এতক্ষণে ফ্রান্সিসরা লক্ষ্য করল জনতার একপাশে একদল সৈন্য দাঁড়িয়ে আছে। ঢোলা হাতা মোটা হলদে কাপড়ের পোশাক পরা। কোমরে সাদা কাপড়ের ফেট্টি। তাতে তরোয়াল ঝোলানো। ওদের মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল।
ফ্রান্সিসরা বেদীর কাছাকাছি যেতেই ওদের ওপর সৈন্যদের নজর পড়ল। শাঙ্কো বলল–ফ্রান্সিস সৈন্যরা–বোধহয় বিপদে পড়লাম।
একজন লম্বা মত সৈন্য ফ্রান্সিসের কাছে এগিয়ে এল। বোঝা গেল সে সৈন্যদের এই– দলপতি। ফ্রান্সিসদের সে স্পেনীয় ভাষায় জিজ্ঞেস করল–তোমরা কে?
–আমরা বিদেশী ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল?
–এখানে কী করে এলে? দলপতি জিজ্ঞেস করল।
জাহাজে চড়ে। ফ্রান্সিস বলল।
–এখানে এসেছো কেন? দলপতি প্রশ্ন করল।
–এই মেলা উৎসবে যোগ দিতে। আর একটি কারণ আছে। এখানে জানতে এসেছি এই রাজত্বের নাম আর রাজার নাম। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? দলপতি জানতে চাইল।
–এখনও সবকিছু জানতে পারিনি। ফ্রান্সিস বলল।
–তোমরা যে সবুজ রাজার চর নও তার প্রমান কী? দলপতি বলল।
–সবুজ রাজার নাম আমরা জীবনে শুনি নি। ফ্রান্সিস বলল।
–বেশ। তোমাদের কথা বিশ্বাস করলাম। আমাদের রাজা আসারিয়ার কাছে চলো। উনি জ্ঞানী পুরুষ অনেক ভাষা জানেন। হয়তো তোমাদের সাহায্য করতে পারবেন। যদি জানা যায় যে তোমরা সবুজ রাজার চর তাহলে রাজার সামনেই তোমাদের মেরে ফেলা হবে। দলপতি চলল।
–বেশ। আমরা নির্ভয়। কারণ চরবৃত্তির মত হীন কাজ আমরা করি না। ফ্রান্সিস বলল।
–আচ্ছা। এসো আমাদের সঙ্গে। দলপতি বলল। এই বলে দলপতি রাজবাড়ির দিকে চলল। দলপতির পেছনে পেছনে ফ্রান্সিসরা রাজবাড়ির সামনে এল। পাথরের বাড়ি। পাথরের গায়ে কুঁদে কুঁদে ফুল লতাপাতার নকশা।
দরজার সামনে খোলা তরোয়াল হাতে দু’জন প্রহরী। সর্দারকে দেখে মাথা একটু নুইয়ে দরজা খুলে দিল। ওরা অবাক হয়ে দেখল ফ্রান্সিসদের। এরা কোথা থেকে এল? ফ্রান্সিস একটা কথা বুঝল–এই সর্দারই সেনাপতির সন্মান পাচ্ছে।
একটা ঘরে ঢুকল সবাই। মাঝখানে একটা কালো পাথরের টেবিল মতো। চারপাশে পাথরের আসন। একটা শুধু কাঠের হাতলওয়ালা আসন। বোধহয় রাজা আসারিয়ার আসন। এটা বোধহয় রাজার মন্ত্রণাকক্ষ। সেনাপতি রাজ বাড়ির অন্দরে চলে গেল। একটু পরেই ফিরে এল। আস্তে বলল–রাজা আসারিয়া আসছেন।
ফ্রান্সিসরা অপেক্ষা করতে লাগল।
কিছুক্ষণ পরে রাজা আসারিয়া ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসরা উঠে দাঁড়িয়ে সম্মান জানাল। রাজা হাতলওয়ালা আসনে বসলেন। ফ্রান্সিসদের ব্যবহারে খুশি হলেন। রাজা প্রায় ফ্রান্সিসের সমবাসী। রাজার মুখে অল্প কালো দাড়ি গোঁফ। বেশ বুদ্ধিদীপ্ত চোখ মুখ। পরনে হলুদ পাতলা কাপড়ের পোশাক। বললেন-বসো। ফ্রান্সিসরা বসল। রাজা বলল–তোমাদের কথা শুনলাম। য়ুরোপ এখান থেকে বেশ দূর। যদি দিনরাত জাহাজ চালাও তবুও চারমাস আগে য়ুরোপ পৌঁছাতে পারবে না।
–আমরা কোনদিকে যাবো? ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–উত্তর পূর্ব মুখে। রাজা বললেন।
আপনার পরামর্শের জন্যে ধন্যবাদ। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের তিয়েরা রাজ্য কেমন দেখলে? রাজা একটু হেসে বললেন।
–মাত্র এসেছি। সব কিছু তো দেখিনি। শাঙ্কো বলল।
–আজ রাতে এখানে সূর্য দেবের পূজোর উৎসব। দুদিন চলবে। তোমরা দেখে। যেতে পারো। রাজা বললেন।
-হ্যাঁ। সন্ধে হয়ে এল। কোন সরাইখানায় থাকবো ভাবছি। ফ্রান্সিস বলল।
–তা কেন? তোমরা আমার অতিথিআবাসে থাকবে। পূজো দেখবে উৎসব। দেখবে। ইচ্ছে করলে কালও থাকতে পারো। ফ্রান্সিস অবাক হয়ে গেল। বেশির ভাগ রাজাই তো ওদের ধরে কয়েদঘরে ঢুকিয়েছে। এই রাজা আসারিয়া অন্য রকম মনে হচ্ছে।
–আপনার আমন্ত্রন আমরা নিশ্চয়ই রাখবো। ফ্রান্সিস বলল।
–আমি খুশি হলাম। তোমাদের জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করতাম। কিন্তু একটা ব্যাপার নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি। রাজা বললেন।
–যদি কিছু না মনে করেন মানে–কারণটা জানতে পারি? ফ্রান্সিস বলল।
নিশ্চয়ই। আমার রাজত্বের পশ্চিমদিকে সবুজ রাজার রাজত্ব। রাজা বললেন।
সবুজ রাজা? ফ্রান্সিস কথাটার অর্থ বুঝতে পারল না।
উনি নিজে আর তার সৈন্যরা সবুজ পোশাক পরে। আর আমরা হলুদ পোশাক পরি। রাজা বললেন।
-ও। সবুজ রাজা বোধহয় আপনার শত্রুপক্ষ। ফ্রান্সিস জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। রাজা মাথা ওঠানামা করলেন।
–তবু তাকে সম্মান দিয়ে আপনি কথা বললেন। ফ্রান্সিস বলল।
–শত্রুপক্ষ হলেও তিনি রাজা। তার সম্মান প্রাপ্য। রাজা বললেন।
ফ্রান্সিস এবারও একটু অবাক হল।
যাক গে। তোমরা থাকবে উৎসব দেখবে। রাজা বললেন।
নিশ্চয়ই থাকবো। ফ্রান্সিস বলল।
এবার রাজা আসারিয়া সেনাপতির দিকে তাকালেন। বললেন–এদের থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা করুন। রাজা চলে গেলেন।
সেনাপতি ফ্রান্সিসদের পেছনে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিসরা চলল।
বাইরে এসে পাশের একটা ঘরে ঢুকল সবাই। এই ঘরটাও পাথরের। দেয়াল কুঁদে নকশা আঁকা। ঘরের মধ্যে মেঝেয় ঢালাও শুকনো ঘাসপাতার বিছানা। ওপরে মোটা কাপড়ের পরিষ্কার ঢাকা।
–এটাই অতিথি ঘর। অতিথি যাতে খুশিমত বাইরে বেরোতে পারেন তার জন্যে এই ঘরের কোন দরজা নেই। একটা পাথরের পাটা আছে শুধু। রাতের উৎসবে বটগাছের নিচে ঐ বেদীতে নাচগান হবে। আপনারা অবশ্যই দেখবেন। সেনাপতি বললেন।
ফ্রান্সিসরা কিছু বলল না।
