ওদিকে নজরদার পেড্রো মাস্তুলের মাথায় ওর আসনে ঘুমিয়ে ছিল। একজন জলদস্যু সেখান থেকে উঠে পেড্রোর পিঠে তরোয়ালের খোঁচা দিল। ঘুম ভেঙে পেড্রো লাফিয়ে উঠল। বুঝল বিপদ যা হবার হয়ে গেছে। এখন জলদস্যুদের পাল্লায় পড়েছে। ওরা যা বলবে মেনে নিতে হবে। পেড্রো জলদস্যুদের পিছনে মাস্তুলের থেকে নেমে এল। বন্ধুদের সঙ্গে বসে পড়ল।
চারজন জলদস্যু ফ্রান্সিস আর মারিয়ার কেবিনঘরের দরজার কাছে এল। দরজায় ধাক্কা দিল না। ধাক্কা দিলে ভেতরের লোক সাবধান হয়ে যেতে পারে। আস্তে আস্তে দরজায় টোকা দিল। মারিয়ার ঘুম ভেঙে গেল। ও আর ফ্রান্সিসকে ডাকল না। ভাবল হ্যারি এসেছে। মারিয়া দরজা খুলতেই খোলা তরোয়াল হাতে চারজন জলদস্যু লাফিয়ে ঘরে ঢুকল। ফ্রান্সিসের তখন ঘুম ভেঙে গেছে। ও বিছানার তলা থেকে তরোয়াল বের করবে বলে হাত বাড়াল। মারিয়া ছুটে এসে ওর হাত চেপে ধরল। চেঁচিয়ে বললনা। ফ্রান্সিস আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল।
একজন জলদস্যু তরোয়াল ঘুরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে ইঙ্গিত করল। ফ্রান্সিস কিছু বলল না। মারিয়ার দিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে দরজার দিকে চলল। মারিয়াও পেছনে পেছনে চলল। ফ্রান্সিস ভাবল পেড্রোর গাফিলতিতে জলদস্যুদের হাতে বন্দী হতে হল।
ডেক এ উঠে দেখল বন্ধুরা সার বেঁধে বসে আছে। কোন কথা না বলে মারিয়াকে সঙ্গে নিয়ে বন্ধুদের মধ্যে বসল।
ভোর হল। সমুদ্রে আকাশে জাহাজ দুটোয় রোদ ছড়াল। ফ্রান্সিসের রাত জাগা চোখ জ্বলে উঠল। জাহাজ জলে ভাসতে লাগল। জলদস্যুরা ততক্ষণ দুটো জাহাজের পালই নামিয়ে দিয়েছে। দুটো জাহাজই গায়ে গায়ে লেগে আছে।
হ্যারি ফ্রান্সিসের পাশে এসে বসল। বলল–আবার বন্দী হলাম।
–পেড্রোর নির্বুদ্ধিতা। বন্দী জীবন মেনে নিতেই হবে। ফ্রান্সিস বলল।
–এদের হাত থেকে পালানো সম্ভব? হ্যারি বলল।
–সব দেখি টেখি। তারপর ভাববো। ফ্রান্সিস বলল।
–এদের সর্দারের সঙ্গে কথা বলতে হবে। হ্যারি বলল।
–হ্যাঁ কথা তো হবেই। জানতে হবে ওরা আমাদের বন্দী করে কী চায়? ফ্রান্সিস বলল।
আরে কী চাইবে। আমাদের কাছে মূল্যবান কিছু আছে কিনা সেসবের খোঁজ করবে। যা পারে লুঠ করবে। হ্যারি বলল।
–সেটাই আটকাতে হবে। অবশ্য মারিয়া সোনার চাকতি গুলো সাবধানেই রেখেছে। মনে হয়না ওরা খুঁজে পাবে। ফ্রান্সিস বলল।
–দেখা যাক। এরা কী করে। হ্যারি বলল।
কয়েকজন জলদস্যু সকালে খাবার নিয়ে এল। কাগজে প্যাচানোপোড়া রুটি আনাজ। খেতে খেতে ফ্রান্সিস একজন জলদস্যুকে জিজ্ঞেস করল তোমাদের সর্দার আসবে না? –সময় হলেই আসবে। জলদস্যুটি বলল।
সকালের খাবার খাওয়া শেষ হল। ফ্রান্সিস জলদস্যুদের সর্দারের জন্যে অধীর আগ আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল। দু’চোখে হাতে চাপা দিয়ে ফ্রান্সিস শুয়ে পড়ল।
কিছু পরে হ্যারির কথা শুনল–ফ্রান্সিস–দেখ–দেখনারী সর্দার। দেখল। জলদস্যুদের জাহাজ থেকে এক নারী জলদস্যু লাফ দিয়ে ওদের ডেক এ উঠে এল। মাথায় সোনালি চুল। গায়ে আঁটোসাটো পুরুষালি পোষাক। নারী জলদস্যুদের কথা ফ্রান্সিসরা শুনছে। কিন্তু কোনদিন চোখে দেখেনি।
দুস্যরানি ফ্রান্সিসদের দিকে এগিয়ে এল। ফ্রান্সিসদের দেখে হাসছে। কী কারণে ফ্রান্সিস বুঝল না। দস্যুরানি ফ্রান্সিসদের সামনে এসে দাঁড়াল। গলা চড়িয়ে বলল– তোমাদের দলপতি কে? ফ্রান্সিস উঠে দাঁড়াল। বলল–আমি।
–তোমরা তো দেখছি বিদেশি। দস্যুরানি স্পেনীয় ভাষায় বলল।
–হ্যাঁ–আমরা ভাইকিং। ফ্রান্সিস বলল।
–এখানে এসেছ কেন? দস্যুরানি বলল।
–আমরা দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াই। ফ্রান্সিস বলল।
–কেন? দস্যুরানি একটু অবাক হয়েই জানতে চাইল।
–ভালো লাগে তাই। ফ্রান্সিস সহজ ভঙ্গীতে বলল।
মনে হয় তোমাদের এই ঘুরে বেড়ানোর পিছনে কোন উদ্দেশ্য আছে। দস্যুরানি বলল।
–ঠিক উদ্দেশ্য কিছু নেই। তবে একটা কাজ আমরা করি, কোন গুপ্ত ধনসম্পদের খোঁজ পেলে সেটা খুঁজে বার করি। ফ্রান্সিস বলল।
–ও–তাই বলো। তাহলে তোমরা তো যথেষ্ট ধনী। দস্যুরানি একটু ঠাট্টার স্বরেই বলল।
না। কারণ সেই গুপ্তধনের আসল মালিককে আমরা তা দিয়ে দি। ফ্রান্সিস বলল।
বদলে তো কিছু পাও। দস্যুরানি বলল। –
-একটা স্বর্ণমুদ্রাও নিই না। ফ্রান্সিস মাথা নেড়ে বলল।
–আশ্চর্য! তোমাদের কথায় বিশ্বাস কি? তোমাদের জাহাজ তল্লাশি হবে। দস্যুরানি বলল।
–আমাদের কোন আপত্তি নেই। ফ্রান্সিস বলল।
–আপত্তি হলেও শুনেছে কে? তোমরা তো এখন বন্দী। দস্যুরানি বলল।
–সেটাই জানতে চাইছি? আমাদের বন্দী করা হয়েছে কেন? ফ্রান্সিস বলল।
–পিতুজা বন্দরের নাম শুনেছো? দস্যুরানি বলল।
–না। ফ্রান্সিস মাথা নাড়ল।
–ওখানে প্রতি মাসে ক্রীতদাস কেনাবেচার হাট বসে। দস্যুরানি বলল।
–হ্যাঁ–সেরকম হাট দেখেছি। সে হাটে আমাদের একবার বিক্রি করা হয়েছিল। ফ্রান্সিস বলল।
আমিও তোমাদের বিক্রি করব। যুরোপীয় ক্রীতদাস। ভালো দাম পাব। দস্যুরানি একটু বাঁকা হেসে বলল।
–এটা অন্যায় জুলুম। ফ্রান্সিস গলা চড়িয়ে বলল। দস্যুরানি হেসে উঠল। কোন কথা বলল না। এতক্ষণে মারিয়াকে দেখল। দস্যুরানির চোখে মুখে উৎসুক ফুটে উঠল। বলল–এ কে?
–আমাদের দেশের রাজকুমারী। হ্যারি বলল।
–তা এখানে কেন? দস্যুরানি বেশ অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করল।
