলেন। স্থানীয় ভাষায় কিছু বললেন। প্রহরীটি চলে গেল।
কিছুপরে প্রহরীটি ফিরে এল। ফ্রান্সিসদের আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস আর হ্যারি অন্দরমহলে ঢুকল। এঘর ওঘর ঘুরে ঘুরে দেখল। সব পাথরের দেয়ালেই শীলমোহর কুঁদে তোলা। দেয়ালে ফুলপাতার নকশার মধ্যে ঐ শীলমোহরের নকশা।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজসভায় ফিরে এল।
-দেখলে? রাজা জিজ্ঞেস করলেন।
-হ্যাঁ। ঐ শিলমোহরগুলো ভেঙে দেখা যায় কিনা সেটা পরে ভেবে দেখবো। এখনও আরো কিছু দেখার আছে। কাজেই আগেই দেয়াল ভাঙতে যাবো না। ফ্রান্সিস বলল।
ওগুলো ভাঙতে গেলে সমস্ত দেয়ালই হয়তো ভেঙে পড়বে। রাজা বললেন।
—সাবধানে। হিসেব করে ভাঙতে হবে। তবে ওসব ভাঙার মধ্যে এখন যাচ্ছি না। বললাম না–আরো কিছু দেখতে হবে। ভাবতে হবে। এবার আমরা যাচ্ছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর দু’জনে রাজসভা থেকে বেরিয়ে এল।
দু’জনে অতিথিশালায় এল। বন্ধুরা জানতে চাইল ওরা দু’জনে রাজা আসিরিয়ার সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলল। ফ্রান্সিস সব কথা বলল।
–তাহলে আবার অভিযান কর। শাঙ্কো খুশির স্বরে বলল।
-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস মাথা ওঠানামা করল। তারপর বলল–সবাই দুপুরের খাবার খেয়ে নিয়ে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবে। তারপর সমুদ্রতীরে পাহাড়ী এলাকায় যাবো। কারণ ওখানেই কোথাও পুরোনো রাজবাড়ি ছিল। ঐ এলাকাটা ভালো করে খুঁজতে হবে।
দুপুরের খাবার খেয়ে সবাই তৈরি হল। ফ্রান্সিস বলল–সবাই তরোয়াল নিয়ে নাও। বলা যায় না সবুজ রাজার সেনাপতি হঠাৎ আক্রমণ করতে পারে।
সবাই তরোয়াল কোমরে গুঁজে চলল। তিয়ারার লোকজন ফ্রান্সিসদের বেশ ঔৎসুক্যের সঙ্গেই দেখল কোথায় চলেছে ওরা? আবার লড়াই করতে যাচ্ছে নাকি?
পাহাড়ী এলাকায় পৌঁছল সবাই। দেখল সমুদ্রের ধারেই কয়েকটা ছোট পাহাড়। মাঝখানের পাহাড়টাই সবচেয়ে উঁচু। ফ্রান্সিস স্থির করল পাহাড়ের মাথায় উঠতে হবে। তাহলেই চারদিক ভালো দেখা যাবে। ঐসব পাহাড়ের মধ্যেই নিচে কোথাও পাতালঘর থাকলে তার হদিশও পাওয়া যাবে।
এবারে পাহাড়ে ওঠা। মাঝখানে উঁচু পাহাড়টাকেই বেছে নিল ফ্রান্সিস। শাঙ্কো সিনাত্রা বিস্কোকে নিয়ে ফ্রান্সিস পাহাড়টায় উঠতে লাগল। এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরের চাইয়ে পা রেখে রেখে ওরা পাহাড়টার চূড়ার কাছাকাছি এল। দেখা গেল চূড়ার কাছাকাছি কোনো পাথরের চাই নেই। তবে পাথরের খাঁজ রয়েছে। সেইসব খাঁজেই পায়ের ওপর ভর রেখে রেখে চূড়োয় উঠতে হবে।
–তোমরা থাকো। আমি একা উঠে সব দেখছি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর পাথরের খাঁজে খাঁজে দেহের ভর রেখে রেখে চুড়োয় উঠে এল। চারদিকে তাকিয়ে অন্য ছোট পাহাড়গুলো দেখল। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে দেখল সমুদ্রের বিশাল বিশাল ঢেউ পাহাড়টার গোড়ায় আছড়ে পড়ছে। আট-দশ হাত উঁচু পর্যন্ত জল ছিটকে উঠছে। চোখ ফিরিয়ে আনতে তখনই দেখল কাছেই একটা গহুর নিচের দিকে নেমে গেছে। গহ্বরের গা খুব এবড়ো খেবড়ো নয়। কিছুটা বা মসৃণ। যেন কেটে করা হয়েছে।
