দর্শকদের মধ্যে চিৎকার চাঁচামেচি শুরু হয়ে গেল। সবাই যে যার বাড়ির দিকে। ছুটল। বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হল। কিছু দর্শক ভিড়ের চাপে মাটিতে পড়ে গেল। আহত হল। ফ্রান্সিস বলল–লড়াই শুরু হবে। চলো অতিথি শালায় ফিরে যাই।
অতিথিশালায় ওরা ফিরে আসছে তখনই চাঁদের আলোয় দেখল পশ্চিমদিকের রাস্তায় লড়াই শুরু হয়েছে। তরোয়ালের ঠোকাঠুকি আর্তনাদ গোঙানি শোনা যাচ্ছে।
ফ্রান্সিসরা অতিথিশালায় ঢুকল। হ্যারিও ওদের পেছনে পেছনে গেল। বিছানায় বসতে বসতে শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস এখন কী করবে?
–এখনই বাইরের রাস্তায় গেলে বিপদে পড়বো। যা বুঝতে পারছি এখন বটতলার কাছাকাছি লড়াই চলছে। নিরস্ত্র অবস্থায় ওদিকে গেলে মারা যেতে পারি। এখানেই অপেক্ষা করি। দেখি লড়াইয়ে কারা জেতে। ফ্রান্সিস বলল।
বাইরে তুমুল লড়াই চলছে তখন। ফ্রান্সিসরা চুপ করে বসে রইল। বাইরে চিৎকার আর্তনাদ গোঙানি চলল।
প্রায় ঘন্টাখানেক লড়াই চলল। আস্তে আস্তে চারিদিক শান্ত হয়ে এল। দ্বারী ঘরে ঢুকে একটু দূরে বসে ছিল। ফ্রান্সিসরা দ্বারীকে বলল–দেখ তো ভাই লড়াই থামল কিনা। দ্বারী দরজার কাছে গেল। চারিদিক ভালো করে দেখে ফিরে এল। মাথা নেড়ে বলল–আমরা হেরে গেছি। সবুজ রাজার সৈন্যরা দুটো বাড়িতে আগুন লাগিয়েছে। তখন সত্যি মানুষদের ভয়ার্ত চিৎকার ছোটাছুটির শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
তুমি ভাই পালিয়ে যাও। ফ্রান্সিস বলল।
–না। সেনাপতি আপনাদের দেখাশুনোর জন্যে রেখে গেছেন। আমি হুকুম মানবো। ফ্রান্সিস আর কিছুই বলল না। ফ্রান্সিসরা ঘুমের আশা ছাড়ল। তিনজনে সারারাত জেগে রইল।
তখন রাত শেষ হয়ে এসেছে। চারদিক শান্ত। তার মধ্যে মাঝে মাঝে সবুজ রাজার সৈন্যদের জয়ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
ভোর হল। হঠাৎ বাইরে পদশব্দ শোনা গেল। ফ্রান্সিস ভাবল–আবার বন্দী জীবন শুরু হবে। হয়তো সবুজ রাজার সৈন্যরা আসছে। ফ্রান্সিসের অনুমানই ঠিক হল। রাজা আসারিয়া ঘরে ঢুকলেন। পেছনে পাঁচজন খোলা তরোয়াল হাতে সবুজ পোশাক পরা সবুজ রাজার সৈন্য। রাজাকে ওরা ঠেলে ঘরে ঢুকিয়ে দিল। তারপর দু’জন যোদ্ধা খোলা তরোয়াল হাতে দরজার সামনে দাঁড়াল। একজন যোদ্ধা ফ্রান্সিসদের দেখে একটু অবাকই হল। বলল–তোমরা কে?
–আমরা বিদেশী ভাইকিং। সিনাত্রা বলল।
–ঠিক আছে। সকালে তোমাদের রাজার কাছে নিয়ে যাওয়া হবে।
–বেশ। সিনাত্রা বলল। যোদ্ধাটি চলে গেল।
ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–মান্যবর রাজা আপনি এখানে বসুন। রাজা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসল। রাজারমুখ শুকনো। মাথার চুল উসূকোখুসকো। বোঝাই যাচ্ছে সারারাত ঘুমোন নি। ফ্রান্সিস বলল–আপনি ভাল আছেন তো?
–শরীর ঠিক আছে। কিন্তু হেরে গেলাম। মন ভালো নেই। রাজা বললেন।
–রানি কোথায়? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
—অন্দর মহলে—নজর বন্দী। রাজা বললেন।
–সেনাপতি? ফ্রান্সিস বলল।
–জীবিত সৈন্যদের নিয়ে আমি তাকে পালাতে বলেছি। আমি আর রক্তপাত চাইনি। রাজা বললেন।
–কিন্তু এই অতিথিশালায় আপনাকে বন্দী করল কেন? শাঙ্কো বলল। রাজা ম্লান হেসে বললেন–আমার রাজত্বে কয়েদঘর নেই। আমি মানুষের সততায় বিশ্বাস করি। ফ্রান্সিস রাজার প্রতি গভীর শ্রদ্ধাবোধ করল। এমন একজন উদার মনের মানুষ আজ অসহায়।
–আপনি হেরে গেলন কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–আমার সৈন্যরা শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে চেয়েছিল। কিন্তু আমি আর মৃত্যু চাইনি। ওদের হার স্বীকার করতে বলেছি। আর বলেছি সেনাপতির সঙ্গে পালিয়ে যাও। সবুজ রাজাকে তো জানি। ওঁর মতো নৃশংস রাজা কাউকে বেঁচে থাকতে দিতে পারেন না। এই নিয়ে সবুজ রাজা চারবার আমার রাজত্ব আক্রমন করল। আমার বীর সৈন্যদের কাছে তিনবার হেরে ফিরে গেছেন। এবার আর ফেরাতে পারলাম না। একটু থেমে রাজা বলতে লাগলেন–আমার সৈন্য সংখ্যা কম ছিল। গতবছর এখানে অনাবৃষ্টি হয়ে গেছে। আমার অনেক বীর সৈন্য মারা গেছে। আসার সময় সমুদ্রতীরে একটা জাহাজ বোধহয় দেখেছো।
–হ্যাঁ। কিন্তু তাতে কোন লোক ছিল না। ফ্রান্সিস বলল।
–হ্যাঁ। জাহাজটা ওখানকার জেলেরাই দেখাশোনা করে। এই জাহাজে করে বিদেশ থেকে খাদ্য আনিয়েছিলাম। তাতে সবাইকে বাঁচাতে পারিনি। শুনলে অবাক হবে সবুজ রাজার দেশেও দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। তিনি তাঁর বহু প্রজাকে আমার রাজত্বে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন। আমি সেই ক্ষুধার্ত প্রজাদের ঠেলে ঐ রাজত্বে পাঠিয়ে দিইনি। বরং ওদের আশ্রয় দিয়েছি–খাদ্য দিয়েছি। একটু থেমে বললেন–ঐ যে বললাম আমার অনেক বীর সৈন্য সেই-দুভিক্ষে মারা গিয়েছিল। সবুজ রাজা জানতেন সেটা। বুদ্ধি করে তাই এবার আমাদের দেশ আক্রমন করলেন। কম সৈন্য নিয়ে লড়াই করে এবার আমরা হেরে গেলাম। আমার সৈন্যরা প্রানপণ লড়াই করেছে। আমি ওদের লড়াই চালাতে দিইনি। রাজা থামলেন।
বাকি সৈন্যদের নিয়ে সেনাপতি কোথায় গেছেন? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করলেন।
–ঐ উত্তরের পাহাড়ের দিকে। ঐদিকে কোথাও আশ্রয় নিয়েছে বোধহয়। রাজা বললেন।
–ঠিকআছে। ওখানে যাবো। সেনাপতি আর সৈন্যদের খুঁজে বার করব। ফ্রান্সিস বলল।
কিন্তু এখান থেকে পালাবে কী করে? রাজা বললেন।
–এখান থেকে অনেক কঠিন পাহারার মোকাবিলা করেছি আমরা আর পালিয়েছি। এই ঘরের তো দরজাই নেই। ফ্রান্সিস বলল।
