–না। অভিযান চলবে। অতটা ভেঙে পড়ো না। একেবারে হতাশ হয়ে পড়ার কিছু ঘটেনি। ফ্রান্সিস বলল।
ঘটেনি কিন্তু ঘটতে কতক্ষণ। মারিয়া রাগ করে বলে।
–তাহলে এক কাজ করি। সামনে যে বন্দর পাবো সেখানে অসহিষ্ণু বন্ধুর সঙ্গে তুমিও নেমে যাও। জাহাজ জোগাড় করে দেব। দেশে চলে যাও। কথাটা শুনে মারিয়াও ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিস মারিয়ার পিঠে হাত রেখে বলল–কান্নাকাটি করে আমার মন দূর্বল করে দিও না। মারিয়ার কান্না থামল। চুপ করে রইল। কোন কথা বলল না।
ওদিকে নজরদার পেড্রো শুধু সকালে কয়েক ঘন্টা ঘুমোয়। সারারাত মাস্তুলের মাথায় বসে নজর রাখে। ডাঙার দেখা পেতেই হবে।
সেদিন দুপুরে পেড্রো পশ্চিমদিকে একটা পাহাড় মত দেখল। চিৎকার করে বলে উঠল–ভাইসব–পশ্চিমদিকে–ডাঙা।
কেবিনঘরে ডেকএ শুয়ে থাকা ভাইকিং বন্ধুরা ছুটে জাহাজের রেলিঙের ধারে এসে জড়ো হল। সবাই পশ্চিমদিকে তাকিয়ে পাহাড় দেখল। ফ্রান্সিস মারিয়াকে নিয়ে ডেক-এ উঠে এল। সবুজ পাহাড় দেখল। ফ্লেজারের কাছে এল। বলল–ওদিকেই জাহাজ চালাও। নেমে দেখবো কোথায় এলাম। বন্দর নয়। তবে এখানে জাহাজ। নোঙর করা আছে। জাহাজটায় লোক নেই দেখল।
ফ্লেজার হুইল ঘোরাল। জাহাজ আস্তে আস্তে তীরভূমির কাছে এল। কিন্তু তীরের কাছে জল গভীর নয় বলে ফ্লেজার জাহাজ ভেড়াতে পারল না।
হ্যারি ফ্রান্সিসের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
বলল–ফ্রান্সিস কী করবে?
–এটা বড় বন্দর নয়। তবে কিছু ঘরদোর আছে দেখছি। শুকনো পাতাঘাস ছাওয়া বাড়ি। তীরে কিছু মাছধরার নৌকা দেখছি। তার মানে জেলেদের বসতি। ওদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। তবেই জানতে পারবো যে এটা কোন দ্বীপ না দেশের অংশ। ফ্রান্সিস বলল।
–এখনই খোঁজখবর করতে যাবে? হ্যারি জানতে চাইল।
-হ্যাঁ। বেশি দেরি করা চলবে না। শাঙ্কো আর সিনাত্রাকে ডাকো। ফ্রান্সিস বলল। হ্যারি ওদেরকে ডেকে আনল। ফ্রান্সিস বলল–তোমরা তৈরী হয়ে এসো। তরোয়াল নিও না।
–তীরে নামবে? শাঙ্কো জানতে চাইল।
–হ্যাঁ। আমি তৈরী হয়ে আসছি। ফ্রান্সিস চলে গেল। তিনজন তৈরি হয়ে দড়ির মই বেঁধে একটা নৌকায় নামল। জাহাজের গা থেকে দড়ির বাঁধন খুলে ফ্রান্সিস নৌকা ভাসাল। ও দাঁড় বাইতে লাগল।
আস্তে আস্তে নৌকা তীরে ভিড়ল। নৌকাটা তীরের বালিয়াড়িতে তুলতে তুলতে ফ্রান্সিস বলল–বাড়িগুলোয় কোন লোকজন দেখছিনা। কোথায় গেল সব?
নৌকা রেখে তিনজন বাড়িগুলোর দিকে চলল। বাড়িগুলোর কাছে এসে দেখল বাড়িগুলোর দরজা গাছের ডাল কেটে তৈরী। দরজা বন্ধ। জনমানব শূন্য ফ্রান্সিস। একটু অবাকই হল। বন্ধ দরজায় দরজায় ঘুরতে ঘুরতে একটা ঘরের দরজা খোলা দেখল। ফ্রান্সিস ভেতরে উঁকি দিল। দেখল দুটো বাচ্চা কোলে নিয়ে একটা বুড়ি বসে আছে। পরনে মোটা কাপড়ের ময়লা পোশাক। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল–এই জায়গার নাম কী? বুড়ি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। বুঝল– বুড়ি হয় কালা নয়তো ওর কথা বুঝতেই পারেনি।
অন্য ঘরগুলোর দিকে গেল ওরা। আর একটা ঘরের দরজা খোলা। ফ্রান্সিস বলল–শাঙ্কো দেখোত। শাঙ্কো ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। দেখল একজন বৃদ্ধ। পরনে মোটা কাপড়ের পোশাক। বৃদ্ধ একটা বাচ্চা ছেলে কোলে নিয়ে বসে আছে। আর একটা বাচ্চা মেয়ে মেঝেয় বালির ওপর খেলা করছে।
শাঙ্কো বৃদ্ধটির সামনে গেল। জোরে বলল–এই জায়গার নাম কী? বৃদ্ধ চুপ। এবার ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। বেশ গলা চড়িয়ে বার কয়েক বলল–এই জায়গার নাম কী? এবার যেন বৃদ্ধটি বুঝল। ভাঙা স্পেনীয় ভাষায় বলল–তিয়েরা।
–এখানকার রাজাকে? ফ্রান্সিস জিজ্ঞেস করল। বৃদ্ধ চুপ। ফ্রান্সিস অঙ্গভঙ্গী করে রাজা বোঝাল। এবার বৃদ্ধটি শ্লেষ্মাজড়িত গলায় বলল–রাজা–, আসারিয়া।
–এখানকার লোকেরা কোথায়? সিনাত্রা জিজ্ঞেস করল? এবার কয়েকবার প্রশ্নটা করতে হল। বৃদ্ধটি আঙ্গুল তুলে সবুজ পাহাড়ের দিকটা দেখাল। বলল– তিয়েরা–মেলা। ফ্রান্সিস শাঙ্কোদের দিকে তাকাল। বলল–ঐ পাহাড়ের দিকেই বোধহয় রাজধানী তিয়েরা। ওখানে মেলাটেলা চলছে। সবাই সেই মেলাতে গেছে।
কী করবে? শাঙ্কো বলল।
–চলো-আমরাও মেলায় যাব। ফ্রান্সিস বলল।
–আবার না কয়েদ ঘরে ঢুকতে হয়। শাঙ্কো বলল।
-সেই সমস্যা তো আছেই। কিন্তু সবাই তো ঐ মেলাতেই গেছে। ওখানে না গেলে জানবো কী করে কোথায় এলাম। ফ্রান্সিস বলল।
–কিন্তু রাস্তা কোথায়? সিনাত্রা বলল।
–এখানকার লোকেরা যখন গেছে তখন রাস্তামত নিশ্চয়ই কিছু আছে। দেরি করো না। চল। ফ্রান্সিস বলল।
তিনজনে ঘরের বাইরে এল। বাড়িঘর ছাড়িয়ে আসতেই দেখল সেই পাহাড়ের দিকে একটা বালিভর্তি রাস্তা চলে গেছে। ফ্রান্সিস বলল–পাহাড়ের নিচে দেখ। ঘন বন। এরা ওখান থেকে গাছপালা এনে এখানে বাড়িঘর তৈরী করেছে। এই রাস্তায় ওদের যাতায়াত আছে। সত্যি বালিয়াড়িতে একটা রাস্তামত দেখা গেল। তিনজন পাহাড় বন জঙ্গলের দিকে চলল।
বেশ কিছুদূর যেতেই দূর থেকে লোকজনের কোলাহল শোনা গেল। কাছাকাছি আসতে বাড়িঘর দেখা গেল। কিছু বাড়িঘর পাথরের। তার মধ্যে একটা বড় পাথরের লম্বাটে বাড়ি দেখা গেল। শাঙ্কো বলল–ঐ বাড়িটা বোধহয় রাজবাড়ি। ওরকম বাড়ি আর একটাও দেখা যাচ্ছে না।
বাড়িগুলোর কাছাকাছি আসতে দেখল জায়গাটার মাঝখানে একটা বড় বট গাছ। নিচেটা পাথর দিয়ে বাঁধানো। ওটাকে ঘিরে ভিড়। বটগাছের বিরাট ঝুড়ি নেমেছে। জায়গাটা প্রায় অন্ধকার হয়ে এসেছে এই বিকেলেই। গাছের সামনে একটা পাথরের বড় বেদী। বেদীটাকে ঘিরে মানুষের ভিড়। বটগাছের গায়ে একটা পাথরের দেবমূর্তি গাঁথা। গাছের নিচে পাতা ফুল ছড়ানো। বোধহয় দেবপূজা চলছে। একজন পুরোহিত দেবী মূর্তির সামনে বসে আছে। মোটা কাপড়ের পোশাক পরা নারী পুরুষ বেদী ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। উচ্চস্বরে কী বলছে। একজন একটা ফাঁপা কাটাগাছের কান্ডে কাঠের ডান্ডা দিয়ে ঘা মারছে। বুম্ বুম্ শব্দ হচ্ছে।
