–তাহলে একে মেরে ফেলি। সবুজ রাজা কথাটা বলেই লাফিয়ে উঠে দাঁড়াল। কোমর থেকে তরোয়াল কোষমুক্ত করল। চেঁচিয়ে বলল–তবে এটাও মরুক। মুহূর্তে তরোয়াল ঢুকিয়ে দিল রক্ষীটির বুকে।
ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলে উঠল–শাঙ্কো। শাঙ্কো তৈরিই ছিল। জামার তলা থেকে দ্রুতহাতে ছোরাটা বের করল। প্রহরীরা রাজসভার লোকেরা কিছু বোঝার আগেই সবুজ রাজার ওপর শাঙ্কো ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমূল ছোরা বিধিয়ে দিল সবুজ রাজার বুকে। সবুজ রাজা উল্টে পড়ল সিংহাসনের ওপর। তারপর সিংহাসনসুষ্ঠু উল্টে পড়ল মেঝেয়। তার হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস একলাফে ছুটে গিয়ে তরোয়ালটা তুলে নিল। ওদিকে রক্ষীটিও মেঝেয় পড়ে মারা গেছে।
এতক্ষণে প্রহরীরা সচকিত হল। তরোয়াল কোষমুক্ত করে দুজন প্রহরী শাঙ্কোর দিকে ছুটে এল। ফ্রান্সিস এক ছুটে শাঙ্কোকে আড়াল করে দাঁড়াল। একজন প্রহরী ফ্রান্সিসের তরোয়ালের মার ঠেকাতে গিয়ে বাঁদিকে ঝুঁকে পড়ল। ফ্রান্সিস এই সুযোগ ছাড়ল না। প্রচন্ড জোরে তরোয়ালের ঘা মারল প্রহরীটির ডান কাঁধে। প্রহরীটি তরোয়াল ফেলে বা হাতে ডান কাধ চেপে ধরল। শাঙ্কো সঙ্গে সঙ্গে তরোয়ালটা মেঝে থেকে তুলে নিল। বাঁ হাতে ছোরা আর ডানহাতে তরোয়াল নিয়ে শাঙ্কো প্রহরীদের সঙ্গে লড়াই চালাল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই প্রহরীরা হার স্বীকার করল। ফ্রান্সিসদের নিপুণ তরোয়াল চালানো দেখে ওরা অবাক হয়ে গেল।
তখনই রাজবাড়ির বাইরে চিৎকার হৈহৈ শোনা গেল। একটু পরেই রাজবাড়ির দ্বারদেশে ধ্বনি উঠল– ও–হো–হো। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কোও ধ্বনি তুলল–ও—হো-হো।
দল বেঁধে খোলা তরোয়াল হাতে ভাইকিং বন্ধুরা রাজসভায় ঢুকে পড়ল। সঙ্গে রাজা আসিরিয়ার সৈন্যরাও ঢুকল। ফ্রান্সিস বুঝল ওদের জয় হয়েছে।
হ্যারি ছুটে এসে ফ্রান্সিসকে জড়িয়ে ধরল। ওর চোখে জল। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে মৃদুস্বরে বলল–এই কেঁদো না। রাজা আসিরিয়া কোথায়?
–আসছেন। উনিও লড়াইয়ে পটু। হ্যারি বলল।
সিনাত্রা গড়িয়ে পড়া সিংহাসনের কাছে গেল। টেনে তুলে ওটা ভালোভাবে পেতে দিল। শাঙ্কোও ওকে সাহায্য করল।
কিছুপরে রাজা আসিরিয়া ঢুকলেন। তার পেছনে সেনাপতি। রাজা আসিরিয়া সবুজ রাজাকে মেঝেয় পড়ে থাকতে দেখে ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বললেন–উনি কি মারা গেছেন?
হ্যাঁ। তার প্রাপ্য শাস্তি পেয়েছে। মৃত সবুজ রাজার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে রাজা সিংহাসনে বসলেন। এবার ফ্রান্সিকে বললেন-তোমাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। তোমাদের জন্যে আমি শুধু জীবনই ফিরে পেলাম না আমার রাজত্বও ফিরে পেলাম। তারপর হেসে বললেন
–আমার কাছে তো তোমাদের কিছু প্রাপ্য হয়।
–আমরা কিছুই চাই না। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
–কিছু না? রাজা বললেন।
–না-কিছু না। শুধু একটা ব্যাপারে আপনার সাহায্য চাই। ফ্রান্সিস বলল।
–সেটা কী? রাজা সাগ্রহে বলে উঠলেন।
–সেটা কালকে এখানে এসে বলবো। আমরা সবাই ক্লান্ত। আজকে আর কোনো কথা নয়। আপনিও অন্দরমহলে যান। রানিমা নিশ্চয়ই খুব দুশ্চিন্তায় আছেন। ফ্রান্সিস বলল।
–ঠিক-ঠিক। রাজা সঙ্গে সঙ্গে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। অন্দরমহলের দিকে চললেন।
ফ্রান্সিসরা অতিথিশালায় ফিরে এল। একজন রক্ষী এসে বলল–আপনাদের দেখাশোনা করতে সেনাপতি পাঠালেন।
–ঠিক আছে। তুমি এখানেই থাকো। শাঙ্কো বলল। ফ্রান্সিসের সেই মৃত রক্ষীর কথা মনে পড়ল। ওর মনটা খারাপ হয়ে গেল।
ফ্রান্সিসরা অতিথিশালায় শুয়ে বসে বিশ্রাম করতে লাগল। দুপুরের খাওয়ার পরও বিশ্রাম নেওয়া চলল।
সন্ধ্যেবেলা কয়েকজন বন্ধু তিয়ের নগর দেখতে বেরুলো। ওরা ফিরে এসে বলল–কী আর দেখবো। মৃতদেহ ছড়িয়ে আছে। সৎকার চলছে। আগুনে পোড়া বাড়িঘর। কান্নাকাটি। শাঙ্কো বলল–দুদিন আগেও কত বড় উৎসব হয়ে গেল এখানে। নাচ গান। সিনাত্রাও সেই আসরে গান গেয়েছে। আজ তো শ্মশানের মতই অবস্থা।
রাতে খাওয়ার পর ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল। হ্যারি কাছে এল। বলল–ফ্রান্সিস?
–হুঁ। বলো। ফ্রান্সিস ওর দিকে তাকালো।
–কালকে জাহাজে ফিরলে হয় না? হ্যারি বলল।
–না। একটা কাজ বাকি আছে। ফ্রান্সিস বলল।
–কী কাজ? হ্যারি বলল।
কালকে রাজসভায় রাজাকে বলবো। শুনো। ফ্রান্সিস বলল।
–বুঝেছি। হ্যারি বলল।
–কী বুঝেছো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–কোন গুপ্ত ধনভান্ডারের খবর পেয়েছে। তাই কিনা? হ্যারি বলল।
ফ্রান্সিস হেসে বলল–এই জন্যেই তোমাকে এত ভালো লাগে। ঠিক ধরেছো।
–আজ রাত হয়েছে। তুমি ক্লান্ত। ঘুমিয়ে পড়ো। কালকে সব শুনবো। হ্যারি বলল। তারপর শুয়ে পড়ল।
পরদিন সকালের খাবার খেয়ে ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজসভায় এল।
রাজা আসিরিয়া কাঠের সিংহাসনে বসে ছিলেন। প্রজাদের মধ্যে কয়েকজন রাজাকে সবুজ রাজার অত্যাচারের কথা বলছিল। রাজা তাদের সান্ত্বনা দিচ্ছিলেন।
ফ্রান্সিস আর হ্যারি রাজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। রাজা ফ্রান্সিসের দিকে তাকিয়ে বললেন–
–তুমি কিছু বলবে বলেছিলে।
–হ্যাঁ–আপনার পূর্বপুরুষ কোন রাজা তার ধনসম্পদ এই রাজত্বের কোথাও গোপনে রেখে গেছেন। এ ব্যাপারে আপনি কী জানেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল।
–কিছুই জানি না। শুনেছি আমাদের পূর্বপুরুষ রাজা সার্মেনো অনেক ধনসম্পদ পাতালঘরে গোপনে রেখে গেছেন। রাজা বললেন।
