সারারাত ফ্রেদারিকোর মৃতদেহটা ঘরের বিছানাতেই পড়ে রইল। পরদিন সকালবেলা একজন জলদস্যু এল। মাথা ঢাকা রুমাল, একটা ভাজকরা সিল্কের চাদরের মত। বোঝা গেল, কেউ মারা গেলে এই লোকটাই পাদ্রীর কাজ করে। পাদ্রীর হাতে একটা শতছিন্ন বাইবেল। বাইবেলটা একবার ফ্রেদারিকোর কপালে ছোঁয়ালো। তারপর বাইবেল থেকে কিছুটা পড়ল। আমেন’ বলে কপালে, বুকে, কাঁধে, হাত ছুঁইয়ে ক্রশের চিহ্ন আঁকল। তারপর চলে গেল। বেঞ্জামিন আর দু’জন পাহারাদার ফ্রেদারিকোর মতৃদেহ ধরাধরি করে নিয়ে গেল সমুদ্রে ফেলে দেবার জন্যে।
ফ্রেদারিকোর মৃত্যুসংবাদ শুনে লা ব্রুশের মুখের ভাব কেমন হলো, সেটা আর। ফ্রান্সিসদের দেখা হল না। তবে সংবাদটা শুনে লা ব্রুশ যে খুব মুষড়ে পড়েছিল, এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। ফ্রান্সিস ভাবল, এর পরে লা ব্রুশ বোধহয় চাঁদের দ্বীপে আর যাবে না। ওর এই অনুমানটা হ্যারিকে বললো। হ্যারি কিন্তু মাথা নেড়ে বলল–উঁহু–দেখো–ও চাঁদের দ্বীপে যাবেই। মুক্তোগুলো ও হাতছাড়া করবে না কিছুতেই।
হ্যারির অনুমানই ঠিক হলো দুদিন পরেই লা ব্রুশের ক্যরাভেল সোফালা’ বন্দরে ভিড়ল। পেছনে বাঁধা ফ্রান্সিসদের জাহাজটা।
তখন সবে ভোর হয়েছে। ‘সোফালা’ নামেই একটা বন্দর। এমন কিছু বড় বন্দর নয়। জাহাজঘাটা বলে কিছুই নেই। জাহাজ থেকে নৌকো করে পারে যেতে হয়। সেদিন বন্দরটায় আর কোন জাহাজ ছিল না।
বেলা হলে দু চারজন আজিম্বা বন্দরে এসে দাঁড়াল। ওরা বোধহয় মালপত্র বয়ে, নিয়ে যাওয়া আসা করে। পণ্য বিনিময়ে প্রথায় সেই সময়ে চললেও লা ব্রুশ তো জলদস্যু ওর জাহাজে বিনিময় যোগ্য পণ্য থাকার কথা নয়। ছিলও না। তবু বড় সর্দারকে সঙ্গে নিয়ে লা ব্রুশ নৌকোয় চড়ে বন্দরের দিকে চলল। লা ব্রুশ বেশ জমকালো পোষাক পরেছে। কোমরের বেল্ট-এর ওপর জড়ির কাজকরা সিল্কের কাপড়ের কোমরবন্ধ। তাতে হাতির দাঁতের বাটঅলা তরোয়াল গোঁজা। পিস্তলটা নেয়নি। মাথার টুপিটা পরিষ্কার। পায়ের পোষাকটার সোনালী জড়িগুলো চক্চক্ করছে। পায়ের একটা বুট ঘষে ঘষে বেশ পরিষ্কার করা হয়েছে। গোঁফ মোম দিয়ে পাকিয়ে ছুঁচালো করা হয়েছে। বড় সর্দার কিন্তু সেই মার্কামারা গেঞ্জী গায়ে। পায়ে বুট জুতো। লা ব্রুশ কিন্তু হাঁসের ডিমের মতো মুক্তো বসানো গলার হারটা পরে নি। ওর যে মুক্তোর সমুদ্রের একটা মুক্তো আছে, এটা ও প্রকাশ করলো না। এটা তার বুদ্ধির পরিচয় দিল। সমুদ্রের তীরে নেমে তারা দু’জন বালিয়ারির ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। লক্ষ্য রাজবাড়ি। যে দু’চারজন আজিম্বা এসে বালিয়াড়িতে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা বেশ অবাক হয়ে লা ব্রুশের পোষাক, তরবারি এসব দেখতে লাগল। বড় সর্দারকে সঙ্গে নিয়ে লা ব্রুশ চললো রাজবাড়ির উদ্দেশ্যে।
তীরভূমির বালি ছাড়াতেই দেখা গেল দু-তিনটে বড়-বড় ঘর। সেই রেনট্টির পাতা বাকল দিয়ে তৈরি। এগুলো গুদাম ঘর! তামাকপাতা মধু, এসব এই ঘরগুলোতে রাখে। বিদেশী জাহাজ আসে। কাপড়, চিনি এসব জিনিসের সঙ্গে ভাজি ব্যবসাদারেরা পণ্য বিনিময় করে, এই জন্যেই এখানে গুদামঘর করা হয়েছে।
গুদামঘরগুলো ছাড়িয়ে লা ব্রুশ আর বড় সর্দার হেঁটে চললো। এই জায়গাটায় বাজার মত বসেছে। বুনো ফল, আনারস, নানা রকম সামুদ্রিক মাছের পসরা নিয়ে ভাজিম্বা ব্যবসাদারেরা বসেছে। এখানে ভাজিম্বাদের ভিড় হয়েছে। লা ব্রুশ আর বড় সর্দার চলেছে। অনেকেই চেয়ে-চেয়ে ওদের দেখেছে।
লা ব্রুশ যখন রাজবাড়ি পৌঁছল, তখন একটু বেলা হয়েছে। রাজদরবার তখনও শুরু হয় নি। শুধু সেনাপতি আর কিছু দ্বাররক্ষী দরবারঘরে রয়েছে সেনাপতি একটা কাঠের আসনে বসে আছে। লা ব্রুশ সেনাপতিকে জিজ্ঞাসা করলো রাজা কখন আসবে?
–আসার সময় হয়ে এসেছে। সেনাপতি ভাঙা-ভাঙা পর্তুগীজ ভাষায় বলল। একমাত্র সেনাপতিই পর্তুগীজ ভাষা একটু বোঝে। ভাঙা-ভাঙা বলতেও পারে।
কিছুক্ষণ পরে কয়েকজন লাল সার্টিনের কাপড় পরা কয়েকজন রক্ষী খোলা তরোয়াল হাতে দরবার ঘরে ঢুকলো। তাদের পেছনে-পেছনে ন্যাড়া মাথা রাজা ঢুকলো। তার সঙ্গে মন্ত্রী আর গণ্যমান্য ব্যক্তিরা কয়েকজন ঢুকলো। যে যার কাঠের আসনে বসলো। রাজা মুক্তো বসানো কাঠের সিংহাসনে বসলো।
একপাশে একটি ভাজিম্বা স্ত্রীলোক দাঁড়িয়েছিল। সেনাপতি তাকে গিয়ে কি বললো। স্ত্রীলোকটি হাউমাউ করে কেঁদে উঠল। তারপর রাজার দিকে তাকিয়ে চীৎকার করে কি বলতে লাগলো। ওর বলা শেষ হলে রাজা ডানহাত ওপরের দিকে তুলে তর্জনী উঁচু করে কি বলল। স্ত্রীলোকটি চোখ মুছে–সেনাপতির দিকে তাকিয়ে রইলো। সেনাপতি কি যেন বললো। স্ত্রীলোকটি তখন হাসতে-হাসতে চলে গেলো।
তখন সেনাপতি লা ব্রুশের কাছে এসে বললো–আপনার নাম কি?
–বলুন যে লা ব্রুশ এসেছে। কিছু সওদা করতে চায়।
সেনাপতি তখন রাজার কাছে গেল। আস্তে-আস্তে কি বললো। রাজা লা ব্রুশকে কাছে আসার ইঙ্গিত করল। লা ব্রুশ এগিয়ে রাজার কাছে এলে রাজা ডান হাতটা বাড়িয়ে দিল। লা ব্রুশ রাজার তর্জনী ও মধ্যমা আঙ্গুল চুম্বন করে শ্রদ্ধা জানাল। শ্রদ্ধা জানাবার এই রীতিটা লা ব্রুশ আগে থেকে জানতো। তারপর রাজা কি জিজ্ঞেস করলেন। সেনাপতি কাছে এগিয়ে এলো। পর্তুগীজ ভাষায় রাজার প্রশ্নটা বললো তুমি কি সওদা করতে চাও? লা ব্রুশ বললো–আমার সঙ্গে দু’টো মস্ত বড় হীরের খন্ড আছে। তার একটা আপনাকে দিতে চাই। বদলে আমাকে দেড়’শ মুক্তো দিতে হবে।
