রাজা আসারিয়ার হয়ে আমার সৈন্যদের সঙ্গে লড়াই করেছো তোমরা। সবুজ রাজা বলল।
–আমরা অতিথিশালায় ছিলাম। একমুহূর্তের জন্যেও ঘর ছেড়ে বেরোয় নি। ফ্রান্সিস বলল।
মিথ্যে কথা। সবুজ রাজা গলায় জোর দিয়ে বলল।
–আপনার সেনাপতিকে জিজ্ঞেস করুন। উনি আমাদের লড়াইয়ের সময় দেখেছেন কিনা। ফান্সিস বলল। সবুজ রাজা সেনাপতির দিকে তাকাল। সেনাপতি উঠে দাঁড়িয়ে বললনা মান্যবর রাজা–আমি ওদের লড়াই করতে দেখিনি।
যাকগে–তোমাদের কালকেই ফাঁসি দেওয়া হবে।
কারণটা জানতে চাইছি। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল।
-তোমাদের সাহস তো কম নয়। আমার মুখের ওপর কথা বলছো। বেশ গলা চড়িয়ে রাজা বলল। শাঙ্কো আবার মৃদুস্বরে ডাকল–ফ্রান্সিস। ফ্রান্সিস চুপ করে রইল। এবার রাজা সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। বলল রাজা আসারিয়া আর এই তিন জনকে হত্যার আদেশ দিলাম।
–রানির প্রতি কী সাজা হল? রাজা আসারিয়া বললেন।
–রানি অন্তঃপুরে বন্দিনী হয়ে থাকবে। কথাটা বলে রাজা গট গট করে চলে গেল।
চার পাঁচজন সৈন্য এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের পাহারা দিয়ে অতিথিশালায় নিয়ে এল। ঘরের বাইরে দু’জন প্রহরী দাঁড়াল। ঘরে ঢুকে ফ্রান্সিস দেখল রক্ষী শুয়ে গোঙাচ্ছে। শাঙ্কো ওর কাছে এল। বলল–কী হয়েছে তোমার?
–পালিয়ে ছিলাম। কিন্তু সবুজ রাজার সৈন্যদের হাতে ধরা পড়ে গিয়েছিলাম। আমাকে মেরেছে। তবে একেবারে মেরে ফেলেনি। রক্ষী আস্তে আস্তে গোঙাতে লাগল। রাজা আর ফ্রান্সিসরা বিছানায় বসল।
–কী দেখলে বাইরে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
সাংঘাতিক ব্যাপার। সবুজ রাজার সৈন্যদের অত্যাচার চরমে উঠছে। স্ত্রীলোক শিশুরা–কেউ বাদ যাচ্ছে না। নির্বিবাদে সবাইকে হত্যা করছে। যারা কোনরকম বেঁচেছে তারা উত্তরে জঙ্গলে পালিয়ে গেছে। সবুজ রাজার সৈন্যরা এখন হত্যা করার জন্যে মানুষ খুঁজে বেড়াচ্ছে। কপাল জোরে আমি ছুটে পালিয়ে এসেছি। রক্ষী বলল।
সবুজ রাজার মত ওর সৈন্যরাও নৃশংস। রাজা আসারিয়া মৃদুস্বরে বললেন। শাঙ্কো ভাবল সুযোগ পেলে এই প্রহরীদের হত্যা করবে।
ফাঁসির কথা শুনে সিনাত্রা খুবই ভেঙে পড়ল। একটু কাঁদো কাদো গলায় বলল ফ্রান্সিস– আমাদের বাঁচার কোন উপায় নেই।
–কিছু ভেবো না। অত হতাশ হয়ে পড়লে কোন কাজই হয় না। শাঙ্কো বলল।
–আমরা ফাঁসির হাত থেকে বাঁচবো? সিনাত্রার কণ্ঠে সংশয়।
-শোন সিনাত্রা–ফ্রান্সিস বলল–মনে জোর রাখো। শুধু শরীরের জোরে সব কাজ হয় না। পালানোর ছক আমার কষা হয়ে গেছে। শুধু নরহত্যা আমি চাই না। সেটাই করতে হবে। বাধ্য হয়ে। রাজা আসারিয়া ফ্রান্সিসের কথা শুনলেন। আস্তে বললেন–তাহলে আমরা বাঁচবো?
–হ্যাঁ মান্যবর রাজা। ঠিক সময়ের জন্যে অপেক্ষা করুন। তবে সব কাজ। আমাদের যতদ্রুত সম্ভব সারতে হবে। সবুজ রাজা আমাদের ফাঁসির আদেশ দিয়েছে। কালকেই কাজেই আজ রাতেই পালাতে হবে ফ্রান্সিস বলল। রাজা ফ্রান্সিসের কথা। ঠিক বুঝলেন না। তবে আর কোন কথা বললেন না।
রাত হল। একটু রাতে ফ্রান্সিসদের খাবার এল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল–কেউ। ঘুমবে না। মান্যবর রাজা আপনিও ঘুমুবেন না।
-বেশ। রাজা মৃদুস্বরে বললেন।
একসময়ে ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। খোলা দরজার কাছে গিয়ে বলল–একবার ঘরে এসো তো?
–কেন? কী হল? প্রহরীটি জিজ্ঞেস করল।
–মশালগুলো নিভিয়ে দিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? বেশ তো আলো পাচ্ছো। প্রহরীটি বলল।
আলো চোখে লাগছে। ঘুম আসছে না। ফ্রান্সিস বলল।
-বেশ। যেমনটি চাও। প্রহরটি বলল। তারপর তরোয়াল কোমরে খুঁজে ঘরের মধ্যে ঢুকল। উঁচু হয়ে হাত বাড়িয়ে মশাল দুটো নিভিয়ে দিল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে ডাকলশাঙ্কো। শাঙ্কো এক লাফে উঠে দাঁড়াল। বুকের কাছে পোশাকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে ছোরাটা বের করল। তারপর অন্ধকারে নিশানা ঠিক করে প্রহরীটির বুকে ছোরা বিঁধিয়ে দিল। প্রহরীটির মুখ থেকে কোন শব্দই বেরুলো না। ও বিছানার ওপর। পড়ে যাচ্ছিল। শাঙ্কো ওকে চেপে ধরে বিছানার ওপর আস্তে শুয়ে দিল। কোন কোন শব্দ হল না।
ততক্ষণে ফ্রান্সিস বাইরে চলে এসেছে। অন্য প্রহরীটি কিছু বোঝার আগেই ফ্রান্সিস ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। প্রহরীটি চিৎ হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। হাত থেকে তরোয়াল ছিটকে গেল। ফ্রান্সিস নিচু হয়ে দ্রুত তরোয়াল তুলে প্রহরিটির বুকে বসিয়ে দিল। একটা মৃদু ও’ শব্দ ওর মুখ থেকে বেরিয়ে এল। দু’একবার এপাশ ওপাশ করে প্রহরীটি স্থির হয়ে গেল।
শাঙ্কো চাপাস্বরে বলল–বাইরের আলোটা? ফ্রান্সিস বলল–ওটা থাক। নইলে সৈন্যদের সন্দেহ হবে। মান্যবর রাজা সিনাত্রা–বাইরে আসুন সব। ঐ জঙ্গলের দিকে ছুটুন সবাই।
বাইরে চাঁদের আলো অনুজ্জ্বল। তবে আবছা সবকিছু দেখা যাচ্ছে।
রাজবাড়ির আড়ালে আড়ালে ফ্রান্সিসের পেছনে পেছনে ছুটল সবাই। রাজ বাড়ির আড়াল ছাড়িয়ে রাস্তায় নামল সবাই। এইভাবে পালানো যাবে রাজা আসারিয়া ভাবতেও পারেন নি। সেটাই ঘটল। রাজা মনে মনে ফ্রান্সিসের বুদ্ধির প্রশংসা করলেন।
রাস্তার ডানদিকেই বনভূমির শুরু। সবাই রাস্তা পার হয়ে বনের মধ্যে ঢুকে পড়ল। এতক্ষণে আড়াল পাওয়া গেল। দূরে রাজবাড়ির কাছে হৈ হল্লা ডাকাডাকি শোনা গেল। ওরা বুঝেছে বন্দীরা পালিয়েছে। তাদের সঙ্গে রাজাও পালিয়েছেন।
