আগুন দেখে তিন পাহারাদার জলদস্যু ছুটে এল। ওরা বুঝে উঠতে পারল না কী করে আগুন লাগল। ভাইকিংরা ততক্ষণে উঠে পড়েছে। ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলল–পালাও। তার আগেই সিনাত্রা চমকি পাথর কোমরে গুঁজে অন্ধকার সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পড়েছে। সঙ্গে সঙ্গে শাঙ্কো ঝাঁপ দিয়ে পড়ল। দু’জনেই সাঁতরে চলল নিজেদের জাহাজের দিকে।
পাহারাদারদের চিৎকার চেঁচামেচিতে কিছু জলদস্যু ডেক উঠে এল। সমুদ্র থেকে জল তুলে আগুনে ছিটতে লাগল। কিন্তু আগুন নিভল না। বরং আগুন লেগে গেল কাঠের কাঠামোয়। ওরা ফ্রান্সিসদের বাধা দেবে কি আগুন নেভেতেই হিমসিম খাচ্ছে।
দস্যুরানি ইরিনাও ডেক উঠে এল। দেখল ডেক ফঁকা। একজন বন্দীও নেই। মাথার ওপর পালগুলো পুড়ে ছাই। কাঠামোর কাঠ জ্বলছে। মাস্তুলের দড়িতে আগুন লেগেছে। আগুনের আভায় চারিদিক স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ইরিনা চেঁচিয়ে বলল ওদের জাহাজ আক্রমন কর। কাউকে পালাতে দিবি না। কয়েকজন জলদস্যু বলল, আগে আমাদের জাহাজতো আগুনের হাত থেকে বাঁচাই। পরে দেখা যাবে। ইরিনা। এবার বুঝল–এখন লড়াই করতে গেলে সমস্ত জাহাজটাই পুড়ে যাবে। সব জলদস্যু ডেক উঠে এল। সমুদ্র থেকে জল তুলে জল ছিটানোচলল। কিন্তু সবটা আগুন নিভল না। বরং মাস্তুলেও আগুন লেগে গেল।
ওদিকে শাঙ্কো আর সিনাত্রা দড়ি দড়া ধরে নিজেদের জাহাজে উঠে পড়েছে। শাঙ্কো এক ছুটে জাহাজের মাথার কাছে এসে গেল। দেখল জলদস্যুদের জাহাজ থেকে আগুনের ফুলকি ওদের জাহাজেও উড়ে আসছে। এক্ষুণি জাহাজটা সরিয়ে না আনলে ওদের জাহাজের পালেও আগুন লাগতে পারে। ও-ছুটে জলদস্যুর জাহাজের সঙ্গে বাঁধা দড়ির কাছে এল। জামার তলা থেকে ছোরা বের করল। দ্রুত দড়ি কাটতে লাগল। সিনাত্রা শাঙ্কোর কাছে এল। শাঙ্কো দড়ি কাটতে কাটতে বলল–তরোয়াল নিয়ে এসো জলদস্যুরা আক্রমন করতে এলে লড়তে হবে। সিনাত্রা দ্রুত ছুটল অস্ত্রাগারের দিকে। দু’জনেই হাপাচ্ছে তখন।
দড়ি কেটে গেল। ফ্রান্সিসদের জাহাজ যেন একটা ধাক্কা খেয়ে বেশ দূরে সরে এল। এবার নিশ্চিন্ত। আগুনের ফুলকি থেকে আগুন লাগার কোন সম্ভবনা রইল না।
ততক্ষণে ফ্রান্সিসরা ওদের জাহাজে উঠে এসেছে। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল– দাঁড় ঘরে যাও। পাল তুলে দাও। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দূরে চলে যেতে হবে। জনা কয়েক ভাইকিং বন্ধু দাঁড়ঘরে চলে গেল। কয়েকজন পাল খাটাবার কাঠামোতে উঠে পড়ল। পাল খুলে দিল। পালে জোর হাওয়া লাগল। ওদের জাহাজ বেশ দূরে চলে এল। তখনও জলদস্যুদের জ্বলন্ত জাহাজটা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে আর দেখা গেল না। তখন পূব আকাশে কমলা রং ছড়িয়ে সূর্য উঠল। ফ্রান্সিস স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল।
মারিয়ার ঘুম ভেঙে গিয়েছিলো। ডেকএ অনেক মানুষের পায়ের শব্দ শুনে ডেক এ উঠে এল। দেখল বন্ধুরা ডেক-এ ছোটাছুটি করছে। যাক-ওরা অক্ষত ফিরে এসছে।
ফ্রান্সিসের কাছে এল। বলল–কী করে পালালে?
জলদস্যুদের জাহাজে আগুন লাগিয়ে। ঐ দেখো। ফ্রান্সিস হেসে বলল। মারিয়া দূরে জলদস্যুদের জলন্ত জাহাজটা দেখল। বলল–আগুন লাগালে কী করে?
–সিনাত্রার বুদ্ধি। ফ্রান্সিস বলল। তারপর ঘটনাটা বলল।
–তাহলে সিনাত্রাই তোমাদের বাঁচিয়েছে বলো। মারিয়া হেসে বলল।
–ঠিক তাই। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলল। চারিদিকে অনন্ত জলরাশি। ডাঙার দেখা নেই।
নজরদার পেড্রো মাস্তুলের ওপর নিজের জায়গায় উঠতে যাবে ফ্রান্সিস এগিয়ে এল। বলল–পেড্রো–আর আমাদের বিপদ বাড়িও না। বিশেষ করে রাতে ঘুমিয়ে পড়ো না। দিনে তো আমরা চারিদিক দেখি টেখি। বিপদ হয় রাতে। তখন তোমার নজরই আমাদের ভরসা। দয়া করে একটু সজাগ থেকো। পেড্রো মাথা নিচু করে বলল–আর ভুল হবে না।
–দেখ–যতটা সাবধান থাকা যায়। এবার নিজের জায়গায় যাও। ফ্রান্সিস বলল। পেড্রো মাস্তুলের দড়ি ধরে ধরে উঠতে লাগল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলতে লাগল। জাহাজ চালক ফ্লেজার আন্দাজে জাহাজ চালাচ্ছে। জাহাজ কোথায় চলছে কেউ জানে না। চারিদিকে জল। বোঝার উপায় নেই।
দিন যায়। রাত যায়। ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলছে। এর মধ্যে ঝড় হয়েছিল। কিন্তু বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি। ভাইকিংরা সাহসের সঙ্গে ঝড়ের মোকাবিলা করল।
ফ্রান্সিসদের জাহাজ চলেছে। কুলকিনারহীন সমুদ্র। ফ্রান্সিস মাঝে মাঝেই জাহাজচালক ফ্লেজারের কাছে আসে। জানতে চায় ফ্লেজার দিক্ ঠিক রাখতে পারছে কিনা। ফ্লেজার বলে–কতটা আন্দাজেই চালাচ্ছি। কবে কখন ডাঙার দেখা মিলবে কে জানে।
ফ্রান্সিস চিন্তায় পড়ে। এ কোথায় চলেছি? ভাইকিং বন্ধুদের মনেও প্রশ্ন কতদূর কোথায় চলেছি আমরা? শুধু হ্যারি ফ্রান্সিসকে সান্ত্বনা দেয় কিছু ভেবো না। ডাঙার দেখা পাবো। ফ্রান্সিস কিছু বলে না। বোঝে বন্ধুরা যদি জানে যে ও অধৈর্য হয়ে পড়েছে তাহলে ওদের মনও ভেঙে যাবে। তাই বন্ধুরা এসব নিয়ে ওকে প্রশ্ন করলে। ফ্রান্সিস বলে–ধৈর্য হারিও না। জাহাজে খাদ্য আর জলের অভাব পড়ে নি। আরও কিছুদিনের নামে আমরা নিশ্চিন্ত। তোমাদের তো সমুদ্রযাত্রার আগেই বলেছি–নানা সমস্যায় পড়তে পারি। তার মধ্যেই আমাদের অভিযান চালাতে হবে।
মারিয়াও দিনে দিনে অধৈর্য হয়ে উঠছে। বলে–আর নয়। এবার দেশে ফিরে চলো।
