ফ্রান্সিস চুপ করে রইলো। কোন কথা বললো না। লা ব্রুশ বেঞ্জামিনকে ডেকে বলল–বৈদ্যিকে ডেকে নিয়ে আয় তো।
একটু পরেই জাহাজের বৈদ্যি এলো। লা ব্রুশ ওকে বলল–দ্যাখ তো ও সত্যিই অসুস্থ, না ঢঙ করছে।
বৈদ্যি ফ্রেদারিকোকে কিছুক্ষণ পরীক্ষা করল। তারপর বলল–ও ভীষণ অসুস্থ। বোধহয় আর বাঁচবে না।
–সে কি? লা ব্রুশ চেঁচিয়ে উঠল–আর দু’একদিনের মধ্যেই আমরা চাঁদের দ্বীপে পৌঁছবো। ফ্রেদারিকোকে তখন খুবই প্রয়োজন। ওকে তুমি যে করেই হোক আর ক’টা দিন বাঁচিয়ে রাখো।
–চেষ্টা করবো ক্যাপ্টেন। বৈদ্যি বলল। লা ব্রুশ বেঞ্জামিনকে ডাকল–ফ্রেদারিকোর শূশূষা দেখাশুনার ভার তার ওপর রইলো। দেখিস্ যেন পট্ করে মরে না যায়। বলে লা ব্রুশ চলে গেল।
বেঞ্জামিনও বেরিয়ে গেল। একটু পরেও ছেঁড়া পালের টুকরো আর একগাদা খড় নিয়ে এলো। ফ্রেদারিকো যেখানে শুয়ে ছিল, সেখানে খড় ছড়িয়ে দিলো তার ওপর ছেঁড়া পালের কাপড় পেতে দিলো। বেশ একটা বিছানার মত হলো। ফ্রেদারিকোর, হাতের কড়া খুলে ওকে আস্তে-আস্তে ঐ বিছানায় শুইয়ে দিলো। বৈদ্যি আবার কিছুক্ষণ ফ্রেদারিকোকে পরীক্ষা করে তারপর ওষুধ খাওয়ালো। একটু রাত হ’তে বৈদ্যি চলে গেল। বেঞ্জামিন এক ঠায় ফ্রেদারিকোর মাথার কাছে বসে রইল। ও রাত্রে একবারের জন্যে উঠলো না। নিজে গেলও না।
ভোরের দিকে ফ্রেদারিকো বোধহয় একটু সুস্থ বোধ করল। এপাশ থেকে ওপাশ ফিরল। তখন জ্বরটাও বোধ হয় কমের দিকে। বেঞ্জামিন ওর কপালে হাত দিলো।
ওকে একটা সুস্থ দেখে নিজের কাজে চলে গেল।
তখনই ফ্রেদারিকো ইসারায় ফ্রান্সিসকে কাছে ডাকল। ফ্রান্সিস এগিয়ে এলে ফ্রেদারিকো দুর্বল হাতে গলা থেকে আয়নাটা খুলে ওর হাতে দিল। ক্ষীণ কণ্ঠে বলল–ফ্রান্সিস, তোমাকে আমি উপযুক্ত মানুষ বলে মনে করি। সব কথা তোমাকে বলেছি। কিছুই গোপন করি নি। সাহস থাকলে তবেইমুক্তো এনো৷ কিন্তু সেইসব মুক্তো নিয়ে কোনোদিন ব্যবসা করো না।
ফ্রান্সিস মাথা নীচু করে রইলো। কোন কথা বলল না। আয়নাটা দু-একবার উল্টে পাল্টে দেখে কোমরে গুঁজে রাখলো।
একটু বেলা হ’তে লা ব্রুশ কাঠের পা ঠক্ঠক্ করতে করতে এলো। খুকখুক করে হেসে ফ্রেদারিকোর কাছে এসে দাঁড়াল। বললো–শুনলাম, ভালো আছো। তাহলে এবার মুক্তোর সমুদ্রে রহস্যটা বলো।
–আমি যা জানি বলেছি, আর কিছু জানি না।
লা ব্রুশ চীৎকার করে উঠল–মিথ্যাবাদী ফেরেববাজ! তুমি আমার কাছে সব কথা বলি নি। একটু থেমে বলল সেরে ওঠ, তারপর চাবুকে তোর পিঠের চামড়া তুলবো। ’লা ব্রুশ চলে গেল। বেঞ্জামিন ফিরে এসে ফ্রেদারিকোর কাছে বসলো। ওকে একটা ওষুধ খাইয়ে বেঞ্জামিন বলল–ক্যাপ্টেন কি জানতে চায় বলে দিলেই তো পারো। কতদিন আর চাবুকের মার খাবে?
–তুই পাগল হয়েছি বেঞ্জামিন–ঐ রকম একটা নরঘাতক শয়তানকে মুক্তোর সমুদ্রের রহস্য বলে দেব? অসম্ভব। দুর্বল শরীরে যতটা গলার জোর দিয়ে বলা সম্ভব ফ্রেদারিকো বললো। বেঞ্জামিন আর কোন কথা না বলে নিঃশব্দে চলে গেলো।
দুপুরের দিকে ফ্রেদারিকো ফ্রান্সিসকে ডেকে বলল–কপালে হাত দিয়ে দেখো তো, মনে হচ্ছে আবার জ্বরটা বাড়ছে।
ফ্রান্সিস কড়ায় বাঁধা হাত দুটো ফ্রেদারিকোর কপালে রাখলো। দেখলে বেশ গরম। বুঝল বেশ জ্বর এসেছে। মিথ্যে করে বলল–জুরটা সামান্য বেড়েছে, ও কিছু না সেরে যাবে।
ফ্রেদারিকো কোন কথা বলল না। চোখ বুজে চুপ করে শুয়ে রইল।
তখন সন্ধ্যে হবে। ফ্রেদারিকো মাথা এপাশ-ওপাশ করে গোঙাতে লাগল। ভীষণ জুরে ওর গা পুড়ে যাচ্ছে। একটু পরেই ও জ্ঞান হারিয়ে ফেললো। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বেঞ্জামিনকে ডাকতে লাগলো। বেঞ্জামিন কয়েদ ঘরে ঢুকেই ফ্রেদারিকোর কাছে দৌড়ে এলো। কপালে হাত দিয়েই বুঝলো অবস্থা ভালো নয়। ও ছুটলো বিদ্যকে ডাকতে। বৈদ্যি সব দেখে শুনে ওর চিবুকের উঁচালো দাড়িতে হাত বুলোলা কয়েকবার। তারপর ঝোলা থেকে একটা ওষুধ বের করে বেঞ্জামিনকে দিলো খাইয়ে দেবার জন্যে। কিন্তু ফ্রেদারিকোকে ওষুধ খাওয়ানো গেলো না। দাঁতে-দাঁত লেগে আছে। মুখে ঢেলে দিতে ওষুধটা মুখের কষ বেয়ে পড়ে গেলো। বৈদ্যি একটু মাথা নেড়ে হতাশার ভঙ্গি করল। তারপর ওর ঝোলাটা নিয়ে চলে গেলো। কিছুক্ষণ পরে কয়েকটা জোর ঝাঁকুনি দিয়ে ফ্রেদারিকোর দেহটা স্থির হয়ে গেল। ওর শরীরটা আস্তে-আস্তে একেবারে ঠান্ডা হয়ে গেল। ফ্রান্সিস ওর গায়ে হাত দিলো। দেখলো বরফের মত ঠান্ডা। বুকে কান পাতলো, কোন শব্দ নেই। নাকের কাছে হাত রাখলো। নিঃশ্বাস পড়ছে না। বেঞ্জামিন তখনও একটা কাঁচের পাত্রে জল ঢেলে ওষুধ গুলছিল! ফ্রান্সিস ডাকলো বেঞ্জামিন।
বেঞ্জামিন কোন কথা না বলে ফ্রান্সিসের দিকে তাকাল। ফ্রান্সিস মৃদুস্বরে বলল–ফ্রেদারিকো মারা গেছে।
বেঞ্জামিন বিশ্বাস করলো না। ও ফ্রেদারিকোর কপালে হাত রাখলো। বুকে হাত রাখল। তারপর মাথাটা নাড়তে লাগল। ফ্রেদারিকোর শরীরে কোন সাড়া নেই। বেঞ্জামিন গোল মুখ কুঁচকে উঠল। ও দু’হাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ফ্রান্সিসরা সকলেই অবাক চোখে বেঞ্জামিনের দিকে তাকিয়ে রইল। এই পাথরের মত কাছে কঠিন মুখের মানুষটার মধ্যে তাহলে স্নেহ-ভালবাসার অস্তিত্ব আছে। অন্য সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাহলে ওর কোন পার্থক্য নেই। আশ্চর্য! বেঞ্জামিনের কঠিন ভাবলেশহীন মুখে কোন কিছু বোঝার উপায় ছিল না।
