উনি আমাদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ান। হ্যারি বলল।
–ব্বা! মজার ব্যাপার। রানি আবার হাসল তারপর আবার গলা চড়িয়ে বলল শোন–আমাদের জাহাজের ডেকএ গিয়ে তোমাদের থাকতে হবে। কড়া পাহারায়। আমাদের জাহাজ ছোট। অত কেবিনঘর নেই। কয়েদঘরও নেই।
রোদ ঝড় বৃষ্টি–শাঙ্কো বলতে গেল। দস্যুরানি ওকে থামিয়ে দিয়ে বলল হা– তার মধ্যেই থাকতে হবে।
–আমার একটা কথা ছিল। ফ্রান্সিস বলল।
–আমাদের রাজকুমারী অত কষ্ট করে ওখানে থাকতে পারবে না। ফ্রান্সিস বলল।
–থাকতে থাকতে অভ্যেস হয়ে যাবে। দস্যুরানি হেসে বলল।
–না–ফ্রান্সিস চিৎকার করে বলে উঠল–না। উনি আমাদের জাহাজে থাকবেন। চড়া গলায় ফ্রান্সিসের একথা শুনে দস্যুরানি একটু চুপ করে থেকে কী ভেবে বলল বেশ তাই থাকবে। রাজকুমারীকে ফেলে তো তোমরা পালাতে পারবে না। এদিক থেকে এটা ভালোই হবে। কথাটা শেষ করে জলদস্যুদের দিকে তাকিয়ে বলল–এদের আমাদের জাহাজে নিয়ে চল। আমাদের জাহাজের ডেকএ নিয়ে চল্। এরা ওখানেই থাকবে।
দস্যুরানি অদ্ভুত দক্ষতায় ফ্রান্সিসদের জাহাজ থেকে নিজেদের জাহাজের ডেক উঠে গেল। দস্যুরানি চলাফেরায় পুরুষালি ভাব। দেখে হ্যারি মৃদুস্বরে মন্তব্য করল
দেখেছো ফ্রান্সিস চলাফেরায় দস্যুরানি কেমন তৎপর। হ্যারি বলল।
জলদস্যুদের ওপর সর্দারি করা সোজা কাজ নয়। ফ্রান্সিস মন্তব্য করল।
জলদস্যুরা দল বেঁধে এগিয়ে এল। তরোয়াল দেখিয়ে ইশারা করল ওদের জাহাজে ওঠার জন্যে। ফ্রান্সিসরা একে একে জলদস্যুদের জাহাজে উঠতে লাগল।
সিনাত্রা একজন জলদস্যুকে বলল–ভাই–আমি রাজকুমারীকে কেবিনঘরে পৌঁছে দিয়ে আসছি। জলদস্যু মাথা নেড়ে বলল–না।
–আরে ভাই আমি পালাবো না। রাজকুমারীকে পৌঁছে দিয়ে এক্ষুণি উঠে আসছি। সিনাত্রা বলল।
–বেশ যাও। কিন্তু পালাবার চেষ্টা করবো না। জলদস্যু বলল।
–কোথায় পালাবো। এ তো মাঝ সমুদ্র। সিনাত্রা হাত ঘুরিয়ে চারিদিক দেখিয়ে বলল।
–আমাদের দলরানি খুব রাগী। রেগে গেলে সঙ্গে সঙ্গে বুকে ছুরি বসিয়ে দেবে। জলদস্যু বলল।
-না–না। এত তাড়াতাড়ি আমি মরতে রাজি নই। আমি যাব আসবো। সিনাত্রা, বলল। তারপর মারিয়ার কাছে এসে বলল-রাজকুমারী–চলুন আপনাকে আপনার কেবিনঘরে পৌঁছে দিয়ে আসি।
না। আমি তোমাদের সঙ্গেই যাব। মারিয়া বলল।
–পাগলামি করবেন না। ফ্রান্সিস এতে রাজি হবে না। ওই তো আপনাকে আমাদের জাহাজে থাকার ব্যবস্থা করেছে। খোলা ডেক-এ আপনি থাকতে পারবেন না। সিনাত্রা বলল।
–না–ফ্রান্সিসকে ডাকো। মারিয়া বলল। তখন সিনাত্রা চাপা গলায় বলল– অন্য কারণ আছে। মারিয়া সিনাত্রার মুখের দিকে একবার তাকাল। তারপর আর কোন কথা বলল না। সিঁড়ি ঘরের দিকে চলল। পেছনে সিনাত্রা।
নীচে নেমে মারিয়া নিজের কেবিনঘরে ঢুকে গেল। সিনাত্রা দ্রুতপায়ে রান্না ঘরে এল। সেই ঘরের টেবিলে রাখা চকমকি পাথর আর লোহার টুকরোটা নিয়ে কোমরে গুজল। তারপর উপরে ডেকএ উঠে এল। দেখল সেই জলদস্যুটি তরোয়াল উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
–দেখ–ভাই ফিরে এসেছি কিনা। সমুদ্রে ঝাঁপ দিয়ে পালাই নি। সিনাত্রা বলল। জলদস্যুটি শুকনো হাসল। বলল-রানি ইরিনার হুকুমে জাহাজ মাঝ সমুদ্র দিয়ে যাবে। জলে ঝাঁপিয়ে পড়লেও ডাঙ্গা খুঁজে পাবে না। হাঙরের মুখে পড়ে জীবন শেষ হবে। এবার আমাদের জাহাজে চলো।
সিনাত্রা আর কোন কথা বলল না। শান্তভাবে জলদস্যুদের জাহাজে উঠে এল। বন্ধুরা সব ডেকএ বসে আছে। সিনাত্রা এবার একজন জলদস্যুর কাছে গেল–বলল–ভাই বন্দী তো হয়েছি। তার মানে একঘেয়ে জীবন। দুটো কাঠের টুকরো দিতে পারো?
কাঠের টুকরো কী করবে? জলদস্যুটি জানতে চাইল।
–কাঠ ঠুকে ঠুকে একটু গান বাজনা করব। সিনাত্রা বলল।
যত সব পাগলামি। জলদস্যুটি বলল।
–বেশ পাগলামি না হয় হল। কাঠের টুকরো দাও। সিনাত্রা বলল।
–এখন পাহারা দিচ্ছি। এখন পারব না। সন্ধ্যেবেলায় নতুন জলদস্যু আসবে তখন দেবো। জলদস্যুটি বলল।
–বেশ তাই দিও। দেবে কিন্তু। জাহাজে তো কাঠের অভাব নেই। সিনাত্রা বলল।
–হা-হা দেবো। জলদস্যুটি ঘাড় নেড়ে বলল।
বিকেল গড়িয়ে সন্ধে হল। সিনাত্রা সাগ্রহে বসে আছে কখন জলদস্যুটি কাঠের টুকরো নিয়ে আসে। জলদস্যুটি কথা রাখল। দুটো কাঠের টুকরো এনে দিল। সিনাত্রা কাঠের টুকরো পেয়ে খুব খুশি। ফ্রান্সিস হ্যারি অবাক। সিনাত্রা কাঠের টুকরো নিয়ে পর কী করবে? হ্যারি বিস্ময় চাপতে না পেরে বলল–এই দুটো কাঠের টুকরো নিয়ে কী করবে?
–গান বাজনা করবো। সিনাত্রা হেসে বলল।
–গান বাজনা? তোমাকে তো কোনদিন গান গাইতে দেখিনি। হ্যারি বলল।
–আনন্দ-আনন্দ। ওটাই আসল। সুর গলায় থাকুক না থাকুক। এই এক ঘেয়ে বন্দী জীবন তো কাটাতে হবে। সিনাত্রা একই ভাবে হেসে বলল।
রাতের খাওয়া শেষ হল। কম পোড়া রুটি আর সামুদ্রিক মাছের ঝোল। খাওয়া সেরে অনেকেই শুয়ে পড়ল।
সিনাত্রা কাঠের টুকরো টক্ টক্ শব্দ বাজিয়ে গান ধরল। ওদের দেশের সমুদ্রের তীরের জেলেপাড়া থেকে জেলেরা নৌকা চড়ে মাছ ধরতে যায় যখন তখন যে গলায় গায় সেই গান। সুন্দর সুরেলা গলায় সিনাত্রা গান গাইতে লাগল। তালে তালে টক টক্ শব্দে কাঠের টুকরো বাজাতে লাগল। ফ্রান্সিস আর বন্ধুরা অবাক। সিনাত্রা এত সুন্দর গান করে? সিনাত্রা এত ভালো গান গায় ওরা কোনদিনও জানতে পারেনি। সিনাত্রা গান গেয়ে চলে। মাতৃভূমির গান। বন্ধুদের অনেকের চোখেই জল দেখা দিল। সিনাত্রা আপন মনে গেয়ে চলেছে তখন।
