–একজন রক্ষী রেখে যাচ্ছি। ওকে যা বলবেন ও তাই করবে। আপনাদের সুবিধে অসুবিধের কথাও ওকেই বলবেন। সেনাপতি বলল। তারপর চলে গেল।
একটু পরে একজন রক্ষী এল। কিন্তু তার হাতে বর্শা তরোয়াল কিছু নেই। ফ্রান্সিস হেসে বলল–শাঙ্কো, এই প্রথম বোধহয় কোন প্রহরী ছাড়া ঘরে থাকছি। বরাবর তো তরোয়াল-বর্শা উঁচিয়ে রাখা প্রহরীদেরই দরজার সামনে দেখেছি। শাঙ্কোও হেসে বলল–তা যা বলেছো। এত আদর-যত্ন আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। ফ্রান্সিস আর। কিছু বলল না। বিছানায় বসে পড়ল। তারপর শুয়ে পড়ল। জোরে শ্বাস ছেড়ে বলল-একটু আরাম করে নেওয়া যাক। দেখাদেখি শাঙ্কোও শুয়ে পড়ল। শুধু সিনেত্রা শুয়ে পড়ল না। বসে রইল। রক্ষী ঘর দুটোয় মশাল জ্বেলে দিয়ে গেল। তারপর ঘরের কোনা থেকে একটা বড় মাটির হাঁড়িতে জল ভরে নিয়ে এল। কাঠের একটা গ্লাস রাখাই ছিল। ফ্রান্সিস উঠে গিয়ে জল খেয়ে এল।
রাত হল। বাইরে বটতলায় বোধহয় নাচগানের আসর বসার তোড়জোড় চলছে। লোকজনের হৈ-হট্টগোল এখন অনেকটা কম।
ফ্রান্সিসরা রাতের খাবার একটু আগেই খেয়ে নিল। রক্ষীটিই খাবার এনে দিল। বেশ মোটা গোল রুটি। একটু পোড়া হলেও খেতে ভালো। সামুদ্রিক মাছের ঝোল আর কী সব সজির ঝোল। খুবই সুস্বাদু খাবার। ফ্রান্সিসরা পেট পুরে খেল।
এবার নাচগানের আসরে যাওয়া।
ফ্রান্সিসরা তৈরি হয়ে ঘরের বাইরে এল। রক্ষী ওদের আসরের দিকে নিয়ে চলল।
বেদী ঘিরে অনেক লোক জড়ো হয়েছে। বেশি হৈ-চৈ হচ্ছে না। সবাই গভীর আগ্রহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। দেখা গেল বেদীর সামনেই দুটো কাঠের আসনে রাজা আসারিয়া ও রানি বসে আছেন।
ফ্রান্সিসরা একপাশে দাঁড়াল। তখনই দেখল পশ্চিমমুখো রাস্তার দুপাশে রাজার সৈন্যরা দল বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। চাঁদের আলো উজ্জ্বল। সেই আলোয় দেখল সেনাপতি ওখানে পায়চারী করছে। ফ্রান্সিস বুঝল এসব আত্মরক্ষার আয়োজন কেন। সবুজ রাজার দেশ ওদিকেই। শত্রুরাজা যে কোন সময় আক্রমণ করতে পারে। তাই অতন্দ্র পাহারার ব্যবস্থা। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে শাঙ্কো আর সিনাত্রাকে বলল সেকথা। সিনাত্রা বলল–যদি আক্রমণ হয় আর সবুজ রাজা জিতে যায় তাহলে আমাদের। কপালে ভোগান্তি আছে। শাঙ্কোও মাথা নেড়ে কথাটা সমর্থন করল।
অল্পক্ষণের মধ্যেই বুম্-বুম্ শব্দে সেই ফঁপা গাছের কান্ডটা বাজানো শুরু হল। রাজা আসারিয়া হাত তুলে ইঙ্গিত করলেন। একদল যুবক-যুবতী বেদীর ওপরে উঠে এল। রংদার পোশাক পরেছে সবাই। হাতে রুমাল। রুমাল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে নাচ, সুরেলা গলার গান। কিছু সময়ের মধ্যে নাচগান জমে গেল। দর্শকদের মধ্যে হর্ষ-উল্লাস। নাচগান চলল।
একটু সময়ের জন্যে নাচগান থামল। আবার বুমবুম বাদ্যি। আবার নাচগান শুরু হল। ফ্রান্সিসদের ভালোই লাগছিল।
ফ্রান্সিস বলল–সিনাত্রা তুমিও এই আসরে একটা গান গাও।
–পাগল হয়েছে। এরা আমার গানের কী বুঝবে? সিনাত্রা হেসে বলল।
–গান বোঝার দরকার নেই। সুরই ভালো লাগবে সবারই। শাঙ্কো বলল।
–না-না। সিনাত্রা মাথা নাড়ল।
–আসলে আমার ইচ্ছে রাজাকে খুশি করা। এই আসরে তোমার গান একটা বৈচিত্র্য আনবে। আমি অনুরোধ করছি তুমি এখানে একটা গান গাও। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু সিনাত্রা বলতে গিয়ে থামল।
–আমি ব্যবস্থা করছি। শাঙ্কো কী বল? ফ্রান্সিস বলল।
নিশ্চয়ই গাইবে। এত ভাল গায় ও। জানতামই না। শাঙ্কো বলল।
ফ্রান্সিস রক্ষীকে বলল–রাজা আসারিয়াকে গিয়ে বলো যে একজন ভাইকিং গান গাইতে চায়। উনি যেন অনুমতি দেন। রক্ষীটি চলে গেল কিছু পরে একজন লোককে সঙ্গে নিয়ে ফিরে এল। লোকটার পোশাক-টোশাক দেখে বোঝা গেল লোকটি মাতব্বর গোছের কেউ। লোকটি হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে এল। বললে–কে গান গাইবেন? আসুন। রাজার হুকুম। ফ্রান্সিস সিনাত্রাকে এগিয়ে দিল। সিনাত্রা আর আপত্তি করল না। বেদীর দিকে এগিয়ে গেল মাতব্বরের সঙ্গে।
নাচগান থামতে মাতব্বরটি বেদীতে উঠে এল। চেঁচিয়ে বলল–একজন বিদেশী ভাইকিং এখানে এসেছে। সে একটি গান গাইবে। মাতব্বরটি দেশীয় ভাষায় বলল ফ্রান্সিস আন্দাজে বুঝল।
সিনাত্রা মঞ্চে উঠল। তারপর গান শুরু করল–
সাগরে চলো ভাই
সাগর আমাদের মা
অন্য কেউ নাই
চলো সাগর যাই।
মুহূর্তে গান জমে উঠল। কেউই গানের মানে বুঝল না। কিন্তু সুর আর সিনাত্রার সুন্দর গলা শুনে শ্রোতারা মুগ্ধ হল। গান শেষ হল। শ্রোতাদের মধ্যে হর্ষ ধ্বনি শোনা গেল। আবার যদি গাইতে বলে এই ভেবে সিনাত্রা দ্রুত বেদী থেকে নেমে এল।
রাজা আসারিয়া ইশারায় সিনাত্রাকে কাছে ডাকল। সিনাত্রা এগিয়ে গেল। রাজা সিনাত্রার পিঠ চাপড়ালেন। রানিও হেসে কিছু বললেন। ফ্রান্সিস বুঝল সিনাত্রার গান শুনে দু’জনে খুশি হয়েছেন। সিনাত্রা ফ্রান্সিসদের কাছে এসে দাঁড়াল।
আবার বাদ্যি বেজে উঠল। এবার ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা নানারঙের পোশাক পরে বেদীতে উঠে নাচতে গাইতে লাগল। আসর জমে উঠল।
হঠাৎ ভিড়ের মধ্যে দিয়ে সেনাপতি রাজারানির আসনের কাছে এল। রাজা রানিকে কিছু বলল। রাজা রানি দ্রুত রাজবাড়ির দিকে চলে গেলেন। ফ্রান্সিসরা বুঝল নিশ্চয়ই কোন বিপদ ঘটেছে।
সেই মাতব্বরটি ততক্ষণে মঞ্চে উঠে এসে নাচ গান থামিয়ে দিল। চিৎকার করে বলে উঠল–সাবধান–সবুজ রাজা আমাদের দেশ অক্রমন করেছে। সবাই যে যার বাড়ির দিকে যাও।
