বনে ছাড়া ছাড়া গাছ। ছুটতে সুবিধে হচ্ছিল। গুঁড়িতে পা রেখে ঘন ঝোঁপঝাড় ঠেলে সরিয়ে চলল সবাই।
এবার ফ্রান্সিস থামল। সবাই দাঁড়িয়ে পড়ল। কম বেশি সবাই হাঁপাচ্ছে তখন। ফ্রান্সিস হাঁপাতে হাঁপাতে বলল–মান্যবর রাজা এখানে বা পাহাড়ে কোথাও আশ্রয় নেবার মত জায়গা আছে?
–আছে। মনে হয় সেনাপতি বাকি সৈন্যদের নিয়ে সেখানেই আশ্রয় নিয়েছে। রাজা বললেন।
-কোথায় সেটা? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—একটা বড় ঘর এই বনে তৈরী করিয়েছিলাম। আমার ঈশ্বরচিন্তার ঘর। মাঝে মাঝে রাজবাড়ি ছেড়ে এখানে এসে থাকি। ঈশরের ধ্যান করি। কিছুদিন থেকে আবার রাজবাড়িতে ফিরে যাই। রাজা বললেন।
–ঘরটা খুঁজে পাবেন? ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। কেন জানি না সেই ঘরের চারপাশের গাছগুলো মরে গেছে। সেই জায়গাটা দেখলেই বুঝতে পারবো। রাজা বললেন।
–তাহলে চলুন। খুঁজে দেখা যাক। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই চলল এবার। রাজা হাত তুলে ডানদিক দেখালেন। ডানদিকে চলল সবাই।
হঠাৎ দেখা গেল কিছু মরা গাছ। তখনই অস্পষ্ট দেখা গেল একটা বড় টানা ঘর।
সবাই ঘরটার দরজার কাছে এল। ঘরে ঢোকার দরজাটা হাঁ করে খোলা। সবাই ঘরটায় ঢুকল। অন্ধকার ভাবটা চোখে সয়ে আসতে দেখা গেল ঘরের একপাশে একটা বড় বিছানা আর কয়েকটা কাঠের আসন। ঘরে কেউ নেই।
-বোঝা যাচ্ছে সেনাপতি এখানে আশ্রয় নেন নি। ফ্রান্সিস বলল। ফ্রান্সিস চারদিকে তাকাতে তাকাতে বলল–সেনাপতি ঠিক কাজই করেছেন। এখানে আশ্রয় নিলে সহজেই ধরা পড়তেন। সবুজ রাজা নিশ্চয়ই সেনাপতি ও সৈন্যদের খোঁজে এখানে তার সৈন্য পাঠাবে। এই বাড়িটার চারপাশে মরা গাছের বন। সহজেই ঘরটা নজরে পড়ত। এখন সেনাপতি অন্যত্র কোথাও আশ্রয় নিয়েছেন সেটা আপনি বুঝতে পারছেন? ফ্রান্সিস রাজা আসিরিয়াকে জিজ্ঞেস করল।
–না। আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। রাজা মাথা নেড়ে বললেন।
যাক গে। রাত আর বেশি বাকি নেই। এখানেই বাকি রাতটা কাটাই। কাল সকালে সেনাপতির খোঁজ করবো। ফ্রান্সিস বলল।
ফ্রান্সিস একটা চেয়ারে বসতে বসতে বলল–সবাই যতটা পারো ঘুমিয়ে নাও। রক্ষীকে বলল–তোমার শরীর ভালো নেই। তুমি বিছানায় শোও। রাজাকে বলল বিছানা বড়। আপনিও বিছানায় শোন। পরিশ্রান্ত রাজা বিছানায় শুয়ে পড়লেন। রক্ষীও শুয়ে পড়ল। শাঙ্কো আর সিনাত্রা চেয়ার-টেবিলে বসল। একটু পরেই ঘুমিয়ে পড়ল। ওরা এভাবে ঘুমুতে অভ্যস্ত। ফ্রান্সিসও একটা চেয়ার বসল। চোখ বন্ধ করল। কিন্তু ঘুমোল না।
পাখির কিচিমিচির ডাকে ঘুম ভাঙল সকলের। ফ্রান্সিস বলল–এখনই চলো সব। সেনাপতি আর সৈন্যদের খুঁজে বার করতে হবে। ফ্রান্সিস রাজাকে জিজ্ঞেস করল– আচ্ছা ঐ দুটো পাহাড়ের কোথাও গুহাটুহা আছে?
–আমি ঠিক বলতে পারছি না। রাজা বললেন।
–ঠিক আছে। চলুন খুঁজে দেখি। ফ্রান্সিস বলল।
সবাই বনের মধ্যে দিয়ে উত্তরমুখো চলল। কিছু পরেই বন শেষ। সামনে দুটো পাহাড়। ডানদিকের পাহাড়টা সবুজ ঘাসে ঢাকা। বাঁদিকের পাহাড়টার অন্যরূপ। পাহাড়টায় গাছ নেই, ঘাস নেই। রুক্ষ ধূসর রঙের পাহাড়। দুটো পাহাড়ের বৈপরীত্য লক্ষ্য করল ফ্রান্সিস। বুঝল গুহা থাকলে বাঁদিকের রুক্ষ পাহাড়টাতেই আছে। ডানদিকের পাহাড়ে গুহাটুহা থাকার সম্ভাবনা কম।
ও বাঁদিকের পাহাড়টার দিকে চলল। কিছুদূর যেতেই সামনে দুই পাহাড়ের মাঝখানে উপত্যকামত। ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে উপত্যকটায় নামল সবাই। চারদিকে তাকিয়ে সবাই গুহামুখ খুঁজতে লাগল। কিন্তু কোন গুহামুখ দেখল না।
–মান্যবর রাজা–ফ্রান্সিস রাজাকে বলল–আপনি জোর গলায় সেনাপতিকে ডাকুন। রাজা দুই হাতের তালু গোল করে ডাকলেন
–সেনাপতি–কোথায় আছেন? পাহাড়ে প্রতিধ্বনিত হল–
-এন-এন-এন। কিছুক্ষণ রাজা অপেক্ষা করলেন। পরে আবার ডাকলেন। প্রতিধ্বনিত হল এন-এন-এন। কিন্তু সেনাপতির কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
–চলুন–পাহাড়ের ওপাশে যাই। ফ্রান্সিস বলল। সবাই পাহাড়টা ঘুরে ওপাশে গেল। রাজা আবার ডাকলেন। কিন্তু সেনাপতির কোন সাড়া নেই।
আরো কিছুটা গিয়ে এবার ফ্রান্সিস ডাকল
–সেনাপতি মান্যবর রাজা এসেছেন। বারকয়েক ডাকতে ফ্রান্সিস লক্ষ্য করল কিছুটা উঁচুতে একটা পাথরের চাই নড়ছে। ফ্রান্সিস বলে উঠল–ঐখানে গুহা আছে। চলুন।
সবাই পাথরের ওপর পা রেখে রেখে সেই পাথরের চাইটার সামনে এল। ততক্ষণে পাথরের চাইটা অনেকটা সরে গেছে। গুহার মুখ দিয়ে সেনাপতি বেরিয়ে এল। সঙ্গে দুজন সৈন্যও বেরিয়ে এল।
সেনাপতি এগিয়ে এসে বলল–আসুন মান্যবর রাজা–আমরা। এই গুহাতেই আশ্রয় নিয়েছি! শুনলাম আপনি বন্দী হয়েছিলেন।
–হ্যাঁ। তারপর ফ্রান্সিসদের দেখিয়ে বললেন–এদের জন্যে পালিয়ে আসতে পেরেছি।
সবাই গুহার মধ্যে ঢুকল। কয়েকজন সৈন্য মিলে পাথরের চাইটা দিয়ে গুহামুখ আটকে দিল। অবশ্য একেবারে বন্ধ করে দিল না। কিছুটা ফাঁক রাখল বাতাস চলাচলের জন্যে।
গুহার মধ্যে মশাল জ্বলছে। মশালের আলোয় দেখা গেল বেশ কিছু সৈন্য গুহার পাথুরে মেঝেয় শুয়ে বসে আছে। গুহার মাঝখানে তরোয়াল-বর্শা স্কুপ করে রাখা। একপাশে রান্নার জায়গা।
একটা মোটা কাপড় গুহার মেঝেয় দেয়াল ঘেঁষে পাতা ছিল। সেনাপতি রাজাকে সেখানে নিয়ে গিয়ে বসাল। রাজা চুপ করে বসে রইলেন।
