ফ্রান্সিসরাও বসল। ফ্রান্সিস পাথুরে মেঝেয় শুয়ে পড়ল। শুনল রাজা আর সেনাপতির মধ্যে কথাবার্তা চলছে। সেনাপতি বলল–মান্যবর আপনার শরীর ভালোতো?
–হ্যাঁ শরীর ভালো। কিন্তু মন ভালো নেই। কী করে সবুজ রাজার দখল থেকে রাজ্য উদ্ধার করবো তাই ভাবছি। রাজা বললেন। কথাটা শুনে ফ্রান্সিস উঠে বসল। আস্তে আস্তে রাজার কাছে গেল। বলল–মান্যবর, আপনি দুশ্চিন্তা করবেন না। আপনার জাহাজ সমুদ্রের যে ঘাটে আছে আমার বন্ধু সেখানে যাবে। আমাদের জাহাজ থেকে আমার সব বন্ধুদের এখানে নিয়ে আসবে। আমরা কৌশলে লড়াই করবো যাতে অল্প সৈন্য নিয়েও যুদ্ধে জেতা যায়।
–আমি তো কোন আশা দেখছি না। রাজা বললেন।
–নিরাশ হবেন না। আমি ফ্রান্সিস–প্রতিজ্ঞা করছি আপনার রাজত্ব আপনাকে ফিরিয়ে দেব। রাজা কিছু বললেন না।
ফ্রান্সিস শাঙ্কোদের কাছে ফিরে এল। বলল-শাঙ্কো সিনাত্রা–আমি স্থির করেছি এই মহানুভব রাজা আসারিয়ার হয়ে আমরা লড়াই করবো। শাঙ্কো তুমি আজকেই সন্ধ্যেবেলা সমুদ্রতীরে যাও। কাল রাতে বন্ধুদের নিয়ে এখানে চলে এসো।
–একটা কথা ফ্রান্সিস-শাঙ্কো বলল–সেনাপতির যে সৈন্যদের দেখছি তারা তো সংখ্যায় বেশি নয়। আমাদের বন্ধুরা এসে যোগ দিলেও সংখ্যাটা তো তেমন বাড়বে না।
-সবুজ রাজার সৈন্যদের ওপর আমরা চোরাগোপ্তা আক্রমণ চালাবো। বুদ্ধি করে ওদের হার মানাবো। সামনা সামনি লড়াইতে যাবো না। ফ্রান্সিস বলল।
–এটা মন্দ বলোনি। ওভাবেই লড়াই চালাতে হবে। শাঙ্কো বলল।
সকালের খাবার দেওয়া হল। গাছের লম্বাটে পাতার ওপর পোড়া রুটি আর আনাজের ঝোল। ক্ষুধার্ত ফ্রান্সিসরা পেট পুরে খেল। রাজা আসারিয়া এমন খাবারে অভ্যস্ত নয়। তবু বিনা দ্বিধায় খেলেন।
সারাদিন কাটল। গতরাতে ভালো ঘুম হয় নি। ফ্রান্সিসরা দুপুরে ঘুমিয়ে নিল।
সন্ধ্যের পরে পরেই যা রান্না হয়েছিল শাঙ্কো সেইটুকুই খেয়ে নিল। কিছুক্ষণ ছোরাটা পাথরে ঘষে ধার করল।
একটু রাত হতেই গুহা থেকে বেরিয়ে এল। রাজা আসারিয়া বলে দিয়েছিলেন বনের মধ্যে দিয়ে দক্ষিণমুখো গেলেই সমুদ্রতীরে যাওয়ার রাস্তাটা পাওয়া যাবে। শাঙ্কো অন্ধকার বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দিক ঠিক করে চলল।
যেতে যেতে রাত শেষ হয়ে এল। ভোর হবার কিছু আগে শাঙ্কো সমুদ্রের ধারে পৌঁছল। দেখল ওদের জাহাজের পাশেই রাজার জাহাজটা নোঙর ফেলে আছে।
সমুদ্রতীরের বালিয়াড়িতে তুলে রাখা নৌকোটা টেনে নিয়ে জলে ভাসাল। দাঁড় টেনে চলল। অস্পষ্ট চাঁদের আলো। শাঙ্কো আস্তে আস্তে নৌকোটা জাহাজের গায়ে ভেড়াল। দড়ি দিয়ে নৌকোটা বাঁধল। তারপর হালের দড়িদড়া ধরে জাহাজের ডেক এ উঠে এল।
কয়েকজন বন্ধু ডেক-এ ঘুমিয়ে ছিল। তাদের মধ্যে বিস্কো ছিল। শাঙ্কো ঠেলা দিয়ে বিস্কোর ঘুম ভাঙাল। বিস্কো ধড়ফড় করে উঠে বসল। আবছা আলোয় শাঙ্কোকে চিনে ফেলে গলা চড়িয়ে বলে উঠল–আরে শাঙ্কো। চারদিকে তাকিয়ে বলল–ফ্রান্সিস, সিনাত্রা? বিস্কোর কথা শুনে অন্যদেরও ঘুম ভেঙে গেছে তখন। ওরাও ফ্রান্সিসদের কথা জিজ্ঞেস করল।
–ফ্রান্সিস সিনাত্রা ভালো আছে। এখন হ্যারিকে ডাকো। কথা আছে। শাঙ্কো কথাটা বলে ক্লান্ত দেহে ডেক-এ বসে পড়ল। বিস্কো ছুটল হ্যারিকে ডাকতে।
একটু পরেই হ্যারি ছুটতে ছুটতে এল। বলল শাঙ্কো।
–সব বলছি। শাঙ্কো হাতের চেটো তুলে বলল। ততক্ষণে মারিয়াও ছুটে এসেছে। অন্য বন্ধুরা আসতে লাগল।
তখন শাঙ্কো সব ঘটনা বলল। তারপর বলল–
–তোমরা সন্ধ্যেবেলা সবাই তৈরী হয়ে নেবে। একটু রাতে অন্ধকারে আমরা সেই পাহাড়ে যাবো। বনের মধ্যে দিয়ে।
–আবার লড়াই হবে? মারিয়া মৃদুস্বরে বলল।
–হ্যাঁ। সবুজ রাজা নৃশংস। তাকে তাড়াতেই হবে। শুনলেন তো সবুজ রাজা আমাদের ফাঁসি দিতে চেয়েছে। রাজা আসারিয়া একজন উদার মনের রাজা। তাঁকে নির্মম ভাবে হত্যা করতে চেয়েছিল। আমরা এসব পরিকল্পনা বানচাল করে দিয়েছি। শাঙ্কো বলল।
ভাইকিং বন্ধুদের মধ্যে সাড়া পড়ে গেল। শুয়ে বসে দিন কাটানো ওদের ধাঁতে নেই। লড়াইয়ের মধ্যে থাকতেই ওরা ভালবাসে। বীর জাতির এটাই লক্ষণ।
সন্ধ্যের পরই খেয়ে নিল সবাই। একটু রাত হতেই সবাই তরোয়াল কোমরে খুঁজে বেরিয়ে ডেক উঠে এল।
দু’টো নৌকাতে চড়ে দফায় দফায় ওরা সমুদ্রতীরে উঠল। তারপর রাস্তা ধরে চলল। হাঁটতে হাঁটতে শাঙ্কো চাপা স্বরে বলল-এই রাস্তাটা তাড়াতাড়ি পার হতে হবে। পা চালাও। সবাই দ্রুত হাঁটতে লাগল। চাঁদের আলো উজ্জ্বল নয়। তবে চার পাশ মোটামুটি দেখা যাচ্ছিল।
এবার রাস্তার ধারেই বনভূমির শুরু হল। শাঙ্কোর পিছনে পিছনে সবাই বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। অন্ধকার বনের মধ্যে দিয়ে চলা শুরু হল।
এক সময়ে ওরা রাজা আসারিয়ার সেই ঘরের কাছে এল। এবার ঘর পার হয়ে উত্তর মুখে পাহাড়ের দিকে চলল। পাহাড়ের তলায় যখন পৌঁছল তখনও ভোর হয়নি। সবাই কম বেশি হাঁপাচ্ছে তখন।
গুহামুখের কাছে পৌঁছাল সবাই। গুহামুখের পাথরের চাইয়ের ফাঁকে মুখ রেখে শাঙ্কো বেশ জোরেই ডাকল–ফ্রান্সিস? নানা চিন্তায় ফ্রান্সিসের ঘুম প্রায় হয়-ই নি। প্রথম ডাকটাই ওর কানে গেল। ও উঠে পড়ল। কয়েকজন সৈন্যকে ঠেলা দিয়ে তুলল। ওদের নিয়ে গুহামুখে পাথরের চাই সরাল। ভাইকিং বন্ধুরা একে একে গুহার মধ্যে ঢুকল।
