–দেখো চেষ্টা করে। রাজা একটু হতাশার সুরেই বললেন।
–আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন আপনাকে মুক্ত করবই। ফ্রান্সিস বলল।
রাজা আসারিয়া আর কিছু বললেন না।
সকালের খাবার দিয়ে গেল প্রহরীর একজন। রুটি আর আনাজপাতির ঝোল। এটা রাজার খাদ্য নয়। বন্দীর খাদ্য। কিন্তু রাজা নিঃশব্দে খেলেন। অন্য খাবার চাইলেন না।
একটু পরে একজন বেশ মোটা লোক এল। তার কোমরে তরোয়াল ঝুলছে। গায়ে সবুজ ঢোলা হাতা জামা। প্রহরীরা একটু মাথা নুইয়ে সম্মান জানাল। বোঝা গেল লোকটি সেনাপতি।
ঘরে ঢুকে সেনাপতি, বলল–সবাই চলুন। রাজ দরবারে।
রাজাকে নিয়ে ফ্রান্সিসের ঘরে থেকে বেরিয়ে এল। প্রহরীদের পাহারায় রাজবাড়ির সামনে এল সবাই। বড় দরজাটা দিয়ে ঢুকল। দুটো ঘর পেরিয়ে রাজসভাকক্ষ। দুটো কাঠের আসন পাতা। তাতে গাঢ় লাল রঙের মোটা কাপড় পাতা। আসনে সবুজ রাজা বসা। দুপাশের আসনের একটায় সেনাপতি গিয়ে বসল। অন্যটা একজন বৃদ্ধ বসে। তিনি বোধহয় মন্ত্রী। সবুজ রাজার ঝকঝকে সবুজ রাজপোশাক। সন্দেহ নেই। কাপড়টা বেশ দামি। একটু ভারি গলায় রাজা বলল–এসো–আমাদের প্রিয় বন্ধু রাজা আসারিয়া। রাজা আসারিয়া কোন কথা বললেন না। চুপ করে দাঁড়ালেন। সবুজ রাজা তাকে বসতেও দিল না।
সবুজ রাজা মন্ত্রীর দিকে তাকাল। বলল–মন্ত্রী মশাই বলুন তো রাজা আসারিয়া কী শাস্তি দেওয়া যায়।
–ফাঁসি দিন। মন্ত্রী মৃদু স্বরে বলল।
–ওটা তো অল্পক্ষণের শাস্তি। আমি চাই একটু কষ্ট ভোগ করে মরুক। বেশ তরোয়াল দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে বর্শা দিয়ে শরীরটা এফেঁড় ওফোঁড় করে কথাটা শেষ না করে সবুজ রাজা হা হা করে হেসে উঠল। ফ্রান্সিস ভাবল রাজা আসারিয়া ঠিকই বলেছিলেন সবুজ রাজা নৃশংস। রাজা আসারিয়া কোন কথা বললেন না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
যাক গে–যে কথা বলছিলাম। তোমার এক পূর্বপুরুষ রাজা সামেনা জলদস্যু ছিল। তাই কিনা? সবুজ রাজা বলল।
–হ্যাঁ। উনি আমাদের বংশের কলঙ্ক। রাজা বললেন।
সে যাক। কিন্তু জলদস্যুতা করে প্রচুর ধনসম্পদের মালিক হয়েছিল। জনশ্রুতি বলে সে এই রাজ্যেরই পাতালঘরে তার ধন সম্পদ গোপনে সে রেখে গেছে। সবুজ রাজা বলল।
-হ্যাঁ আমরাও শুনেছি। রাজা আসারিয়া বলল।
–সেই ধনসম্পদ কোথায় আছে? সবুজ রাজা প্রশ্ন করলেন।
–আমি জানি না। রাজা আসারিয়া বললেন।
–তুমি খোঁজখবর করনি? সবুজ রাজা জানতে চাইল।
–না। প্রয়োজন মনে করিনি। রাজা বললেন।
–কেন? সবুজ রাজা একটু ক্রুদ্ধ হয়েই বলল।
-ওটা অভিশাপ্ত ধনসম্পদ। নিরীহ জাহাজযাত্রীদের জাহাজ লুঠ করে আনা ধন সম্পদের প্রতি আমার কোন লোভ নেই। রাজা আসারিয়া দৃঢ়স্বরে বললেন।
কিন্তু আমার আছে। তোমার রাজত্ব এই জন্যেই বারবারজয় করার চেষ্টা করেছি। এবার জয়ী হয়েছি। এখন এই রাজ্য আমার। আমি এখন এই রাজ্যের রাজা। তোমার সিংহাসনে বসেআছি। আমি সেই গুপ্ত ধনসম্পদউদ্ধার করতে চাই। সবুজ রাজা বলল।
-বেশ। চেষ্টা করুন। রাজা আসারিয়া বললেন।
–কিন্তু তোমার সাহায্য চাই। সবুজ রাজা বলল।
–আমি আপনাকে কীভাবে সাহায্য করব? কারণ আমি সেই ধনসম্পদ সম্বন্ধে নিজেই কিছু জানি না। রাজা আসারিয়া বললেন।
–অসম্ভব। নিশ্চয়ই জানো। সবুজ রাজা গলায় জোর দিয়ে বলল।
বললাম তো জানি না। শুধু জানি একটা পাতাল ঘর আছে।
–কোথায় সেই পাতাল ঘর? সবুজ রাজা প্রশ্ন ছুঁড়ল।
–আমি কিছুই জানি না। রাজা আসারিয়া মাথা নেড়ে বললেন।
তুমি আমার কাছে সত্য কথাটা সুকোচ্ছো।
তরোয়াল আর বর্শার খোঁচা খেলে সব সত্যি কথা বেরিয়ে আসবে। সবুজ রাজা বলল।
রাজা আসারিয়া কোন কথা বললেন। সবুজ রাজা সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলে উঠল–এখনও সত্যি কথাটা বলল।
এখন তো এই রাজ্য আপনার। সন্ধান করুন সেই গুপ্ত ধন ভান্ডারের। সবুজ রাজা আবার চেঁচিয়ে বলে উঠল-হা হা। সারা রাজ্য আমি তোলপাড় করে ফেলবো। ঐ ধনভান্ডার আমার চাই।
শাঙ্কো চাপা গলায় বলল–ফ্রান্সিস চেষ্টা করবে? ফ্রান্সিস বলল–এই জঘন্য চরিত্রের লোকটার জন্য আমি এক আঙ্গুলও নাড়বো না। জাহান্নামে যাক। ফ্রান্সিস আর শাঙ্কো দেশীয় ভাষায় কথা বলছিল। সবুজ রাজা এবার ফ্রান্সিসদের দিকে তাকিয়ে বলল–কী বলাবলি করছিলে তোমরা?
-বলছিলাম–আপনি মহান রাজা। ফ্রান্সিস বলল।
-রসিকতা? সবুজ রাজা হো হো করে হেসে উঠল। হঠাৎ মুখ গম্ভীর করে বলল –জানো–এই মূহুর্তে তোমার মুণ্ডু নামিয়ে দিতে পারি।
–আমি নিরস্ত্র। কাজেই–ফ্রান্সিস আর কথাটা শেষ করল না।
–যদি তোমাকে তরোয়াল দেওয়া হয়। সবুজ রাজা বলল।
–তাহলে মুণ্ডু বাঁচাবার শেষ চেষ্টা করতাম। ফ্রান্সিস বলল। শাঙ্কো মৃদুস্বরে ডাকল–ফ্রান্সিস। কিন্তু ফ্রান্সিস সবুজ রাজাকে সহ্য করতে পারছিল না। এবার সবুজ রাজা বলল–তোমরা বিদেশী?
–হ্যাঁ–আমরা ভাইকিং। শাঙ্কো বলল।
–এখানে কী করে এলে? সবুজ জিজ্ঞেস করল।
জাহাজে চড়ে। ফ্রান্সিস বলল।
–শুনেছি তোমরা সমুদ্রে জলদসুতা কর। সবুজ রাজা বলল।
–একথাটা অনেক জায়গায় অনেকবার শুনেছি আমরা। কথাটা গায়ে মাখি না। শাঙ্কো বলল।
–তোমাদের ফাঁসিতে লটকালে কেমন হবে? সবুজ রাজা একটু হেসে বলল।
–আপনি জয়ী রাজা। আমাদের নিয়ে যা খুশি করতে পারেন। কিন্তু জানতে চাইছি আমরা কী অপরাধে অপরাধী? ফ্রান্সিস বলল।
