রাত বাড়ে। সিনাত্রা নতুন গান ধরে। ওর চোখে ঘুম নেই। জলদস্যু পাহারাদাররাও ওর গান শোনে। ওদেরও ভালো লাগে।
গভীর রাত পর্যন্ত সিনাত্রা গান গাইল। তারপর ঘুমিয়ে পড়ল।
সিনাত্রা প্রতি রাতেই অনেকক্ষণ পর্যন্ত গান করে। বন্ধুদের ভালো লাগে। কেউ আপত্তি করে না। সিনাত্রা সারা জাহাজ ঘুরে ঘুরে গান করে। পাহারাদাররাও আপত্তি করে না।
একরাতে মাস্তুলের মাথায় উঠে গেল। নজরদারদের জায়গায় বসে গান গাইল। আর একদিন পাল খাটানোর কাঠের কাঠামোর ওপর বসে গান গাইল। সেই কাঠের টক্ টক শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে গান। এই ভাবে জাহাজের যেখানে সেখানে বসে সিনাত্রা গান গায় আর টক্ টক্ শব্দে কাঠ বাজায় তালে তালে।
জাহাজ চলছে। ফ্রান্সিসের চিন্তা। পিতুজা বন্দর কতদূর? ওদের ভাগ্যেই বা কী আছে।
দুদিন দস্যুরানি এসেও সিনাত্রার গান শুনল। শুনে বোধহয় খুশি হল। কিছু বলল না।
টক্ টক্ শব্দ আর গানের সঙ্গে জলদস্যুরা অভ্যস্ত হয়ে গেল।
একদিন গভীর রাতে পাল খাটাবার কাঠের কাঠামোয় বসে গান গাওয়া শেষ করে সিনাত্রা ফ্রান্সিসের কাছে এল। ফ্রান্সিস তখনও ঘুমোয়নি। গান শুনছিল আর ভাবছিল কী ভাবে এই বন্দী দশা থেকে পালানো যায়। ফ্রান্সিসকে একটু ঠেলে জিজ্ঞেস করল –আমার গান কেমন লাগছে। ফ্রান্সিস একটু হেসে বলল- খুব ভালো। তুমি এত ভালো গান কর এতদিন জানতাম না। একদিন মারিয়াকে গান শুনিয়ে এসো। এক ঘেয়ে জীবন ওর ভাল লাগবে।
নিশ্চয়ই শোনাবো। তারপর চারিদিকে তাকাল। দেখল দু’জন পাহারাদার ডেক-এর কোনায় বসে আছে। ও ফিস্ ফিস্ করে বলল–ফ্রান্সিস আমার টক্ টক্ শব্দটা বোধহয় তোমাদের কানে সয়ে এসেছে।
–হ্যাঁ-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস ঘাড় নাড়ল।
–তাহলে পাহাদারদের কানেও সয়ে গেছে। সিনাত্রা বলল।
–হ্যাঁ-হ্যাঁ। ফ্রান্সিস হেসে বলল।
–যদি চমকি পাথর ঠুকে আগুন জ্বালাতে পারি? সিনাত্রা বলল।
–পাথর লোহা পাবে কোথায়? ফান্সিস বলল।
–আমার কোমরে গোঁজা। সিনাত্রা বলল।
ফ্রান্সিস দ্রুত উঠে বসল। আগের মতই ফি ফিস করে বলল–কিন্তু শব্দ হবে যে।
কাঠের টুকরোর শব্দই ভাববে পাহারাদারেরা। সিনাত্রা বলল।
–তাই তুমি কাঠের শব্দ করে গান গাও। ফ্রান্সিস একটু অবাক হয়েই বলল।
–হ্যাঁ। আগেই সব ভেবে এই শব্দ করছি। সিনাত্রা বলল। ফ্রান্সিস চাপা উল্লাসে বলে উঠল–সবাস সিনাত্রা। তাহলে দেরি নয়। কাল রাতেই আগুন লাগাও। এখন গাঢ় অন্ধকার রাত চলছে।
পরেদিন রাতের খাবার খেয়ে সবাই ডেক এর এখানে ওখানে শুয়ে বসে রইল। ফ্রান্সিস চাপা স্বরে ডাকল–হ্যারি। হ্যারি এগিয়ে এল। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে বলল রাত গভীর হলেই সিনাত্রা জাহাজের পালে আগুন লাগাবে।
–বলল কি? ও পারবে? হ্যারি চমকে উঠে বলল।
-হা পারবে। চমকি পাথর লোহা ওর কাছে আছে। পাহারাদাররা ভাববে কাঠের টুকরোর শব্দ। ওরা শব্দের পার্থক্য ধরতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
-সাবাস্ সিনাত্রা। হ্যারি চাপাস্বরে উল্লাস প্রকাশ করল।
এবার সবাইকে গিয়ে বলল সবাই যেন জেগে থাকে। পালে আগুন লাগলে সবাই যেন জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাঁতরে আমাদের জাহাজে ওঠে। তারপর শাঙ্কো যেন জলদস্যুদের জাহাজের সঙ্গে বাঁধা দড়িটা কেটে দেয়। তারমধ্যে সবাই যেন অস্ত্রঘর থেকে তরোয়াল নিয়ে এসে ডেকএ দাঁড়িয়ে পড়ে। জলদস্যুরা আগুন নেভাতে ব্যাস্ত হয়ে পড়বে। তবু যদি আমাদের জাহাজে দল বেঁধে উঠে আসেলড়াই হবে। যাও সবাইকে বলো। ফ্রান্সিস চাপাস্বরে নির্দেশ দিল।
হ্যারি আস্তে আস্তে ডেকএর ওপরে গড়িয়ে গড়িয়ে এক এক বন্ধুর কাছে গেল। চাপাস্বরে বলে এল–এই জাহাজের পালে আগুন লাগবে। সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়বে। আমাদের জাহাজে গিয়ে উঠবে। সবাই ঘুমিয়ে থাকার ভান করবে। কিন্তু ঘুমুবে না কেউ।
বন্ধুরা সবাই পালাবার জন্যে তৈরী হল।
রাতের খাওয়া সেরে সবাই শুয়ে পড়ল। রাত গভীর হল। সেই তারার অস্পষ্ট আলো চারদিকে।
— রাত একটু গম্ভীর হল। তখন অন্ধকার রাত। আকাশে উজ্জ্বল তারার মেলা। সেই তারার অস্পষ্ট আলো চারদিকে।
রাত আরো একটু গম্ভীর হল। সিনাত্রা যথারীতি কাঠের টুকরো টক্ টক্ বাজিয়ে গান গেয়ে চলল। ডেক বসে কিছুক্ষণ গাইল। তারপর পালের কাঠের কাঠামোয় উঠে গাইতে লাগল। পাহারাদাররা জানে সিনাত্রা কখনও ডেকএ বসে কখনও হালের কাছে গিয়ে কখনও মাস্তুলের মাথায় কখনও পালখাটাবার কাঠের কাঠামোয় বসে গান গায়। এই রাতেও দেখল পালখাটাবার কাঠের কাঠামোতে বসে গান গাইছে। গান শুনতে শুনতে তিনজন পাহারাদার জলদস্যু ঝিমুতে লাগল। সিনাত্রার গান শুনতে ওদের ভালোই লাগে।
এবার সিনাত্রা কোমরে গোঁজা চমকি পাথর বের করল। চকমকি পাথরে লোহার টুকরো ঠুকে গান গাইতে লাগল। টক্ টক্ শব্দ চলল। পাহারাদাররা শব্দের পার্থক্য বুঝতে পারল না। সিনাত্রা গাইতে লাগল–
সাগরে চলো ভাই।
সাগর আমাদের মা।
অন্য কেউ নাই
চলো সাগরে যাই।
পালের গায়ে চকমকি পাথর ঠেকিয়ে লোহার টুকরো ঠুকতে লাগল তালে তালে ঠক্ ঠক্।
আগুনের স্ফুলিঙ্গ জ্বলে উঠে পালে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে আগুন লেগে গেল। সিনাত্রা দ্রুত ক্রমকি ঠুকে আরোও দুটো পালে আগুন লাগাল। তিনটে পালেই আগুন লেগে গেল। সমুদ্রের জোর হাওয়ায় তিনটে পালই দাউ দাউ করে জ্বলে– উঠল। মুহূর্তে অন্য পালগুলোতেও আগুন ছড়াল।
